লিস্টারের আঙুলগুলি নিজের গালে চেপে ধরে পরম নিশ্চিন্তে চোখ বোজেন জ্ঞানদা, তার চোখে ঘুম জড়িয়ে আসে।
সত্যেনের কাছে জ্ঞানদার অসুখের খবর জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন জ্ঞানেন্দ্রর মেয়েরা। সত্যেনের এরকম হঠকারিতার ফল ভুগতে হচ্ছে বেচারি জ্ঞানদাকে, সকলেই এজন্য সত্যেনের ওপর বিরক্ত।
মিসেস ডনকিনসের এ ব্যাপারে প্রখর মতামত। তিনি বলেন, গানাডা, কিছু মনে কোরো না, পুরুষরা এমনিতেই দায়িত্বজ্ঞানহীন। আর তোমার স্বামীটি তো দেখছি ইরেসপন্সিবলের চূড়ামণি।
জ্ঞানদার স্বামীর ওপর প্রবল অভিমান, তবু মিসেস ডনকিনসের মুখে পতিনিন্দা তার ভাল লাগে না। তাড়াতাড়ি বলেন, না না মিসেস ডনকিনস, তিনি খুব কেয়ারিং। আমাকে স্বাবলম্বী করার জন্যই একা একা পাঠিয়ে দিয়েছেন, এজন্য আমাদের কত বিরোধিতা সহ্য করতে হয়েছে জানো!
তা হোক, ডনকিনস বলেন, তুমি জানো না গানাডা, পুরুষেরা বউকে টেকেন ফর গ্রান্টেড ধরে নেয়, মানুষ বলে মনে করে না। তুমি জানো, আমাদের ফেমিনিস্ট মেয়েরা ১৮৪০ সাল থেকে ভোটাধিকারের জন্য লড়াই করছে, এখনও পর্যন্ত আমরা সেই দাবি আদায় করতে পারিনি। দেশটা কি শুধু ছেলেরা চালায়? আমরা মুখের কাছে খাবার জোগান না দিলে, সাজিয়ে গুছিয়ে অফিসে না পাঠালে, হোম ম্যানেজমেন্ট না করলে ওরা সব অচল হয়ে যাবে। তবু ওরা আমাদের নাগরিক অধিকার দেবে না?
জ্ঞানদা বলেন, আমাদের দেশে তো ছেলেরাও ভোট দেয় না, ইংরেজ শাসকদের বেছে নেওয়ার কোনও সুযোগ দেওয়া হয় না আমাদের। তোমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক তাই এ-সব ভাবতে পারছ।
তোমাকেও ভাবতে হবে গানাডা, ডনকিনস উত্তেজিত হন, অনেকরকম পলিটিক্স আছে, তার মধ্যে ওল্ডেস্ট পলিটিক্স হল নারী-পুরুষে। বছর দুয়েক আগে জন স্টুয়ার্ট মিলের দি সাবজেকশন অফ উইমেন বইটা বেরিয়ে আমাদের দেশে তো হুলুস্থুলু পড়ে গেছে। মেয়েদের কথায় ওরা কান দেয়নি কিন্তু এখন মেয়েদের পক্ষ নিয়ে একজন পুরুষ এরকম ধারালো যুক্তি দেওয়ায় পুরুষেরা খুব বেকায়দায় পড়ে গেছে আর মেয়েরা উজ্জীবিত। আমি তোমাকে পড়তে দেব।
আমি পড়ে কী করব? জ্ঞানদা বলেন, আমার স্বামী সকলের বিরোধিতা সত্ত্বেও আমার মধ্যে স্ত্রীস্বাধীনতার প্রকাশ দেখতে চান, সেটা যে আমাদের সমাজে কত কঠিন কাজ তোমাকে বোঝাতে পারব না। আমাদের মধ্যে নারী পুরুষে কোনও পলিটিক্স নেই।
ডনকিনস বিরক্ত হন, তুমি আমার কথা বুঝতে পারছ না গানাডা, এটা তোমার বা আমার একার স্বাধীনতার বিষয় না, একসঙ্গে সব মেয়েরা যেদিন রাষ্ট্রে ভোটাধিকার পাবে, পরিবারে পূর্ণ মানুষের মর্যাদা পাবে, পুরুষের সমকক্ষ হবে, সেদিন বলা যাবে স্ত্রীস্বাধীনতা এসেছে। তোমরা যখন স্ত্রীস্বাধীনতা নিয়ে লড়াই করছ, মিলের লেখা তোমাকে অবশ্যই পড়তে হবে আর তোমার স্বামীকেও পড়াতে হবে।
পরদিন ডক্টর লিস্টার জ্ঞানদাকে দেখতে এসে খুশি হয়ে উঠলেন, বাঃ, আজ তোমাকে দেখে সত্যি প্রিন্সেস মনে হচ্ছে। তুমি তো প্রায় সেরেই গেছ।
জ্ঞানদাও লিস্টারের পথ চেয়ে বসে ছিলেন যেন, সত্যি বলছ ডক্টর? আমি সত্যি সেরে উঠব?
