হ্যাঁ রে রবি, সত্যেন এসে যোগ দেন ওদের আলাপে, এদেশে এরা কী পরিবারের ভেতর কী বাইরে, নারীপুরুষের মেলামেশাটাকে খুব গুরুত্ব দেয়। সেজন্য এখানকার মেয়েরা স্বাধীন না হয়েও নিজেদের প্রাণের স্ফুর্তি মেলে ধরতে পারে। স্বামীকে সবার সামনে শাসন করতেও পারে আবার চুমুও খায় নিঃসংকোচে।
রবি ও জ্ঞানদার খাওয়া শেষ হয়েছে তাই সত্যেন খাবার ঘরে এসেছেন। সবাই একসঙ্গে খেতে চলে আসা ঠিক হবে না বলেই এই ব্যবস্থা। কিন্তু তাকে পেয়ে ওদের পারিবারিক আড্ডা যেন জমে উঠল।
এরকম সান্ধ্য চা-সভা, নৈশভোজ, নাচের আসর, বল, লন পার্টি লেগেই থাকে রবিদের জীবনে। এ যেন এক অন্য জীবন, কোথায় কলকাতার গানে কবিতায় ভরপুর সৃষ্টির উন্মাদনা আর কোথায় এখানে সভাশোভন হয়ে ওঠার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা! রবির হতাশ লাগে মাঝে মাঝেই।
অলস দিনেরবেলায় এবাড়ি-ওবাড়ি ভিজিট পালটা ভিজিট করাও এখানকার প্রথা। রবি লক্ষ করেছেন, বড়ঘরের মহিলাদের সামাজিক আলাপচারিতে একরকম দক্ষতা আছে, অনেক অতিথি থাকলে গৃহিণী তাঁর বাক্য ও হাসির অমৃত সকলকে সমানভাবে বিলিয়ে দিতে জানেন। বিশেষ কারও সঙ্গে বেশি বেশি গল্প করা চলবে না, তাতে অন্যেরা ক্ষুণ্ণ হবেন।
জ্ঞানদার সঙ্গে দু-একটি ভিজিটে গিয়ে রবি দেখলেন, গিন্নিরা একজনের মুখের দিকে তাকিয়ে একটা কথা বলেন, তারপরেই সকলের দিকে তাকিয়ে হাসেন আবার পরের কথাটা অন্য একজনকে বলেন, বলতে বলতে হয়তো সকলের দিকে চোখ ঘুরিয়ে আনেন।
আসরের মধ্যমণি গৃহিণী মিসেস জনসন একজনকে বললেন, লাভলি মর্নিং, ইজনট ইট! তারপর সে কোনও উত্তর দেওয়ার আগেই আর-একজনের দিকে তাকিয়ে ছুঁড়ে দিলেন, কালরাতের সংগীতশালায় ম্যাডাম নীলসন গান করছিলেন, ইট ওয়াজ এজুইজিট!
অন্য সব মহিলারা তার কথার পিঠে এক-একটা করে বিশেষণ জুড়ে দিতে লাগলেন পরম উৎসাহে, কেউ বললেন চার্মিং, কেউ বললেন সুপার্ব।
আর-একজন বাকি ছিলেন, তিনি বললেন, ইজনট ইট!
রবি ফিসফিস করে জ্ঞানদাকে বলেন, দেখো বউঠান, কথাগুলো যেন তাসের আসরের তাস চালার মতো করে সবার দিকে গড়িয়ে দেওয়া। এমন তাড়াতাড়ি এত দক্ষতার সঙ্গে কথা ঘুরছে যে বোঝা যায় এদের হাতে অনেক তাস গোছানো আছে।
জ্ঞানদা চোখ ঘুরিয়ে বলেন, কিংবা কথার লড়াই। সকালবেলা উঠে মুগুর ভাজা।
মিসেস ডনকিনস জ্ঞানদার সঙ্গে গল্প করতে এগিয়ে আসেন, জানতে চান, মিসেস টেগোর, তোমাদের দেশে কি এরকম সোশাল ভিজিট হয় যেখানে নারীপুরুষ সবাই থাকেন? তোমরা সেখানে কী কথা বলো?
