ব্রাহ্মসমাজের নেতা কেশব সেনকে নিয়ে একটু সমস্যা হচ্ছে অ্যানেটের। সমস্যাটা শুরু হয়েছিল দু’বছর আগে, যখন নারীশিক্ষা নিয়ে অ্যানেট এক্রয়েডের সঙ্গে তর্ক বাধিয়েছিলেন কেশব। তখন উদারপন্থী ব্রাহ্মদের অনেকেরই ভুরু কুঁচকেছিল।
ইউরোপে থাকতেই ব্রাহ্ম মনোমোহন ঘোষের সঙ্গে বন্ধুত্ব অ্যানেটের। মনোমোহন ও তার স্ত্রী কিছুটা বিলিতি কেতায় অভ্যস্ত বলেই হয়তো বন্ধুত্বটা তাড়াতাড়িই গাঢ় হয়ে উঠেছে। নারীশিক্ষায় ব্রাহ্মসমাজের উদ্যোগের কথা লন্ডনে বসেই জেনেছিলেন অ্যানেট। সেখানে ব্রাহ্মনেতা কেশবের সঙ্গে আলাপ করে তাঁকে নারীস্বাধীনতার প্রবক্তা বলেই মনে হয়েছিল অ্যানেটের।
কিন্তু কলকাতায় এসে দেখলেন শিক্ষানীতির প্রশ্নে কেশবের সঙ্গে একমত হওয়া সম্ভব না। রক্ষণশীল কেশবের ধারণা, শিক্ষার নামে অঙ্ক ও বিজ্ঞান শিখিয়ে বাঙালিনিদের মেমসাহেব তৈরি করার চেষ্টা চলছে, তাদের এ-সবের কোনও প্রয়োজন নেই। মেয়েদের এমন কিছুই শেখানো উচিত নয় যাতে তারা ঘরকন্না ফেলে অন্যদিকে মন দেয়। মেয়েদের স্কুলে তিনি শুধু সাহিত্য ও কলাশাস্ত্র পাঠের ব্যবস্থা করেছেন।
অ্যানেট এক্ৰয়েড এটা একেবারেই মানতে পারেন না। তিনি মনোমোহন ঘোষের বাড়িতে একটি সভা ডেকেছেন। তিনি সভার কাছে প্রথমেই জানতে চান, আপনারা কি সত্যি ফিমেল এডুকেশন চান, তা হলে কেশববাবুর অন্যায়ের প্রতিবাদ করুন।
শিবনাথ শাস্ত্রী সেখানে উপস্থিত, তার মতে কেশবচন্দ্র রক্ষণশীল হয়ে পড়েছেন। এখন মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার সময়। ইউরোপের মহিলারা যা পারে আমাদের মেয়েরাও পারবে।
মনোমোহন ঘোষ, দ্বারকানাথ গাঙ্গুলি প্রমুখ কয়েকজন উদার বাঙালি ভদ্রলোকও বিজ্ঞান শেখানোর ব্যাপারে মিস এক্রয়েডের সঙ্গে একমত হলেন।
ঠাকুরবাড়ির স্বর্ণকুমারীকে তিনি ডেকে এনেছেন এই সভায়। অ্যানেট তার দিকে তাকিয়ে বলেন, শুধু পুরুষেরাই সবকিছু ঠিক করে দেবে তা হতে পারে না। তুমি বলো, তোমার কী মত?
এর আগেও বেশ কয়েকবার অ্যানেটের আমন্ত্রণে এসেছেন স্বর্ণ, সে অবশ্য সাহিত্যবাসরে। মাঝে মাঝেই মেয়েদের নিয়ে আসর বসান অ্যানেট। মনোমোহনের বাড়িতেই আসর বসে কারণ অ্যানেট সেখানেই আতিথ্য নিয়েছেন। এ ব্যাপারে গৃহিণীও তাকে খুব সাহায্য করেন।
অ্যানেটের প্রশ্নে স্বর্ণ বললেন, আমরা ছেলেবেলা থেকেই বাবামশায়ের কাছে বিজ্ঞানের পাঠ নিয়েছি। বাড়ি থাকলে তিনি মাঝে মাঝেই ছেলেমেয়েদের আকাশের নক্ষত্র চেনান, বিজ্ঞানের পাঠ দেন। সেজন্য সাহিত্য ও বিজ্ঞান দুটি দিকেই আমার অন্তরের টান। আমার মতে মেয়েদের অবশ্যই গণিত ও বিজ্ঞানের পাঠ দেওয়া উচিত। বিজ্ঞানমনস্কতা না এলে মেয়েদের মনের কুসংস্কার কাটবে না।
অ্যানেট স্বর্ণকে জড়িয়ে ধরেন। উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন, কেশববাবুর এসে দেখে যাওয়া উচিত বাঙালি মেয়েরা কী বলছে!
