বউঠান, তোমার কাজলটানা ভারতীয় নয়নেও যে সুইমস্যুট পরা গোরাসাহেবদের রূপ ধরা পড়ছে না এমন কথা তো বলতে পারছি না।
কী যে বলো, ছি! অমন রূপ দেখলে আমার চোখ জ্বালা করে। ঝাঁঝিয়ে ওঠেন জ্ঞানদা, ওইরকম উলঙ্গপনার চেয়ে পোশাকের সৌন্দর্য অনেক বেশি, এটা যে এরা কবে বুঝবে। ভারতীয় রুচি অনেক পরিশীলিত।
রবি হাসেন, তা হলে তো এখানে এসে তুমি আরও বেশি বেশি বাঙালিনি হয়ে যাচ্ছ, কোথায় তোমাকে বিলিতি কালচার শেখাতে আনা হল, আর তুমি দিনকে দিন আরও কট্টর ইংরেজবিদ্বেষী হয়ে যাচ্ছ! আমি তো কল্পনা করেছিলাম এখানে এসে কেতাদুরস্ত গাউন শোভিত হ্যাট পরিহিত মিসেস টেগোরকে মিট করব, আর সেই তুমি কিনা বাংলার বালুচরী পরে ব্রাইটনের সমুদ্রতীরে রোদ পোয়াচ্ছ?
মিষ্টি হেসে জ্ঞানদা বলেন, আমার এই ভাল, দেখছ না সবাই ঘুরে ঘুরে কেমন আমাকেই দেখছে! আমার গায়ে আমার দেশের পতাকা লাগানো আছে।
আজকাল মাঝে মধ্যেই ডিনার বা বল ডান্স বা ইভনিং পার্টির নেমন্তন্ন থাকছে। ইংরেজ সমাজে ওঁদের মেশামেশির পালা শুরু হল একটি সান্ধ্য নিমন্ত্রণে। এতদিন জ্ঞানদা একা ছিলেন, এখন তার স্বামী যোগ দেওয়ায় প্রতিবেশী ইংরেজদের আনাগোনা, আমন্ত্রণ নিমন্ত্রণ শুরু হয়েছে।
ডক্টর মারলোর বাড়ির সান্ধ্যপার্টিতে অনেক নারী পুরুষ জড়ো হয়েছেন সেদিন। ঘরে ঢুকেই হোস্ট ও হোস্টেসকে অভিবাদন জানানোর পালা। তারপর বাকিদের সঙ্গে আলাপ। ঘরে জায়গা কম তাই সবার বসার চেয়ার নেই। মহিলারা কৌচে বসে গল্প শুরু করলেও পুরুষরা অধিকাংশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথাবার্তা বলছেন। নতুনদের সঙ্গে আলাপ শুরু ওয়েদার টক দিয়ে।
এ-সব আসরে পোশাক আসাকের ফ্যাশন খুব গুরুত্বপূর্ণ। পুরুষদের সান্ধ্য পোশাকের শার্ট হতে হবে ধবধবে সাদা, তার ওপর বুক খোলা কালো ওয়েস্টকোটের ওপর থেকে সাদা শার্টের কলার উঁকি দেবে। গলায় সাদা নেকটাই। সবার ওপরে সামনে কোমর পর্যন্ত কাটা টেল কোট। রবি ও সত্যেন ইংরেজদের স্টাইলে টেল কোট পরে গেলেও জ্ঞানদা শাড়িই পরলেন। তার মেরুন বালুচরী ও পশমিনা শাল নিয়ে ইংরেজ মহিলারা উচ্ছ্বসিত হয়ে নানা প্রশ্ন শুরু করলেন। মিসেস মারলোর মতে সেলাই করা গাউনের চেয়ে জ্ঞানদার ভাঁজে ভাঁজে বিন্যস্ত শাড়ি আরও লালিত্যময়।
ডক্টর লিস্টারকে দূর থেকে এগিয়ে আসতে দেখে জ্ঞানদার মনে উত্তেজনার ছোঁয়া লাগে। লিস্টার তাকে নাচে আহ্বান করলে জ্ঞানদা সত্যেনের দিকে তাকান।
সত্যেন সঙ্গে সঙ্গেই বলেন, যাও না জ্ঞানদা, ডক্টর লিস্টার তোমাকে পার্টনার হতে ডাকছেন, ইটস আ অনার!
