হ্যারি বললেন, আমাদের দেশে পুরুষরাও ইকোয়াল রাইটস নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবছে। মেয়েরাও খুব উৎসাহিত।
রূপা নিজের আবিরমাখা চুলের গুচ্ছ নিয়ে খেলা করতে করতে বলে, তোমাদের দেশের মেয়েরা এত লড়াকু, তা হলে কোনও মেয়ে বুঝি কিছু লেখেনি?
না না, মহিলারা না বললে স্ত্রীস্বাধীনতার প্রয়োজনটা কোনওদিন খেয়াল করতামই না আমরা পুরুষেরা। রূপার জিজ্ঞাসু মুখের দিকে তাকিয়ে হ্যারি জানালেন, আরও একশো বছর আগেই মারি উলস্টোনক্রাফট নামে একজন মহিলা মেয়েদের অধিকার নিয়ে একটা সাংঘাতিক বই লিখেছিলেন, তিনিই প্রশ্ন তোলেন, পুরুষের মনোমতো পুতুল হয়ে মেয়েদের বেঁচে থাকতে হবে কেন? মেয়েরা সহযোগী হয়ে পুরুষকে ভালবাসবে কিন্তু তার শাসনদণ্ড মেনে নেবে কেন? এসব প্রশ্ন তুলে তাকে অবশ্য অনেক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল তখন। এখন তার বই মাথায় তুলে নিয়েছে স্যাফ্রোজিস্টরা।
কী, কী বললে? রূপা বুঝতে পারে না কথাটা। হ্যারি হেসে রূপার থুতনি নেড়ে দিয়ে বলেন, স্যাফ্রোজিস্ট মানে যে মেয়েরা ভোটাধিকারের লড়াই করছে রাস্তায় নেমে। বুঝেছ?
ইস, আমিও যদি ওদের সঙ্গে রাস্তায় নেমে লড়াই করতে পারতাম! রূপা বলে, স্বর্ণদিদিকে বলতে হবে এ-সব গল্প। স্বর্ণদিদি রাজি হলে আমরা দুজনে মিলে স্যাফ্রোজিস্ট দলে নাম লেখাতে পারি।
আমার সঙ্গে যাবে? রূপার চোখে চোখ রেখে হঠাৎ গাঢ় স্বরে জানতে চান হ্যারি। চলো দূরে কোথাও চলে যাই, যেখানে কোনও বাধানিষেধ নেই, যাবে?
রূপা উত্তেজনায় হ্যারির হাত চেপে ধরে, যেতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে জানো! কিন্তু জানতে পারলে সবাই হাঁ হাঁ করে উঠবে। নতুনবউঠানকে না বলে আমি যেতে পারব না।
হ্যারি দুষ্টু হেসে বলেন, তা হলে আর তোমার স্বাধীন হওয়া হল না। এই বিরাট পৃথিবী তোমাকে ডাকছে। আর তুমি তুচ্ছ চৌকাঠে আটকে আছ।
না না, স্বাধীন আমাকে হতেই হবে। চৌকাঠে আটকে আমার জীবন কেটে যাবে তা হবে না। রূপার গলায় প্রত্যয় ফোটে।
তুমি পারবে না, হ্যারি হাসেন। রূপা রেগে ওঠে, কেন পারব না, বলো কী করতে হবে?
আমাকে চুম্বন করতে পারবে? হ্যারির ঠোঁটে রহস্যময় হাসি।
এই প্রস্তাবে রূপার সরলতা কেঁপে ওঠে, কিন্তু তার সঙ্গে স্বাধীনতার কী সম্পর্ক?
আমাদের দেশে ডেটিং না করলে কেউ প্রাপ্তবয়স্ক হয় না। হ্যারি বলেন, ডেটিংয়ের একটা প্রধান অংশ চুম্বন। তুমি যদি আমাকে চুম্বন না করে তা হলে তুমি আমাকে ভালবাসো কি না কী করে বুঝব? তোমাকে নিয়ে এ-বাড়ির উঠোন থেকে পালাতে হলে আগে এই চুম্বন পরীক্ষায় পাশ করতে হবে।
যাঃ, রূপা লজ্জায় ভোরের আকাশের মতো লাল হয়ে যায়। হ্যারি নিজের দু হাতের মধ্যে রূপার মুখটি তুলে ধরে, দুটি ঠোঁট পরস্পরের দিকে ঝুঁকে পড়তে থাকে। তখনই দূর থেকে কে যেন রূপার নাম ধরে ডেকে ওঠে, চকিতে হ্যারির স্পর্শ ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ায় রূপা। চুম্বনটি অর্ধসমাপ্ত থেকে যায়।
.
