না প্রিন্সেস, জোসেফ বলেন, সার্জেনদের হাত ধোয়ার অভ্যেস নেই। অনেক সময়েই হসপিটালের একজন রোগীর ঘায়ে ওষুধ লাগিয়ে হাত না ধুয়েই আর একজনের বাচ্চা ডেলিভারি করতে চলে যায়। এ থেকেই ইনফেকশন। কিন্তু মিডওয়াইফদের বারবার হাত ধোয়ার বাতিক আছে, তাই ওদের হাতে মরে কম। তোমার ক্ষেত্রে দাইয়ের বোধহয় কোনও দোষ ছিল না, তোমার অসুখের ধকল বাচ্চাটা নিতে পারেনি। লেট আস প্রে ফর হিজ পিসফুল আফটার লাইফ।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর লিস্টার জ্ঞানদার দিকে একটা সুন্দর রঙিন গিফট প্যাক বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, প্রিন্সেস, তোমার জন্য আজ আমি ওয়াইন আর চকলেট এনেছি, লেট আস সেলিব্রেট ইয়োর গুড হেলথ। ওয়াইন পান স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল।
একটি রক্তাক্ত হৃদয় সেইমুহূর্তে আর-একটি হৃদয়ের কাছে কিছুক্ষণের নীড় খুঁজে পেল। দুটি রক্তিম ওয়াইন গ্লাস আকাশে পরম্পরকে চুম্বন করল। সেদিনের সেই বেদনামধুর সন্ধ্যাটির রেশ খুঁজতেই যেন ডিসেম্বরে লিস্টারকে ঘিরে বড়দিনের পার্টি সাজালেন জ্ঞানদা।
.
আরও কয়েকমাস পরে দু-তিনবার জাহাজ বদল করে আলেকজান্দ্রিয়া, প্যারিস, লন্ডন হয়ে ব্রাইটন পৌঁছলেন রবি ও সত্যেন। সময় লাগল প্রায় দিন কুড়ি। মেদিনা ভিলায় পৌঁছে দীর্ঘদিন পরে প্রিয়মুখ দেখার আশায় কড়া নাড়লেন সত্যেন্দ্র, কিন্তু বাড়ির দরজা খুললেন ইংরেজ ল্যান্ডলেডি।
রবি ও সত্যেন বাড়ির ভেতরে ঢুকতে অবশ্য বেশ মজা হল। জ্ঞানদা ছেলেমেয়েদের নিয়ে সেজেগুজে অপেক্ষা করছিলেন। বিবি ও সুরেন ইতিমধ্যে স্কুলে যাচ্ছে, কলকাতার স্মৃতি কিছুটা ফিকে হয়ে এসেছে। কয়েকদিন ধরেই তারা শুনছে পাপা আসছে, পাপা আসছে।
বিবির ধারণা ছিল তাদের পাপা তার স্কুলের বন্ধুদের পাপাদের মতোই হ্যাটকোট পরা সাহেব মানুষ। কিন্তু সত্যেনকে দেখে তার সেই ধারণায় ধাক্কা লাগল প্রথমেই। সত্যেন ফুটফুটে পরির মতো বিবিকে কোলে নেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই সে ছুটে পালিয়ে গেল।
দরজার আড়ালে লুকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বিবি বলল, দ্যাটস নট মাই। পাপা! হি ইজ নট হোয়াইট!
সত্যেন বুঝলেন বিলেতের সব শিক্ষাই ভাল নয়, এখানকার চাপা বর্ণভেদ শিশুর অবোধ মনের গভীরে ঢুকে পড়েছে। এই অন্ধকার তাড়ানোই হবে তার প্রথম কাজ। মেয়ের সঙ্গে ভাব করতে অনেক সময় ব্যয় হল।
আমার বিলিতি বউও কি পালটে গেছে? কালো বরকে আদর করবে। তো? সত্যেন মজা করে জানতে চান জ্ঞানদার দিকে তাকিয়ে।
জ্ঞানদা তখন যত্ন করে ডিনার সাজাচ্ছেন। বিলেতে কায়দাকানুন কতটা শিখেছেন দেখিয়ে চমকে দিতে হবে না সত্যেনকে! কটাক্ষ করে তিনি স্বামীকে বললেন, খুব তো একা একা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল, এখন আবার ঠেস দেওয়া হচ্ছে! মরেই যেতাম, নেহাত ডক্টর লিস্টার মরতে দিলেন না, তাই। এখন কত সাহেব ইলোপ করার জন্য সাধাসাধি করছে তা জানো?
