ধর্ম নিয়ে দুবাড়ির বিভেদ হলেও ছেলেমেয়েদের মনের টান রয়ে গেছে। ৬ নম্বরের ব্রাহ্ম বিয়েতে ৫ নম্বরের হিন্দু আত্মীয়রা আসেন না, আবার ৫ নম্বরের বিয়েতে ৬ নম্বর বাড়ির আসেন না। কিন্তু প্রতিটি বিয়ে উপলক্ষেই থিয়েটার বা গানের আসর বসানো হয়, যেখানে ৫ এবং ৬ মিলেমিশে আনন্দ করে। এইসব আয়োজনে গুণেন খুব উৎসাহী। গোপাল উড়ের যাত্রা দেখে উৎসাহিত হয়ে গুণেন আর জ্যোতি মিলে বাড়িতে জোড়াসাঁকো নাট্যশালা তৈরি করেছেন। নবনাটক সেখানেই অভিনীত হয়েছিল, বসন্ত উৎসবের নাচগানও সেই মঞ্চে। আপন ঔদার্যে সকলকে জড়িয়ে নিয়ে উৎসবে মেতে উঠতে গুণেনের জুড়ি নেই।
সুতরাং এক বসন্তসন্ধ্যায় রঙিন আলোয় আর আবিরে বৈঠকখানা-বাড়ির বাগান হয়ে উঠল নন্দনকানন। পিচকারিতে রংখেলাও বাদ রইল না।
বসন্ত উৎসবে ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাও আমন্ত্রিত। অক্ষয় ও শরৎকুমারী এমন সমাবেশে পুলকিত হয়ে নিজেরা পরস্পর রং মাখাচ্ছেন।
কাদম্বরী সেজেছেন সোলিনীর মতো। বেলফুলের মালা জড়ানো কবরীতে পিন করা জর্জেটের ওড়না, হাতে মাধবীলতার কঙ্কণ, গলায় মাধবীমালা, কানেও ঝুমকোর মতো একগুচ্ছ মাধবীফুল। তাকে দেখে জ্যোতিও মুগ্ধ হয়ে দুহাত বাড়িয়ে ডাক দিলেন, অয়ি মাধবিকা কুসুমনন্দিতা!
কাদম্বরীও হাত বাড়িয়ে জ্যোতির সাদা জামায় আবির ছড়িয়ে দিয়ে বললেন, ওহে আবিরলাঞ্ছিত যুবা, এসো আমরা বসন্তের আবাহন করি।
কন্দর্পনিন্দিত জ্যোতিরিন্দ্র ও অপরূপা কাদম্বরীর এই কৌতুকনাট্য সকলেই মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকেন, তারা যেন এই লৌকিকস্তর থেকে ঊর্ধ্বে কোনও মায়াজাল রচনা করেছেন বাগানে।
একটু পরেই আবার সে-দৃশ্য ভেঙে আর-একটি দৃশ্যের জন্ম হয়। যেন। নাটকের পালাবদলের মতো এক-এক টুকরো কথা, সংলাপ, ভঙ্গি, দৃশ্য ছড়িয়ে পড়তে থাকে বসন্তের বাগানে।
একসময় বিহারীলাল অঞ্জলিভরা আবির নিয়ে এগিয়ে আসেন কাদম্বরীর দিকে। আঙুলে করে গুঁড়ো গুঁড়ো লাল, সবুজ, গোলাপি বৃষ্টির মতো ছড়িয়ে দিতে থাকেন কাদম্বরীর মাথায়, গায়ে, সারা শরীরে। কাদম্বরীও কিশোরীর উচ্ছ্বাসে গোল হয়ে ঘুরে ঘুরে ভিজতে থাকেন সেই আবিরবর্ষণে।
ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎই কাদম্বরীর চোখ পড়ে রূপার দিকে, এক গোরাসাহেব রূপাকে আচ্ছা করে আবির মাখাচ্ছে আর রূপা বেহায়ার মতো খিলখিল হাসিতে লুটিয়ে পড়ছে। এর সঙ্গেই তো রূপার খুব মাখামাখি শোনা যাচ্ছে! কাদম্বরীর মেজাজ খারাপ হয়ে যায় রূপার বেহায়াপনায়।
রূপা সাহেব যুবকটির হাত ধরে টানতে টানতে কাদম্বরীর কাছে নিয়ে আসে, দেখো নতুনবোঠান, তোমাকে দেখে পরি ভেবেছে হরিসাহেব, তোমাকে বলছে এঞ্জেল। আমি আলাপ করতে ধরে এনেছি।
কাদম্বরী তার হাত ধরে দূরে টেনে নিয়ে এসে বলেন, তোর কি কোনওদিন বোধবুদ্ধি হবে না রূপা? কোথাকার একটা ফিরিঙ্গি সাহেবকে হাত ধরে টানছিস, পরপুরুষের গায়ে হাত দিতে নেই জানিস না? আর আমি কি অচেনা লোকের সঙ্গে কথা বলি কোনওদিন?
