ব্রাহ্মসমাজের ভেতরে আর-একটি বিষয় নিয়েও গোলমাল বেধে গেছে, আর তার মূলেও আছেন কেশবচন্দ্র। ব্রাহ্মরাই অনেকদিন মেয়েদের বিয়ের বয়স বাড়ানোর আন্দোলন করে ব্রিটিশরাজকে দিয়ে আইন চালু করালেন। কিন্তু তাদের নেতা কেশব সেনের চোদ্দো বছরের কিশোরী কন্যা সুনীতি কোচবিহারের মহারাজা দীপেন্দ্রনারায়ণের প্রেমে পড়লেন। কেশব সেই বিয়েতে সম্মতি দিতেই ব্রাহ্মসমাজে শোরগোল শুরু হল। ব্রাহ্ম তরুণদের চোখে কেশবের ভাবমূর্তি ছোট হয়ে গেল, তার কাছে এরকম ভণ্ডামি তারা আশা করেনি।
কেশবের যুক্তি হল ওরা এখন শুধু বিয়েটাই করবে, একসঙ্গে বসবাস করবে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর। দীপেন্দ্রনারায়ণ বিয়ের পরপরই দীর্ঘদিনের জন্য বিদেশ ভ্রমণে যাবেন, আর সুনীতি থাকবেন বাপের বাড়িতে। কিন্তু এই যুক্তিতে বিদ্রোহ আটকানো গেল না। কেশব মেয়ের সাধাসাধিতে নাবালিকা বয়সে সুনীতির বিয়ে দিলেন, আর ব্রাহ্মসমাজ ভেঙে দু টুকরো হয়ে গেল।
এই বিয়ে নিয়ে ঠাকুরবাড়ির মেয়েরাও উত্তেজিত। কেশব সেনের পরিবারের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বহুদিনের। ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করায় কেশবের বাবা তাকে ত্যাগ করেছিলেন। উচ্চবর্ণের হিন্দু যুবকদের কেউ কেউ ব্রাহ্ম হয়ে যাচ্ছিলেন বলে সেইসময় হিন্দুসমাজে অশান্তি ছিলই। কেশব ঠিক করলেন গৃহত্যাগ করবেন। মহর্ষি দেবেন ঠাকুর তার আদর্শ, তিনিই হয়ে উঠলেন আক্ষরিক অর্থে তার আশ্রয়দাতা। কেশব সস্ত্রীক ঠাকুরবাড়িতে আশ্রয় নিলেন কিছুদিনের জন্য। জ্যোতি, রবি, স্বর্ণকুমারীরা তখন বালক বালিকা, কেশবের চেয়েও তাদের বেশি ভাব হল তার স্ত্রীর সঙ্গে। একসঙ্গে বসবাসের পাট মিটে গেলেও তাদের যোগাযোগটা থেকে গিয়েছে। এমনকী দেবেনের সঙ্গে কেশবের মনোমালিন্য ও বিচ্ছেদের পরেও পারস্পরিক আগ্রহটা কমেনি।
তেতলার ঘরে কাদম্বরীকে স্বর্ণ বলছিলেন, সুনীতির বিয়ে নিয়ে কী হইচই না হচ্ছে বউঠান, কেশবদাদার ওপর সবাই রেগে যাচ্ছেন সুনীতির জন্য।
কাদম্বরী তাকিয়ায় ঠেসান দিয়ে বিছানায় বসে কালো ভেলভেটের ওপর জরির নকশা তুলছিলেন, ছুঁচে সুতো পরাতে পরাতে চোখ তুলে বললেন, যাই বলো ঠাকুরঝি, সুনীতির সাহস আছে। বাবার পছন্দের পাত্রকে বাতিল করে নিজে প্রেম করল রাজকুমারের সঙ্গে! আবার বাবাকে দিয়ে সেই সম্পর্ক মানিয়েও নিল।
স্বর্ণ বলেন, শুধু মানিয়ে? মেয়ের আবদার মানতে গিয়ে বাবা এমন নাকানি চোবানি খাচ্ছেন নিজের বন্ধুবান্ধবদের কাছে, ভাবা যায়! কোনও বাঙালি মেয়ের ভাগ্যে এমন পিতৃস্নেহ আগে কখনও জোটেনি। নিজের পছন্দে বিয়ে করার মজাটা আমরা পাইনি, সুনীতি করে দেখাল।
আমিও করব, নিজের পছন্দমতো বিয়ে, হঠাৎ পাশ থেকে বলে ওঠে রূপা। সে কখন এসে বসেছে ওঁদের পেছনে লক্ষ করেননি স্বর্ণ বা কাদম্বরী। রূপার কথা শুনে চমকে উঠে কাদম্বরী তাকে ধমক দেন, তুই বেশি পাকা হয়ে গেছিস না রূপা!