জ্ঞানদা ও লিস্টারের নৃত্যরত জুটিকে বেশ মানিয়েছে। সত্যেনের মনে কি একটু খোঁচা লাগছে! তাদের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকেন, মনে মনে কিছুতেই হারবেন না, দুনিয়ার পুরুষদের সঙ্গে মিশে দেখে নিক জ্ঞানদা, তার পরেও যদি পুরুষ হিসেবে জ্ঞেনুর চোখে তিনি আকর্ষণীয় থাকেন, তবেই তার পৌরুষের জিত।
কবে এলেন ব্রাইটনে? লিস্টারকে জিজ্ঞেস করেন জ্ঞানদা। জোসেফ লিস্টার স্কটল্যান্ডের এডিনবরায় চিকিৎসা এবং অধ্যাপনা করেন, মাঝে মাঝে ব্রাইটনে আসেন, যেমন কিছুদিন ছিলেন জ্ঞানদার অসুখের সময়ে।
লিস্টার জ্ঞানদাকে বলেন, ইন্ডিয়ান প্রিন্সেস, আমি অনেক রোগীর চিকিৎসা করি কিন্তু তোমাকে সারিয়ে তুলে যেরকম আনন্দ পেয়েছি, সেটা স্পেশাল।
আপনি ব্রাইটনে থেকে যাচ্ছেন না কেন? জ্ঞানদা আবদার করেন বালিকার মতো, তা হলে অসুখ করলেই আপনার দেখা পাওয়া যেত। আপনাকে দেখলেই আমার শরীর মন সব ভাল হয়ে যায়।
তা কি হয় প্রিন্সেস, তুমি যেমন একটা নির্দিষ্ট জীবনে বাঁধা, আমিও তেমনি, লিস্টার হেসে বলেন, ওখানেই আমার স্ত্রী অ্যাগনেস, ওখানে আমার কাজ, আমার রোগীরা। ওখানে কাজ করেই আমার সম্মান স্বীকৃতি সব। সে-সব ছেড়ে কি আসা যায়? তুমিই কি পারবে তোমার স্বামী ছেড়ে দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও সেটল করতে? কেন করবেই বা!
আপনি স্ত্রীকে খুব ভালবাসেন? জ্ঞানদা জানতে চান।
লিস্টার বলেন, অ্যাগনেস আমার সব কাজের সঙ্গিনী, আমার ঘরের গৃহিণী, আমার ল্যাবের অ্যাসিস্টান্ট।
উনিও কি আপনার মতো ডক্টর? জ্ঞানদা অবাক হন। বিলেতেও মহিলা ডক্টর খুব বেশি দেখা যায় না এখনও।
উনি মেডিক্যাল সায়েন্সের ছাত্রী, আমার গুরুকন্যা। লিস্টার জানান, অ্যাগনেস ভাল ফরাসি জানে, ওর অনুবাদ করা লুই পাস্তুরের থিয়োরি পড়েই জার্ম ইনফেকশনের ব্যাপারে আমার চোখ খুলে যায়।
বাঃ, জ্ঞানদা সত্যি খুশি হন, স্বামী স্ত্রীর এরকম জুটি তো আদর্শ। আমাদের দেশে এরকম যে কবে হবে তাই ভাবছি। আর কোনওদিন দেখা হবে কি না জানি না, তোমাদের কথা আমার সবসময়ে মনে থাকবে।
দেখা হোক বা না হোক, লিস্টার গাঢ়স্বরে বলেন, আমার প্রিন্সেস যেখানেই থাক, যেন সবসময়ে ভাল থাকে। কোনও দুঃখ যেন তোমার হাসি মুছে দিতে না পারে।
রবির সঙ্গে আলাপ করতে এগিয়ে আসে এক সুন্দরী বিলেতবালা আর সবার চোখ ঘুরে আসে সেইদিকে। এখানে রূপের পূজা হয় সাড়ম্বরে, রূপসির চারপাশে স্তাবকেরা ঘুরঘুর করে একটু হুকুম তামিল করার জন্য। রূপ এখানে লুকিয়ে থাকতে পারে না। মিস মিলি রবির সঙ্গে কথা বলছেন আর তখনই কত ইংরেজ যুবক তাকে নাচের সঙ্গী হতে ডাক দিচ্ছেন।
