এ তো তুমি রক্ষণশীল দলের মতো কথা বলছ বউঠান। স্বর্ণ বললেন, মাইকেল মধুসূদন দত্তের উৎসাহে বেঙ্গল থিয়েটারে যখন প্রথম শর্মিষ্ঠা নাটকে মহিলাদের অভিনয় শুরু হল, লোকে রে রে করে উঠেছিল। এমনকী বেঙ্গল থিয়েটারের অন্যতম উদ্যোক্তা বিদ্যাসাগরও মেয়েদের স্টেজে টেনে আনা মানতে পারলেন না, প্রতিবাদে সরে গেলেন। এখনও এ নিয়ে তর্ক চলছে। কিন্তু মেয়েদের অভিনয়ও চলছে। তারা তো অ্যাকটিং করতে পারে সেটা প্রমাণ করেছে, তবে সেটা খারাপ বলব কোন যুক্তিতে?
কাদম্বরী মানেন না, তিনি বললেন, খারাপ এজন্য যে মহিলা দিয়ে অভিনয় করাতে হলে খারাপ মেয়েদের আনতে হচ্ছে, তাতে আমাদের পুরুষদের চরিত্র নষ্ট হচ্ছে। এটা কি ভেবে দেখার দরকার নেই স্বর্ণ ঠাকুরঝি?
বা রে, স্বর্ণ বলেন, তোমার ঘরের লোকটি নষ্ট হয়ে যাবে বলে তুমি ভয় পাচ্ছ, আর সেজন্য ওই পতিতা মেয়েগুলোর উদ্ধারের এমন সুযোগ নষ্ট হবে? নাটকের মধ্যেই তো ওদের মুক্তির সম্ভাবনা। আমরা যখন বাড়িতে নাটক করি, তাতেও তো চরিত্র নষ্ট হতে পারে, সেটা তো ভাবছ না?
তোমার সঙ্গে তর্ক করে জিততে পারব না, কিন্তু আমার ভয় করে, ভাল লাগে না, সেটাও কি তোমার কাছে বলতে পারব না ঠাকুরঝি? স্বর্ণর কাছে সমর্থন না পেয়ে কাদম্বরী ভেঙে পড়েন একটু।
স্বর্ণ কথা ঘোরাতে চান, যখন মেজদাদার কাছে ছিলাম, বোম্বাইতে হ্যামলেট ও ওথেলোর মারাঠি অভিনয় দেখে খুব ভাল লাগেছিল, বেশ দেশজ ছাপ, ওথেলোর মারাঠি চেহারার সঙ্গে ডেসডিমোনার নাকে নথও বেশ মানিয়ে গেছিল, কিন্তু মেয়েদের পার্ট করেছিল পুরুষরাই। ওদের। মেয়েরা আমাদের থেকে অনেক বিষয়ে এগিয়ে, কিন্তু এ ব্যাপারে বঙ্গরঙ্গমঞ্চ যে ওদের টেক্কা দিচ্ছে এটা ভাবতেই ভাল লাগে।
যাক গে, কাদম্বরী গুছিয়ে বসে বলেন, নতুন কী লিখেছ এবার শোনাও দেখি ঠাকুরঝি। রূপাও তার গায়ে গা এলিয়ে জমিয়ে গল্প শুনতে বসল। মেয়েদের ছোট ঘোট সুখ দুঃখ আনন্দ বেদনার অনুরণনে ভরপুর হয়ে উঠল অন্দরের এই সাহিত্যবাসর।
১২. জ্ঞানদানন্দিনীর বিলেতবাস
ব্রাইটনে প্রথম খ্রিসমাসের সন্ধ্যাটা বেশ আনন্দে কাটল জ্ঞানদার। অনেকদিন বাড়িছাড়া। কাছের লোকেরা কেউ নেই। তবুদীর্ঘ রোগভোগ ও সন্তানশোকের কালো দিনগুলো পেরিয়ে অনেকদিন পর ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিয়ে হাসলেন জ্ঞানদা। যাঁর চিকিৎসায় সেরে উঠলেন সেই ডক্টর জোসেফ লিস্টারকে কৃতজ্ঞতা জানাতেই নিজের ভাড়াবাড়িতে ছোট্ট পার্টি ডেকেছেন তিনি। অতিথিদের মধ্যে আর আছেন পাশের বাড়ির মিসেস ডনকিনস, বিলেতবাসী জ্ঞানেন্দ্র ঠাকুর ও তার মেয়েরা। বিলেতের প্রবাস জীবনে এঁরা কয়েকজনই তার কাছের মানুষ।
