বাচ্চাদের কান্না শুনে একদিন পাশের বাড়ির মিস ডনকিনস দেখতে এলেন। জ্ঞানদার বিপন্ন দশা দেখে অবাক ডনকিনস জিজ্ঞেস করেন, তুমি একা একা বাচ্চাদের নিয়ে এদেশে এলে কেন?
জ্ঞানদা কাতরস্বরে বলেন, আমার স্বামী আমাদের পাঠিয়ে দিয়েছেন বিলিতি আদবকায়দা শেখার জন্য। বাচ্চাদের এখানকার স্কুলে পড়াতে চাই আমরা।
তাই বলে এভাবে একা একা অচেনা দেশে বাস করা যায়? তুমি তো ভাল করে ইংলিশ বলতেও পারছ না! গরমজামা না পরে কীভাবে বরফের মধ্যে নেমে গেলে? পুয়োর লেডি!
ডনকিনসের মায়া হয় এই ভারতীয় মহিলার জন্য। যে নিজেকে বাঁচাতে জানে না, সে বাচ্চাদের বাঁচাবে কী করে? তিনি হাল ধরতে এগিয়ে না এলে সে-যাত্ৰা জ্ঞানদা বাঁচতেন কি না সন্দেহ। ড. জোসেফ লিস্টার নামে এক মেধাবী চিকিৎসককে ডেকে আনলেন ডনকিনস, যিনি তখন অ্যান্টিসেপটিক আবিষ্কারের জন্য বিলেতে খুব সমাদৃত।
লিস্টার এসে জ্ঞানদার অবস্থা দেখে আঁতকে উঠলেন। ফ্রস্টবাইট থেকে ঘা হয়ে সেপটিকের দিকে যাচ্ছে। প্রবল জ্বর, রোগিণী প্রলাপ বকছে। ঘটনাচক্রে লিস্টার ইতিমধ্যে ফেনল অর্থাৎ কার্বলিক অ্যাসিডের মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন বিশল্যকরণী অ্যান্টিসেপটিক। জ্ঞানদাকে পেয়ে নিজের ওষুধগুলি পরীক্ষানিরীক্ষার আরও একটা সুযোগ পেয়ে গেলেন। তিনি মন দিয়ে জ্ঞানদার শরীরের ঘা খুঁটিয়ে দেখেন।
পরপুরুষের প্রথম স্পর্শে জ্ঞানদা কিন্তু ঘোরের মধ্যেও শিউরে ওঠেন। হলই বা ডাক্তার, পুরুষ তো বটে। সুদর্শন মাঝবয়সি এই ডাক্তারকে জ্ঞানদার বেশ পছন্দও হয়। ঠাকুরবাড়িতে নেহাত বিপর্যয় না হলে মেয়ে-বউদের জন্য সাহেব ডাক্তার ডাকা হয় না, জ্ঞানদার সেই অভিজ্ঞতা নেই। তবে লিস্টারের চিকিৎসায় কাজ হল, অল্প অল্প করে সেরে উঠতে লাগলেন জ্ঞানদা। এরকম গভীর অসুখের সময় সত্যেন পাশে নেই, আপনজন কেউ নেই। একটা চিঠি লিখলে একমাস পরে পৌঁছয়। জ্ঞানদার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে।
লিস্টার জানতে চান, ব্রেভ লেডি, তুমি কাঁদছ কেন? তুমি যেরকম একা একা এখানে এসে ছেলেমেয়েদের নিয়ে সংসার করছ, আমি কোনও ইংরেজ মহিলার মধ্যেও এমন দুঃসাহস দেখিনি। তুমি সেরে উঠবে।
জ্ঞানদার মনে হয় লিস্টার যেন স্বর্গ থেকে নেমে আসা দেবদূত। যা কখনও ভাবেননি এমন কাণ্ড করে বসেন তিনি, লিস্টারের হাত চেপে ধরে বলেন, সেভ মি, ইউ আর মাই এঞ্জেল!
