এরপর শুরু হল গানবাজনার আসর। গৃহকর্তা এক সুসজ্জিতা মেমসাহেবকে অনুরোধ করতেই তিনি পিয়ানো বাজাতে বসলেন আর পিয়ানোর রিডের ওঠানামার সঙ্গে তার দশ আঙুলের আংটি ঝিকমিকিয়ে উঠতে লাগল। যেন পিয়ানো বাজানোর জন্যেই তিনি আঙুলগুলি সাজিয়েছেন। কিছু পরেই রবির বিপদ ঘনিয়ে এল। তাকে গান গাওয়ার অনুরোধ করে বসলেন বাড়ির গৃহিণী। রবি জানেন এরা ভারতীয় গানের কদর বোঝে না, এদের সামনে গান গাওয়ার কোনও মানে হয় না। তবু চারদিক থেকে অনুরোধ আসতে থাকায় তিনি এড়াতে পারলেন না।
কিন্তু রবি গাইতে শুরু করতেই ক্রমশ সমবেত ইংরেজ নারীপুরুষদের ঠোঁটের কোনায় হাসি ছড়িয়ে পড়তে লাগল। কোনও কোনও মহিলা হাসি চাপতে না পেরে নিচু হয়ে রুমাল কুড়ানোর ছলে হেসে নিলেন। কেউ আবার বান্ধবীর পিঠে মুখ লুকিয়ে হাসলেন। যাঁরা হাসি চাপতে সক্ষম হলেন তাদের চোখে চোখে যেন টেলিগ্রাফ চলতে লাগল। পিয়ানোবাদিকা মহিলার মুখে তাচ্ছিল্যের ভাব দেখে রবির গায়ের রক্ত হিম হয়ে যাচ্ছিল। এমনকী মিলির। মুখেও হাসি লেগে আছে দেখে রবি যেন মরমে মরে যাচ্ছিলেন। গান গেয়ে এমন অপদস্থ আর কখনও হননি৷ কোনওরকমে গান শেষ করে রবির মুখচোখ লাল হয়ে উঠল।
ঘরে মৃদু প্রশংসাধ্বনি উঠলেও অত হাসির পর রবি আর সেটাকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করলেন না। ঘরের আবহাওয়ায় তার অসুস্থ লাগছিল। মিলি এগিয়ে এসে গানের মানে জিজ্ঞেস করলে রবি প্রেমের কথা আর বোলো না অনুবাদ করে বোঝাতে চাইলেন। তাতে কেউ মন্তব্য করলেন তোমাদের দেশে প্রেমের স্বাধীনতা আছে নাকি?
জ্ঞানদা রবির এরকম হেনস্থা আর সহ্য করতে পারছিলেন না। তার হাত ধরে টেনে নৈশভোজের ঘরে নিয়ে গেলেন। এখানে সবাই একসঙ্গে খেতে যাচ্ছে না, তা হলে পার্টির রস বিঘ্নিত হয়। জোড়ায় জোড়ায় হাত ধরে কয়েকজন পালা করে খাবারঘরে যাচ্ছে।
জ্ঞানদা ফিসফিস করে রবিকে বললেন, এরা নিজেদের কালচারের বাইরে সবকিছু নিয়ে হাসাহাসি করে, আসলে এরাই অশিক্ষিত। তোমার অপূর্ব গানটির মর্ম বুঝতেই পারল না, আজ তুমি খুব ভাল গেয়েছ রবি।
মেজোবউঠানের সান্ত্বনায় রবির চোখ চিকচিক করে ওঠে। বলেন, এরা যে রাজার জাত বউঠান, রাজদণ্ডের জোরে অন্যের সভ্যতাকে উপহাস করার স্পর্ধা রাখে। তবে মেজোবউঠান, আমি ভাবছি আমি ওদের গান আয়ত্ত করেই একদিন ওদের অপমানের জবাব দেব।
সত্যি রবি, জ্ঞানদা বলেন, এই যে বিলিতি মেয়েরা আমাদের গান শুনে হাসাহাসি করছিল, এরা প্রকৃতপক্ষে কিছুই জানে না। আমাদের দেশে যেমন ছেলেবেলা থেকে মেয়েদের ঘরকন্না শিখিয়ে আর লেখাপড়া না শিখিয়ে বিয়ের জন্য প্রস্তুত করা হয়, এখানেও তেমন মেয়েদের পালিশ চলে বিয়ের বাজারে বিকোবার জন্য। বিয়ের জন্য যতটুকু লেখাপড়া দরকার ততটুকুই শেখানো হয়। একটু গান, একটু পিয়ানো, একটু সেলাই, একটু ভাল করে নাচা, একটু-আধটু ফরাসি ভাষা জানলেই বিয়ের বাজারের জন্য তৈরি।
রবি হেসে বলেন, তার মানে আমাদের মেয়েরা দিশি পুতুল আর এখানকার গোরিমেমরা বিলিতি পুতুল, তুমি বলছ এটুকুই তফাত! আমাদের মেয়েরা আর এদের মেয়েরা দুই-ই দোকানে বিক্রি হবার জন্য তৈরি! তা হলে আর সাতসমুদ্র পাড়ি দিয়ে কী শিখতে এলে মেজোবউঠান?