বা রে, রূপা অভিমান করে ঠোঁট ফোলায়, এই তো তোমরা কেমন সুনীতির প্রেমের বিয়ের তারিফ করছিলে, আমি করলেই দোষ?
তোর কি অমন স্নেহশীল বাবা আছে? কাদম্বরী বললেন, তুই কিছু বেফাঁস কাজ করলে সবাই আমাকেই দুষবে। তোর জন্য এত কথা শুনতে হয়, আমি ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকি। রূপা, তুই কি আমাকে আরও বিপদে ফেলবি?
রূপা কাদম্বরীর কোলে মুখ গুঁজে বলতে থাকে, আমার এ-সব ঘোড় বড়ি খাড়া জীবন ভাল লাগে না নতুনবউঠান। আমি মুক্তি চাই, বিরাট পৃথিবীতে আমি পাখির মতো উড়ে বেড়াতে চাই।
স্বর্ণ এবার বিরক্ত হয়ে বলেন, সে তো সবাই চায় রূপা। অমন স্বপ্ন সবাই দেখে, তাই বলে বাস্তবে সেটা করা যায় না। বাচ্চাদের মতো কথা বলছিস, আর কবে তোর বুদ্ধি হবে?
রূপা বলে, চাইলে স্বপ্নকে সফল করা যায়, তোমরা তেমন করে চাও না তাই। চলো না আমরা তিনজনে পাহাড় সমুদ্র দেখতে বেরিয়ে পড়ি, শুধু আমরা তিনজন, আর কেউ না।
কাদম্বরী হাসতে থাকেন। রূপা তার সেলাই ধরে টানে, কার জন্য সেলাই করছ? জ্যোতিদাদার জন্য আর কত নকশা তুলবে? যত সুন্দর সুন্দর জামা জুতো করে দেবে তত তাকে দেখে পাগল হবে স্টেজের নটীরা। তখন তো তুমি কাঁদতে বসবে!
হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যায় পরিবেশ। কাদম্বরীর থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে স্বর্ণ রূপাকে ধমক লাগান, নতুনবউঠানের প্রশ্রয়ে তুই যা নয় তাই বলছিস রূপা, দেখ তাকেই আঘাত দিয়ে বসেছিস! তোর কি কোনওদিন আক্কেল হবে না?
কাদম্বরী হাত তুলে থামতে বলেন স্বর্ণকে, ও তো ভুল কিছু বলেনি ঠাকুরঝি। যে-কথা তোমরা উচ্চারণ করো না, ও বোকা বলে সেটাই বলে ফেলেছে। সত্যিই আজকাল আমি কান্নাকাটি করি, তোমার নতুনদাকে ঘিরে এখন অনেক অপ্সরী কিন্নরীর মেলা। তবে এটা তার জন্য নয়। রবির জন্য একটা নকশাতোলা জুতো সেলাই করছি, দূরে চলে গেছে বলে তার কথা বড্ড মনে পড়ে।
স্বর্ণ বলেন, এটা তুমি নতুনদার ওপর অন্যায় রাগ করছ নতুনবউঠান। তিনি রূপবান গুণবান পুরুষ, অভিজাত রমণীরাই তাকে দেখে মুগ্ধ হন তো পাঁচপেঁচি বারাঙ্গনা নটীরা তো পাগল হবেই। তাতে নতুনদার কী দোষ হল। তিনি কি নাটক করানো বন্ধ করে দেবেন?
তা কেন? কাদম্বরী বলেন, নাটক করাতে হলে বারাঙ্গনাদের দিয়েই
অভিনয় করাতে হবে এমন তো কোনও কথা নেই? তাদের বাদ দিয়ে এতদিন নাটক হয়েছে, এখন কেন হবে না।