ওহ নো! লিস্টার হেসে বলেন, আই অ্যাম আ ডক্টর। ইউ থ্যাঙ্ক মিসেস ডনকিনস ফর ব্রিঙ্গিং মি হিয়ার।
জ্ঞানদা মিসেস ডনকিনসের দিকে তাকিয়ে বলেন, উনি থাকলে তো আমি বিদেশ বিভুঁইয়ে কবে মরে যেতাম।
ডনকিনস জ্ঞানদার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, নো গানাদা, তুমি কখনও মৃত্যুর কথা বলবে না। ব্রাইটনে এসে একজন ইন্ডিয়ান লেডি বিনা চিকিৎসায় মরে গেলে আমাদের লজ্জায় মুখ ঢাকতে হবে। আমরা ইংরেজ মেয়েরা পরস্পরকে সাহায্য করেই বেঁচে থাকি। ইউ আর লাকি যে ডক্টর লিস্টার এসে গেছেন।
জ্ঞানদা বিড়বিড় করে বলেন, এঞ্জেল! এঞ্জেল! প্লিজ সেভ মি।
লিস্টার বললেন, মিসেস টেগোর, তোমার ফ্রস্টবাইট ইনফেকটেড হয়ে গেছে, তাই অন্য ডক্টর সারাতে পারেননি। আর আমি এতদিন ধরে গবেষণা করছি কী করে উড ডিস-ইনফেকটেড করা যায় তাই নিয়েই। ফলে আমি যে ওষুধ দেব, অন্য ডক্টর তা দিতে পারতেন না। ইউ আর রিয়েলি লাকি।
ডনকিনস বলেন, ডক্টর, তুমি যে ওর ওপর এক্সপেরিমেন্ট করছ নিজের ইচ্ছেমতো, এইসব ড্রাগ তো এখনও অ্যাপ্রুভড নয়, কোনও ইংরেজ মহিলার ওপর এই এক্সপেরিমেন্ট করার পারমিশন সহজে পাবে না। এতে কোনও রিস্ক নেই তো!
লিস্টার চটে যান, তোমাদের যদি আমার ওপর ট্রাস্ট না থাকে, আমি চলে যাচ্ছি। তোমার কোনও ধারণা নেই আমি রোজ এই পদ্ধতিতে কত রোগীর চিকিৎসা করি। অ্যান্টিসেপটিক নিয়ে আমার আবিষ্কার অ্যাপ্রুভড তো বটেই, অলরেডি মাচ ডিসকাসড। উন্ড-ড্রেসিংয়ে কার্বলিক অ্যাসিড ব্যবহার করে আমি অ্যামপুটেশন পেশেন্টদের ডেথরেট কত কমিয়ে দিয়েছি তুমি জানো? জানো আমার নামে এ বছরের যুগান্তকারী একটি আবিষ্কার লিস্টারিন। মাউথওয়াশের নাম রাখা হয়েছে? আমার নামে একটি ব্যাকটেরিয়ার নাম রাখা হয়েছে লিস্টারিয়া? তোমার ট্রাস্ট না থাকে, রুটিন ড্রাগ লিখে দিচ্ছি, দেখো মিসেস টেগোরকে বাঁচাতে পারো কি না। কিন্তু ইউ হ্যাভ নো রাইট টু ইনসাল্ট মি। আমি চললাম।
লিস্টারকে রাগ করতে দেখে জ্ঞানদা ভয় পেয়ে যান, দুর্বল শরীরে উঠে বসে লিস্টারের হাত আঁকড়ে ধরেন, ডোন্ট লিভ মি এঞ্জেল! তুমি চলে গেলে আমি আর বাঁচব না। দেখো এই দুর্বল বিদেশিনিকে ফেলে তুমি চলে যাবে? তুমি যে ওষুধ দেবে, তাই খাব। যা বলবে করব। প্লিজ ডোন্ট ডেসার্ট মি।
ডনকিনসও তাড়াতাড়ি বলেন, আমি তা বলিনি ডক্টর, প্লিজ ডোন্ট মিসানডারস্ট্যান্ড মি। আমি ভয় পাচ্ছি গানাডার কিছু হলে ওর বাড়ির লোকেরা আমাকে দুষবে। বাট আই ট্রাস্ট ইউ সেজন্যেই তো ডেকে এনেছি।
লিস্টার কিছুটা নরম হন। এদিকে তার ইন্ডিয়ান পেশেন্ট বিছানায় শুয়ে পড়েছেন আবার, হঠাৎ উত্তেজনার ধকল সামলাতে চেষ্টা করছেন আর বিড়বিড় করে বলছেন, ডোন্ট লিভ মি, প্লিজ ডোন্ট লিভ মি এঞ্জেল।
বিছানায় মিশে থাকা শীর্ণ বিদেশিনির ইথারিয়াল সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে লিস্টারের মায়া হয়, যেন কোন অচিনপুরের রাজকন্যা রুপোর কাঠির ছোঁয়ায় জাগিয়ে তোলার জন্য ডাক পাঠাচ্ছে তাকে। লিস্টার আলতো করে জ্ঞানদার গালে টোকা দিয়ে বলেন, মাই ইন্ডিয়ান প্রিন্সেস, আমি তোমাকে সারিয়ে না তুলে কোথাও যাব না। রোজ সকালে এসে তোমাকে দেখে যাব আমি।