আমাদের বাড়িতে হয়, জ্ঞানদা জানান, কিন্তু সাধারণভাবে অভিজাত হিন্দু পরিবারে এরকম চল নেই। আমাদের মেয়েরা এখনও সকলের সামনে বেরোয় না।
হাউ হরিবল, ডনকিনস বলেন, তোমরা এখনও পরদার আড়ালে মনুষ্যেতর জীবনযাপন করছ। দিস শুড বি চেঞ্জড।
জ্ঞানদা বলেন, আমাকে দেখে তোমার কি মনে হয়, মনুষ্যেতর জীব? আমি যেরকম একা একা বাচ্চাদের নিয়ে সাগর পাড়ি দিয়ে এতদূর এসেছি, তুমি পারবে? তোমাদের দেশের কজন মেয়ে সেটা পারবে?
ডনকিনস জ্ঞানদার হাত ধরে বলেন, ওঃ গান ডার্লিং ডোন্ট টেক ইট পারসোনালি। আমি জানি তুমি ব্যতিক্রম, তোমার মতো সাহসী মহিলা আমি খুব কম দেখেছি। আই অ্যাডোর ইউ।
.
এর কিছুদিন পর সত্যেন জ্ঞানদা ও রবি ছেলেমেয়েদের নিয়ে লন্ডন যাত্রা করলেন। সেখান থেকে ট্রেন্টব্রিজ ওয়েলস, ডেভনশায়ার ঘুরে রবি লন্ডনে একটি পরিবারের সঙ্গে থাকতে শুরু করলেন। এত ঘোরাঘুরির মধ্যেও রাতে শোবার সময়ে তার মনে পড়ে নতুনবউঠানকে। প্রায় রোজ তাকে চিঠি লেখেন রবি। চিঠি হয়তো একদিনেই শেষ হয় না, কাটাকুটিও হয় অনেক। কিন্তু রবি তাকে প্রতিদিন চিঠি লেখেন, প্রতিরাত।
.
ইংলন্ডে আসবার আগে আমি নির্বোধের মত আশা করেছিলেম যে, এই ক্ষুদ্র দ্বীপের দুই হস্ত-পরিমিত ভূমির সর্বত্রই গ্ল্যাডস্টোনের বাগ্মিতা, ম্যাক্সমূলরের বেদব্যাখ্যা, টিভ্যালের বিজ্ঞানতত্ত্ব, কার্লাইলের গভীর চিন্তা, বেনের দর্শনশাস্ত্রে মুখরিত। সৌভাগ্যক্রমে তাতে আমি নিরাশ হয়েছি। মেয়েরা বেশভূষায় লিপ্ত, পুরুষেরা কাজকর্ম করছে, সংসার যেমন চলে থাকে তেমনি চলছে, কেবল রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে বিশেষভাবে কোলাহল শোনা যায়। মেয়েরা জিজ্ঞাসা করে থাকে, তুমি নাচে গিয়েছিলে কি না, কনসর্ট কেমন লাগল, থিয়েটারে একজন নূতন অ্যাক্টর এসেছে, কাল অমুক জায়গায় ব্যান্ড হবে ইত্যাদি। পুরুষেরা বলবে, আফগান যুদ্ধের বিষয় তুমি কী বিবেচনা কর, Marquis of Lorneকে লন্ডনীয়েরা খুব সমাদর করেছিল, আজ দিন বেশ ভালো, কালকের দিন বড়ো মিজরেবল ছিল। এ-দেশের মেয়েরা পিয়ানো বাজায়, গান গায়, আগুনের ধারে আগুন পোয়ায়, সোফায় ঠেসান দিয়ে নভেল পড়ে, ভিজিটরদের সঙ্গে আলাপচারি করে ও আবশ্যক বা অনাবশ্যক মতে যুবকদের সঙ্গে ফ্লার্ট করে। এদেশের চির-আইবুড়ো মেয়েরা কাজের লোক। টেমপারেন্স মীটিং, ওয়ার্কিং মেনস্ সোসাইটি প্রভৃতি যত প্রকার অনুষ্ঠানের কোলাহল আছে, সমুদয়ের মধ্যে তাদের কণ্ঠ আছে। পুরুষদের মতো তাদের আপিসে যেতে হয় না, মেয়েদের মতো ছেলেপিলে মানুষ করতে হয় না, এদিকে হয়তো এত বয়স হয়েছে যে বল-এ গিয়ে নাচা বা ফ্লার্ট করে সময় কাটানো সংগত হয় না, তাই তাঁরা অনেক কাজ করতে পারেন, তাতে উপকারও হয়তো আছে।
