ছিঃ! রবির গা শিউরে ওঠে ঘেন্নায়। বলেন, আমাদের দেশের মতো এরা বাড়িতে পিকদান রাখলেই পারে, তাতে পকেট নোংরা হয় না।
জ্ঞানদা মাথা ঝাঁকিয়ে হেসে বললেন, না না রবি, ওদের চোখে পিকদান খুব ন্যাস্টি দৃশ্য। অমন নোংরা জিনিস ওরা ঘরে রাখবে না, পকেটের ন্যাপকিন তো দৃশ্যমান নয়। এখানে চোখের পরিচ্ছন্নতা সবার আগে। এরা খেয়ে উঠে কুলকুচো করে না কারণ মুখ থেকে জল পড়া দেখতে খারাপ। সাহেবদের শোকবস্ত্রও সুদৃশ্য করে তৈরি।
ডিনার টেবিলে বসে খাওয়া শুরু করে রবি বলেন, দেখে শুনে যা বুঝছি মেজোবউঠান, এদের ঘরে শ্ৰী আছে কিন্তু পরিচ্ছন্নতা নেই। এরা সুশ্রী কিন্তু নোংরা। এই শেখার জন্য আমাদের প্রবাসে আসতে হল!
না রবি, সত্যেন প্রতিবাদ করেন, এদের অনেক ভাল স্বভাব আছে, সেই গুণগুলো আয়ত্ত করার জন্যই আমরা এখানে এসেছি। ওদের ভালর সঙ্গে আমাদের ভালটা মিশিয়ে নিতে পারলেই আমাদের পূর্ণাঙ্গ পরিশীলন হবে। জ্ঞানদার দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, তবে তোমার বিলিতি ডিনারটা বেশ এনজয় করছি।
রবি ফোড়ন কাটেন, হ্যাঁ, বেশ আলুনি আর আঝালি। বউঠান, তুমি এ-সব আলুসেদ্ধর সুপ আর পাউরুটি রান্না করতে করতে আসল রান্নাগুলো যে ভুলে যেয়ো না।
রোস্ট, চিকেনটা আমি বেঁধেছি, বাকি সব ল্যান্ডলেডির কিচেন থেকে, জ্ঞানদা বললেন, শোনো রবিঠাকুরপো, তোমার ভয় নেই, আমি এ-সব বিশেষ রাঁধছি না। খাবার সাপ্লাইয়ের দায়িত্ব বাড়িওলির। তার কল্যাণেই রোজ আমাদের প্রকৃত ইংলিশ ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনার জুটবে।
ওরে বাবা, রবি আঁতকে ওঠেন, তা হলে তো আমাকে শিগগির পালাতে হবে বউঠান।
পালাব বললেই হল! সত্যেন ধমকে ওঠেন, চারদিকে ঘুরে দেখ রবি কত বঙ্গযুবক এই ইংরেজ বাড়িওলির সঙ্গ পেয়ে ধন্যবোধ করছে। কোট হ্যাট গাউন পরা জলজ্যান্ত বিবিসাহেবদের এত কাছে আসার সৌভাগ্যে পাগল হয়ে যাচ্ছে।
সে তো জাহাজেই নমুনা পেয়েছি মেজদাদা। রবি হেসে বলেন, জানো বউঠান, জাহাজে কয়েকটি ভারী মজার ইঙ্গবঙ্গ যুবক ছিল। তারা জাহাজের ইংরেজ চাকরদের হুকুম করার বদলে স্যার বলে ডাকেন। নামার সময়ে ইংরেজ গার্ড এসে সাহায্য করলে বঙ্গযুবারা আহ্লাদে গলে পড়েন। সাহেবগার্ডের একটি সেলামের বদলে এক শিলিং বখশিস দিয়ে ধন্য হন। আমার এক সহযাত্রীর কাছে শুনেছি ল্যান্ডলেডির সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা। কার্পেট পাতা, ছবি টাঙানো, ফুলভরা ফুলদানি সাজানো, পিয়ানো শোভিত ভাড়া ঘরে ঢুকেই তো প্রথমে ঘাবড়ে গেলেন, এত দামি ঘরে থাকবেন কী করে? তিনি তখনও জানেন না যে বিলেতের সব ঘর এরকম, বরং কোনও মাদুরপাতা চৌকি দেওয়া ঘরই দুষ্প্রাপ্য। তার ওপর যখন ইংরেজ বাড়িওলি এসে বিনীত স্বরে গুড মর্নিং বললেন, তখন তো তার দিশাহারা অবস্থা।