এখানে এসে এইটুকু তো শিখলাম, জ্ঞানদা বলেন, না এলে ভাবতাম এদেশের মেয়েরা কত-না স্বাধীন, কত-না শিক্ষিত।
হ্যাঁ বউঠান, রবি বলেন, যা দেখছি, এখানেও পুরুষেরাই হর্তাকর্তা, স্ত্রীরা তাদের অনুগত। স্ত্রীকে আদেশ করা, স্ত্রীর মনে লাগাম লাগিয়ে নিজের ইচ্ছেমতো চালিয়ে বেড়ানোর চেষ্টাকে এখানকার স্বামীরাও তাদের ভগবানদত্ত অধিকার মনে করেন। তবে বড়লোকদের ফ্যাশনি মেয়েদের চেয়ে সাধারণ গেরস্থঘরের মহিলাদের আমার বেশি ভাল লাগে। তাদের অনেক কাজ করতে হয় ঘরে-বাইরে। গৃহিণীপনা তাক লাগিয়ে দেয়। লেখাপড়া বেশি না শিখলেও এদেশের মেয়েদের বুদ্ধি পরিষ্কার। অনেক বিষয় জানেন। কথাবার্তায় জ্ঞানলাভ করা যায়। এঁরা চার দেওয়ালে বদ্ধ নন। বন্ধুবান্ধব আত্মীয়দের সভায় কোনও বিষয়ে স্পষ্ট মতামত জানাতে পারেন।
জ্ঞানদা ডেসার্টের দুটি প্লেট হাতে নিয়ে এসে একটি রবিকে দিতে দিতে বললেন, আমার ভাল লাগে এদের পারিবারিক সম্পর্কটা। সারাদিন পর কর্তা বাড়ি ফিরলে আগুনের চারধারে জড়ো হয়ে বসে পুরো পরিবার খোলামেলা কথাবার্তা, গানবাজনা হয়। কী সুন্দর।
রুপোর চামচ দিয়ে ক্যারামেল পুডিং মুখে তুলতে তুলতে রবি বলেন, এখানে নারীপুরুষের সম্পর্কটাকে আড়াল করার চেষ্টা করা হয় না বলেই তা এত ভোলামেলা ডানা মেলেছে। আপিস থেকে বাড়ি ফিরে যেমন পোশাকি কাপড়জামা ছেড়ে হাঁফ ছেড়ে বসে লোকে, তেমনি আনুষ্ঠানিক ব্যবহারের খোলস ছেড়ে মন খুলে আপনজনের সঙ্গে কথা বলতে চায়। তখনও কেন বউয়ের সঙ্গে ফিসফিস করে কথা বলতে হবে, পাছে পাশের ঘর থেকে শ্বশুর-ভাশুর শুনে ফেলেন! স্ত্রীর গলা বা হাসি শোনা গেলে কেন মহাভারত উলটে যাবে! এজন্য বিলিতি বাঙালিরা দেশে ফিরে খুঁতখুঁত করে যে আমাদের কোনও হোম নেই, বিলেতেই যথার্থ হোম আছে। কারণ বিলেতের পরিবারে একটা স্বাধীন উচ্ছ্বাসের ছোঁয়া পাওয়া যায়। সারাদিনের পরে বাপ মা ভাই বোন স্ত্রী সন্তান মিলে বাড়ির মধ্যে অগ্নিকুণ্ডের চারধারে আনন্দের উৎস তৈরি হয়।