কে তোমাকে ইলোপ করতে চায় একটু শুনি, সত্যেন মজা পেয়ে জানতে চান, সেই তোমার ডক্টর লিস্টার নাকি!
আহা, তার তো আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই! জ্ঞানদা ব্লাশ করেন। সত্যেন অবশ্য বউয়ের গালের সেই ঈষৎ লালিমা লক্ষ করেন না।
ধন্যি মেয়ে তুমি মেজোবউঠান, রবি চারদিকে তাকিয়ে বলেন, কোথায় লোকলশকরে ভরা কলকাতার বাড়ি আর কোথায় এই নিরালা ভিলায় একলা থাকা, তুমি বলেই পারলে। আমাকে এমন একা ছেড়ে দিলে কবে পালিয়ে যেতুম। এত কষ্ট কেন করলে বলো তো?
বা রে, ছেলেমেয়েদের বিলিতি কেতা শেখাতে হবে না? জ্ঞানদা বললেন, তা ছাড়া তোমার মেজদাদা আমাকে মেমসাহেবি কায়দাকানুন শেখাতে চেয়েছিলেন, ঘরের কোণের বাঙালি বউ তার পছন্দ নয়। এখানে এসে না থাকলে এতসব শিখব কী করে?
দেখি এখন কী শিখলে? জ্ঞানদার কাঁধে হাত রেখে সত্যেন বলেন, তোমাদের এখানে পাঠিয়ে দিয়ে আমি যে এতদিন একা একা থাকলাম, সেই কষ্টটা উসুল করে নিতে হবে না এবার!
আমার ল্যান্ডলেডিটি বেশ ভাল, জ্ঞানদা জানান, তিনি আমাকে অনেককিছু শিখিয়েছেন। এখানে বাড়িঘরে কোনও ধুলো থাকা চলবে না, সব ঝকঝকে করে সাজিয়ে রাখা চাই। কিন্তু আমাদের দেশের মতো জল ব্যবহার করা যায় না, গৃহিণীর পকেটে একটি বড় ন্যাপকিন থাকে, সেই সর্ব-পরিষ্কারক ন্যাতা দিয়ে টেবিল চেয়ার আসবাব থেকে খাবার প্লেট পর্যন্ত সবই পরিষ্কার হয়, তারপর আবার ময়লা সমেত সেটা ঢুকে যায় গৃহিণীর পকেটে। আমাকে উনি বলেছেন সবসময়ে কোটের পকেটে ন্যাপকিন খুঁজে রাখাই গৃহপরিচ্ছন্নতার মূল মন্ত্র। চলবে ফিরবে আর যেখানে ধুলো দেখবে ন্যাপকিনে মুছে ফেলবে।
রবি হা হা করে হেসে ওঠেন, মেজোবউঠান, তুমি কি সেই সর্বশোধক। ন্যাপকিনে পরিষ্কার করা প্লেটেই আমাদের বিলিতি ডিনার দিচ্ছ নাকি?
পাগল! জ্ঞানদা হেসে ওঠেন, আমি রামা চাকরকে দিয়ে আচ্ছা করে গরমজল দিয়ে সব বোয়ামোছা করাই। জল না দিলে আমার কিছুই পরিষ্কার হয় না।
তবে আর কী শিখলে বউঠান, জল না দিয়ে পরিষ্কার করাই তো এখানকার ম্যাজিক! রবি ঠাট্টা করেন, তুমি তো সেই বাঙালি বউ রয়ে গেলে।
সত্যেন বলেন, রবি জানিস তো, এখানে সর্দিকাশি হলে সাহেবরা ন্যাপকিনে নাক ঝাড়েন, ন্যাপকিনেই কফথুতু ফেলেন, আবার সেটা পকেটে ঢুকিয়ে রাখেন পরেরবারের জন্য।