সরলা গানের জন্য রূপাকে ডাকাডাকি করছিল। ওদিকে জ্যোতি ঠাকুর তখন গলা খুলে গান শুরু করেছেন, প্রতিভা, সরলা ইত্যাদি বালিকারাও রংখেলা ফেলে যোগ দিয়েছে গানের কোরাসে। গানবাজনার আসর জমাতে রঙে চুপচুপে গুণেন্দ্র তবলা বাজাতে বসে গেলেন।
স্বর্ণকুমারী যত-না রং খেলছেন তার চেয়ে বেশি দুচোখ ভরে দেখছেন সব। যেন সেকালের বসন্ত উৎসবের একটা টুকরো হঠাৎ খসে পড়েছে জোড়াসাঁকোর বাগানে। দেখতে দেখতেই তার মাথায় আসে একটি গীতিনাট্যের পরিকল্পনা।
কিছুদিনের মধ্যেই বসন্ত উৎসব গীতিনাট্যটি লিখেও ফেললেন স্বর্ণ। জ্যোতি খুব খুশি হয়ে বাড়ির ছেলেমেয়েদের নিয়ে অভিনয়ের তোড়জোড় শুরু করলেন। সংগীতের মহাহিল্লোলে মুখরিত হয়ে উঠল সারা বাড়ি। সবাইকে জড়ো করে কাজ করতে জ্যোতির জুড়ি নেই। রিহার্সাল চলছে আর সবার মনে মনে ভাসছে সুর। বালিকা সরলা সারাদিন গুনগুন করছে মায়ের লেখা গান, চন্দ্ৰশূন্য তারাশূন্য মেঘান্ধ নিশীথ চেয়ে/দুর্ভেদ্য অন্ধকারে হৃদয় রয়েছে ছেয়ে।
নাটকে গানটি গাইলেন অবশ্য কাদম্বরী। তার বড় বড় চোখে, ঢলঢল খোলা চুলের রাশিতে এই শোকসংগীত যেন অপার্থিব সুরের মায়ায় ভাসিয়ে দিল সবাইকে।
রূপার গানের গলাটিও সুন্দর হয়েছে, তাকে কোরাসে গলা মেলানোর জন্য ডাক দিলেন জ্যোতি ঠাকুর। কিন্তু কাদম্বরী লক্ষ করেছেন, মহড়ায় ঘনিষ্ঠ দু-এক জন বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে হরিসাহেবও এসে বসে থাকেন। বাঙালিদের গানবাজনায় তাঁর খুব আগ্রহ। বাউলদের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে বাউল সংগীত শিখেছেন কিছু এখন আবার ঠাকুরবাড়ির গানে অন্যরকম মজা পাচ্ছেন। কিন্তু রূপার সঙ্গে ফুসফুস কথা বলা দেখলেই মাথা গরম হয়ে যায় কাদম্বরীর, কী করে যে সামলাবেন এই দস্যি মেয়েকে! একচুল এদিক ওদিক হলে তো বাড়ির মেয়েমহল তাকেই কথা শোনাবে। এমনকী বিলেত থেকেও জ্ঞানদানন্দিনী চিঠিপত্রে সব খোঁজখবর নেন, রূপার চালচলন সম্বন্ধে ওখান থেকেও তার নজরদারি অব্যাহত।
.
রূপাকে নিয়ে স্বর্ণ একদিন এলেন অ্যানেট এক্রয়েডের কাছে। কিছুদিন হল কলকাতায় আছেন অ্যানেট, এখানকার মেয়েদের শিক্ষিত করতে তিনি বিশেষ ভূমিকা নিয়েছেন। এ ব্যাপারে তার প্রেরণা মেরি কার্পেন্টার, যিনি এর আগে দু-তিনবার ভারতে আসা-যাওয়া করে ব্রাহ্মসমাজের সাহায্যে মেয়েদের স্কুল শুরু করতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। অ্যানেট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রায়ই বন্ধুস্থানীয় ব্রাহ্মদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন, এবারেও সবাইকে ডাক পাঠিয়েছেন।