জ্ঞানদা হেসে গড়িয়ে পড়েন, তারপর তার সেই বাড়িওলির সঙ্গে ভাব হল কি না? এখানে তো ল্যান্ডলেডির কেয়ারেই জীবন সঁপে দিতে হয়।
রবি হাসতে হাসতে জানান, ক্রমশ ল্যান্ডলেডির সঙ্গে তার এতই আলাপ জমে উঠল যে এখন তার মেয়ের সঙ্গে ফ্লার্ট করা পর্যন্ত এগিয়ে গেছেন তিনি।
সকলের সমবেত হাসির মধুর উত্তাপের মধ্য দিয়ে সেদিনের মতো ডিনার শেষ হল।
পরদিন থেকে ব্রাইটনের জীবন ঢিমে তালে গড়িয়ে চলল। সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ ঘুম থেকে ওঠা, তারপর স্নান। রবি রোজ ঠান্ডা জলে আপাদমাথা ভিজিয়ে স্নান করেন, এখানকার রীতি মতো শুধু গরমজলে গা মুছে নেওয়া তার পোষায় না। ল্যান্ডলেডি ব্রেকফাস্ট পাঠান নটায়। টোস্ট ওমলেট দুধ পরিজের ইংলিশ ব্রেকফাস্টের পর কিছুক্ষণ নিজের নিজের কাজ, পড়াশোনা, সুরেন বিবির সঙ্গে খেলাধুলার পর বেলা দেড়টায় লাঞ্চ। দিন শুরু বলতে গেলে নটার আগে হয় না, আবার চারটের মধ্যে আলো মরে আসে। রবির মনে হয়, এখানকার দিনগুলো যেন দশটা পাঁচটার অফিসবাবু। আর রাতগুলো ঘোড়ায় চেপে আসে আর পায়ে হেঁটে ফেরে, যেন ফেরার ইচ্ছেটাই কম। বিকেলে একবার কেক বিস্কিট সহযোগে চা পাওয়া যায় তারপর রাত আটটায় এলাহি ডিনার।
ব্রাইটনের সমুদ্রতীর তখন খুব উপভোগ্য। অক্টোবরে শীত তেমন পড়েনি, ব্রেকফাস্টের পর বেলা দশটা-এগারোটা নাগাদ প্রায়দিনই ওঁরা সি-বিচে চলে আসেন। ঝকঝকে রোদে সাহেবমেমরা মহানন্দে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। রুগণ আর বৃদ্ধদের হুইলচেয়ারে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে বাড়ির লোকেরা। মেয়েদের নানারকম সাজপোশাক দেখে রবির তাক লেগে যায়। কী সহজ স্বচ্ছন্দ এই সাগরপারের মেয়েগুলি! রবির মনে পড়ে যায় ঘরে ফেলে আসা প্রিয়মুখটি। আহা আমার নতুনবউঠান যদি এমন স্বাধীন আনন্দে সাগরপাড়ে ঘুরে বেড়াতে পারতেন!
সুরেন আর বিবির ছুটোছুটির সঙ্গে জ্ঞানদা পেরে ওঠেন না, রামা চাকর যত তাদের পেছনে দৌড়য় তত তারা রবির গায়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে। রবি ওদের নিয়ে ঝিনুক কুড়োতে শুরু করেন। রংবেরঙের ছাতার নীচে শুয়ে-বসে আছে স্বল্পবাস সুন্দরীরা, ইতালীয় ভিখারি তাদের সামনে অর্গান বাজিয়ে ভিক্ষা চাইছে। রবি মজা পেয়ে বলেন, দেখো বউঠান, ওই ভিখারিরা কেবল মেয়েদের সামনেই ঘুরঘুর করছে কেন?
জ্ঞানদা বললেন, মনে হচ্ছে ওরা সৌন্দর্যের ভিখারি, টাকাপয়সা না হলেও চলবে। তবে ওদের আর কী দোষ, তুমিও তো ঘুরেফিরে ওদের দিকেই তাকিয়ে আছ রবিঠাকুরপো!