না না, আমাকে ডক্টর বলে ডাকলে তো সারবে না, লিস্টার মজা করে বলেন, কই আজ আমাকে এঞ্জেল বলে ডাকলে না তো!
ওষুধে কাজ হয়েছে, কিন্তু তার চেয়ে বেশি কাজ করেছে ডক্টরের উপস্থিতির টনিক। জ্ঞানদা দ্রুত সেরে উঠতে থাকেন।
কিন্তু একদিন রাতে তার হঠাৎ ব্যথা উঠল। এখনও সময় হয়নি, তবু ব্যথায় ছটফট করতে করতে তার জল ভাঙল। রামা চাকর পাশের বাড়ি থেকে ডনকিনসকে ডেকে নিয়ে এল। ডনকিনস অত রাতে ডক্টর ডাকবেন কোত্থেকে, কোনওরকমে এক প্রতিবেশিনী মিডওয়াইফ দাইকে ডেকে আনলেন।
কিন্তু শেষপর্যন্ত জ্ঞানদার বাচ্চাটাকে বাঁচানো গেল না। অসুখের ফলে তার বাচ্চাটি ছিল রুগণ ও অপরিণত। জন্মের পর জ্ঞানদার কোলেই সে মারা গেল। সেদিন জ্ঞানদার হাপুস কান্নার সময়ে ডনকিনস ছাড়া পাশে কেউ ছিল না।
প্রবাদ আছে বিপদ কখনও একা আসে না। এর কিছুদিন পরেই রামা চাকরের সঙ্গে সমুদ্রতীরে রোদের মধ্যে ছুটোছুটি করে জ্বর বাধাল ছোটছেলে চোবি, চিকিৎসার বিশেষ সুযোগ পাওয়া গেল না, দুদিনের জ্বরে সে মারা গেল। একসঙ্গে দুই সন্তানের মৃত্যুশোকে পাথর হয়ে নির্জন ঘরে একা একা বসে রইলেন জ্ঞানদা।
যেদিন লিস্টার দেখা করতে এলেন, জ্ঞানদা তাঁর সামনে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেললেন। মার কান্না দেখে ছোট বিবি ও সুরেন মাকে জড়িয়ে ধরে। লিস্টার বিবিকে কোলে নিয়ে বলেন, সুইটি পাই, হোয়াই ডোন্ট ইউ সিং আ সঙ! শুনি কী গান শিখেছ স্কুলে, তোমার মায়ের মন ভাল হয়ে যাবে।
সত্যিই বিবির রিনরিনে সুরেলা গলায় ঘরের বাতাসে খুশির ছোঁয়া লাগে। বিবির হাত ধরে নাচতে থাকেন লিস্টার।
তারপর নাচ থামিয়ে জ্ঞানদার পাশে বসে বলেন, ইন্ডিয়ান প্রিন্সেস, ইটস এ পিটি যে তোমার বাচ্চাটিকে বাঁচানো গেল না। ইংলন্ডে কোন বাচ্চাদের জন্মের সময়ে মারা যাবার রেট বেশি জানো, শুনলে আশ্চর্য হয়ে যাবে, যারা হসপিটালে সার্জেনের হাতে জন্মায়। তুলনায় যারা মিড-ওয়াইফের হাতে হয় তাদের বেঁচে থাকার রেট বেশি।
সেকী, জ্ঞানদা সত্যি অবাক হন, মিড-ওয়াইফরা তো আধুনিক বিজ্ঞানের কিছুই জানে না? আমি তো ভাবছিলাম ডক্টর ডাকতে পারলে আমার বাচ্চাটা বেঁচে যেত, দাইয়ের হাতে বলেই মারা গেছে।