সমুদ্রতীরে নিরালা একটি জায়গায় সার সার কতগুলো বাড়ির নাম মেদিনা ভিলা, তারই একটিতে বাচ্চাদের নিয়ে সংসার পেতেছেন জ্ঞানদানন্দিনী। ভিলা অবশ্য নামেই, ছোট ছোট বাড়ি, সামনের বাগানে দু-চারটি গাছগাছালি। দেশের তুলনায় ঘরগুলো ছোট ছোট, ছাদ নিচু, চারদিকে জানলা বন্ধ করে রাখা শীতের ভয়ে। একটু বাতাস আসার ফাঁক নেই, শুধু জানলাগুলো কাঁচের বলে আলো আসতে বাধা নেই। নিজস্ব গৃহিণীপনায় ছোট ছোট ঘরগুলোকেই চমৎকার বিলিতি কায়দায় সাজিয়ে নিয়েছেন জ্ঞানদা।
তবে এ-সব সাজানো-গোছানো তত বাইরের ঠাট বজায় রাখার জন্য। মন ভাল রাখতেও এ-সব নিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন জ্ঞানদা। কিন্তু আসলে তিনি মোটেই ভাল নেই। তিনটি শিশুকে নিয়ে বিদেশ বিভুইয়ে একা বসবাস করতে গিয়ে হিমসিম খাচ্ছেন। উপরন্তু তিনি এখন অন্তঃসত্ত্বা। জ্ঞানদার মাঝে মাঝে রাগ হয় সত্যেনের ওপর, এরকমভাবে কেউ নির্বাসনে পাঠায়? মাঝে মাঝে তার কান্না পায়, কেন যে সত্যেনের কথা শুনে এখানে চলে এলেন! সত্যেন ভাবুক মানুষ, সংসার সম্বন্ধে তার কোনও কাণ্ডজ্ঞান নেই। বউ যে। এখানে অথই জলে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে, সে বোধটাও তার নেই।
ভরসা বলতে রামা চাকর আর দু-একজন প্রতিবেশিনী মেমসাহেব। ব্রাইটনে আসার আগে আরও দু-চারবার বাড়ি বদল করতে হয়েছে তাকে। জাহাজ থেকে নেমে প্রথমে উঠেছিলেন প্রসন্নকুমার ঠাকুরের ত্যাজ্যছেলে জ্ঞানেন্দ্রর বাড়িতে। জ্ঞানেন্দ্র খ্রিস্টান হয়ে রেভারেন্ড কৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মেয়েকে বিয়ে করে বাপের বিরাগভাজন হয়েছেন। সেই থেকে বিলেতেই বাসা বেঁধেছেন সপরিবারে। জাহাজ থেকে বাচ্চাকাচ্চাসহ জ্ঞানদাকে একা নামতে দেখে তিনিও চমকে উঠে ভেবেছিলেন, এটা সত্যেন কী করল!
জ্ঞানেন্দ্র কিছুদিন পর অন্য বাড়ি ভাড়া করে জ্ঞানদার থাকার ব্যবস্থা করলেন। জ্ঞানেন্দ্রর দুই তরুণী মেয়ে সতু আর বালা মাঝে মাঝেই জ্ঞানদার কাছে চলে আসেন, ওঁকে নিয়ে পাড়া বেড়াতে বেরোন। জ্ঞানদাও ওঁদের আসার পথ চেয়ে বসে থাকেন।
বিলেতের ভাড়া বাড়িতে বাড়িওলির সঙ্গে খাবার জোগানের চুক্তি থাকে বলে জ্ঞানদাকে রান্নাবান্নার ঝামেলায় যেতে হয়নি। কিন্তু ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা অসুখ-বিসুখ সামলাতেই এসে অবধি নাজেহাল হয়ে পড়ছেন তিনি। তার ওপর কিছুদিনের মধ্যেই তীব্র শীত এসে পড়ল।
জানলা দিয়ে প্রথম বরফ পড়া দেখে জ্ঞানদা দারুণ উত্তেজিত। সব লোকজন রাস্তায় নেমে পড়ে বরফ গায়ে মাখছে। আনন্দে তিনিও ছুটে বাইরে বেরিয়ে পড়লেন, গায়ে তখন শুধু একটা পাতলা সিল্কের শাড়ি। বাড়িওলি বারণ করলেও না শুনে তিনি আনন্দে বরফ কুড়োতে লাগলেন। তারপর রাত থেকে ধুম জ্বর, গা ব্যথা। ক্রমশ জ্বর বাড়তে লাগল আর হাত ফুলে লাল হয়ে গেল। রামা চাকর ডাক্তার ডেকে আনলেও খুব একটা উন্নতি হল না। হাতে ঘা হয়ে বিছানায় শুয়ে কাতরাতে লাগলেন জ্ঞানদা।