রূপা কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে, বা রে, তুমি যে বিহারীবাবুর সঙ্গে আবির খেলছ, তার বেলা? হরিসাহেব তো জ্যোতিদাদার বন্ধু, তিনিই নেমন্তন্ন করেছেন, তার হাত ধরলে কী হয়?
রূপার সাহস দেখে স্তম্ভিত কাদম্বরী বললেন, শোন রূপা, আমি কোনওদিন বিহারীলালবাবুর হাত ধরে কথা বলিনি, আমাদের বাড়ির মেয়েরা শিক্ষিত হলেও পরপুরুষের সঙ্গে কথা বলে না, কারণ তাতে বাড়ির মর্যাদা নষ্ট হয়। আমি শুধু বিশেষ দু-চারজনের সঙ্গেই কথা বলি যাঁরা সজ্জন, প্রতিভাবান এবং আমার স্বামীর বিশেষ বন্ধু। তোর এতবড় সাহস যে আমার সঙ্গে নিজের তুলনা করিস?
রূপা গোঁজ হয়ে বলে, কিন্তু, হরিসাহেব আমার বন্ধু। আসলে ওর নাম হ্যারি শেফার্ড। আমি ওই নামে ডাকি আর ওর সঙ্গে গল্প করতে আমার ভাল লাগে। কত অন্যরকম গল্প বলে। শুধু মেয়েমহলে আটকে থাকতে আমার ভাল লাগে না। থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি হোড়।
ওর সঙ্গে তোর আলাপ হল কী করে? রাগত স্বরে জানতে চান কাদম্বরী। রাগলে তাকে আরও সুন্দর দেখায়। কাদম্বরী বোঝেন, হরিসাহেব হা করে তাকিয়ে আছে তার দিকে, অন্যরাও দেখছে। রূপার ওপর আরও রাগ হয়।
রূপকুমারী বলে, আলাপ তো তোমাদের বিদ্বজ্জন সভায়। ওকে আমার ভাল লাগে। রাগ কোরো না, নতুন বোঠান, পায়ে পড়ি রাগ কোরো না।
দাঁড়া তোর ব্যবস্থা করছি, ক্রুদ্ধ কাদম্বরী রূপার হাত ধরতে যান, তার মাধবীকঙ্কণ খুলে পড়ে মাটিতে। সেই ফাঁকে তাঁর হাতের নাগাল ছাড়িয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায় রূপা।
হ্যারি দূরের গাছতলায় গিয়ে বসেছে, রূপা তার পাশে বসে পড়ে বলে, ধুর, কিছু ভাল লাগে না আমার। সবাই সবসময় যেন আটকে রাখতে চায়। এটা করবে না, ওটা করবে না, ওখানে যাবে না, ওর সঙ্গে মিশবে না। আমার নিজের কি কোনও ইচ্ছে থাকতে নেই।
হ্যারি ওর কাঁধে হাত রেখে বলেন, তোমার অস্থিরতা আমি বুঝতে পারি। একসময় আমাদের দেশের মেয়েদেরও এরকম আটকে রাখা হত, কিন্তু এখন সব পালটে গেছে। এখন মহিলারা ভোটাধিকারের জন্য আন্দোলন করতে রাস্তায় নেমেছে। ইউরোপের মেয়েরা অনেক লড়াই করে স্বাধীন হয়েছে।
কতটা স্বাধীন? রূপা জানতে চায়, ওরা একা একা জাহাজে চেপে বিদেশ যেতে পারে? যেখানে ইচ্ছে যেতে পারে? আমার খুব ইচ্ছে করে সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়াই।