আমন্ত্রিতদের মধ্যে হ্যারি শেফার্ডও বসে ছিলেন, অ্যানেটের নানা কাজের সঙ্গী তিনি। রূপকুমারী তার পাশে বসেছে দেখে অনেকেই ভুরু কুঁচকে তাকাচ্ছেন। স্বর্ণ সেটা লক্ষ করে রূপাকে ডেকে বললেন, আমার পাশে এসে বোস না রূপা।
হ্যারি হঠাৎ বলে ওঠেন, আপনারা বাঙালি মেয়েদের এডুকেশন দিতে চান, বিজ্ঞান পড়াতে চান, অথচ পুরুষের সঙ্গে কথা বলতে দেন না, এটা কীরকম?
উপস্থিত সকলেই একটু বিব্রত হলেন। বিরক্তও। শিবনাথ বললেন, আমরা মেয়েদের বাঙালিয়ানা বজায় রেখেই পশ্চিমি শিক্ষা দিতে চাই, বাইরের অনাত্মীয় পুরুষদের সঙ্গে মেলামেশা না করলেও শিক্ষিত হওয়া যায় হ্যারি।
কিন্তু নারীপুরুষ মেলামেশা না করলে মনের প্রসারতা বাড়বে কী করে? অ্যানেট হ্যারিকে সমর্থন করেন, আমাদের দেশের মেয়েরা স্বচ্ছন্দে মেলামেশা করে বলেই সমকক্ষতার দাবি করতে পারছে। স্বর্ণ, তুমি এত প্রগতিশীল হয়েও এখনও যে বাইরে বেরোলে ভেইল ব্যবহার করো এটার কী প্রয়োজন?
স্বর্ণকুমারী শাড়ির সঙ্গে একটা আলাদা কাপড়ের ঘোমটা লাগিয়েছেন মাথায়, তার ওপর একটা ছোট্ট টুপি। তিনি এই প্রশ্নে বিরক্ত হন, এ আমাদের দেশাচার অ্যানেট, ঘোমটা পরা-না-পরার সঙ্গে প্রগতির কোনও সম্পর্ক নেই। আর আমাদের মেয়েরা অনেক যুগের পর বাইরে বেরচ্ছে, তাদের একটু বেচাল দেখলে লোকে ছি ছি করে, পুরুষের সঙ্গে মেলামেশার ক্ষেত্রে একটু সাবধানে চলাই ভাল।
হ্যারির রাগ হয় রূপাকে তার পাশ থেকে উঠিয়ে নেওয়া হল বলে। বলেন, ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা খুব অগ্রসর, অথচ আমি শুনেছি তারা বাইরের পুরুষদের সঙ্গে কথা বলেন না। তার মানে তো এখনও তারা পরদাপ্রথা বাঁচিয়ে রাখছেন। কেন আমরা পুরুষেরা কি খুব খারাপ লোক?
রাগে স্বর্ণর ফরসা গালদুটি লাল হয়ে ওঠে। অগ্নিদৃষ্টিতে রূপার দিকে তাকান তিনি। তারপর বলেন, আমি মনে করি বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে নয়, আমাদের স্ত্রীস্বাধীনতা আসবে সম্মতির পথে। হঠাৎ করে ঘোমটা খুলে সমাজকে আঘাত দিলেই স্ত্রীস্বাধীনতা স্বর্গ থেকে খসে পড়বে না।
.
এ-সব আলোচনার মধ্য দিয়েই সেদিনের সভায় বিক্ষুব্ধ ব্রাহ্মরা অ্যানেট এক্রয়েডের উদ্যোগে নতুন মহিলা বিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিলেন। তাদের উদ্যোগেই তৈরি হল হিন্দু মহিলা বিদ্যালয়, যেখানে পরিণত মেয়েদের কলা ও বিজ্ঞান শেখানো শুরু হল। অ্যানেট অনেকদিন পর্যন্ত এই স্কুলের দায়িত্বে ছিলেন। অ্যানেটের বিয়ের পর নানা কারণে এই স্কুলটি বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয় নামে কিছুদিন চলার পর বেথুন কলেজের সঙ্গে মিশে যায়। কিন্তু কেশবের সঙ্গে তখন থেকেই প্রগতিশীল ব্রাহ্মদের দূরত্ব তৈরি হয়ে গেল।
