একদিন মনে পড়ে, যাহা-তাহা গাইতাম।
সকলি তোমারি সখি লাগিত গো ভাল
নীরবে শুনিতে তুমি, সমুখে বহিত নদী
মাথায় ঢালিত চাঁদ পূর্ণিমার আলো।
সুখের স্বপনসম, সে দিন গেল গো চলি।
অভাগা অদৃষ্টে হায় এ জন্মের তরে
আমার মনের গান মৰ্ম্মের রোদনধ্বনি
স্পর্শও করে না আজ তোমার অন্তরে।
তবুও– তবুও সখি তোমারেই শুনাইব
তোমারেই দিব সখি যা আছে আমার।
দিনু যা মনের সাথে, তুলিয়া লও তা হাতে।
ভগ্নহৃদয়ের এই প্রীতি উপহার।
কবিতাটি লিখতে লিখতেই রবি ঠিক করে ফেলেন এটি হবে তার আগামী বইয়ের উৎসর্গ কবিতা। এখনি পড়াতে হবে জ্যোতিদাদাকে আর দোলনায় দুলন্ত ওই নিষ্ঠুরা মানবীকেই তিনি সব লেখা উৎসর্গ করবেন। রবি ভাবেন, তবু কি নিভবে তার বুকের আগুন?
.
রবির মনের এই টানাপোড়েনের মাঝখানেই সত্যেন বিলেত যাওয়ার সব ঠিকঠাক করে ফেললেন। জ্ঞানদা ইতিমধ্যে ছেলেমেয়েদের নিয়ে লন্ডনের পাশে সমুদ্রতীরের ব্রাইটন শহরে গুছিয়ে সংসার করছেন। কয়েকমাসের মধ্যেই রবিকে নিয়ে সেখানে যাবেন সত্যেন। রবির বিদ্যালয়-বিমুখ চঞ্চল মনকে বাগে আনতে হলে বিলেত ঘুরিয়ে আনা দরকার।
তার আগে ইংরেজি কেতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য রবিকে কিছুদিন সত্যেনের কর্মস্থল শাহীবাগ ও বোম্বাইয়ের পাণ্ডুরং পরিবারে থাকতে হল। ওই পরিবারের মধ্যে নাকি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের আশ্চর্য মিলমিশ হয়েছে, দেশের মেয়েদের মধ্যে বিলেতের আদবকায়দা শেখার একটি পথ হবে ওদের সঙ্গে মেলামেশা। এ-সবই সত্যেনের সিদ্ধান্ত।
রবির মনে হয় তাকে যেন শিকড়সুদ্ধ উপড়ে আনা হয়েছে এক খেত থেকে অন্য খেতে। নতুন পরিবেশে সব কিছুতেই লজ্জা। অচেনা লোকের সঙ্গে আলাপ হলে কী বলবেন, কী করবেন ভেবে পান না। ইংরেজি বলার অভ্যেস নেই।
আনা কিন্তু সত্যিই অবাক করল রবিকে। অচেনাকে আপন করে নিতে তাঁর জুড়ি নেই। বয়সে বোড়শী, ইতিমধ্যেই বিলেত থেকে ঘষেমেজে এনেছেন শিক্ষার পালিশ। সমবয়সি রবিকে আন্না কবি হিসেবে যেরকম আন্তরিক সমাদরে গ্রহণ করলেন তা আগে কেউ করেনি।
আনার মতো মেয়ে সত্যিই আগে দেখেননি রবি। বাঙালিঘরের রীতিনিয়মে মেয়েরা যেন জড়সড় হয়ে থাকে। এমনকী ঠাকুরবাড়ির আলোমাখা মেয়েরাও এত সহজে বাইরের পুরুষের সঙ্গে কথা বলেন না। স্মার্ট ছটফটে আনাকে প্রথম প্রথম একটু গায়ে পড়া মনে করে সংকুচিত ছিলেন রবি। কিন্তু ক্রমশ আড় ভাঙল। আনার সপ্রতিভতার সামনে বড়াই করার মতো একটি গুণই ছিল রবির, সেই কবিতা লেখার ক্ষমতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করাই ভাল মনে হল তার। প্রতিদিন সকাল বিকেল আনার কাজ রবিকে ইংরেজি সাহিত্য পড়ানো। কিন্তু তার বদলে বেশিরভাগ দিন রবিই তাঁকে নিজের বাংলা কবিতা শোনান। আনাও সোৎসাহে রবির গা ঘেঁসে বসে কাব্যের মানে বুঝে নেন।
এত কাছে অনাত্মীয়া তরুণীটিকে পেয়ে বুক দুর দুর করে রবির। তাঁর শরীরের মাদক গন্ধের সঙ্গে ভেসে আসা পারফিউম রবিকে এলোমেলো করে দেয়।
আনা একদিন বললেন, তোমার মুখে কোনওদিন দাড়ি রাখতে পারবে না, আমাকে কথা দাও। এত সুপুরুষ মুখশ্রী নষ্ট কোরো না খবরদার।
রবির শিহরন হয়, এই প্রথম নিজের চেহারার তারিফ শুনলেন তিনি। এতদিন নতুনবউঠানের গঞ্জনা শুনে শুনে চেহারার সাধারণত্ব সম্বন্ধে তার ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল। এবার তিনি আনার প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকেন। বলেন, কেন আনা, দাড়ি খারাপ কীসে?
দাড়ি খারাপ না! হেসে লুটিয়ে পড়েন আনা, দাড়ি থাকলে মেয়েরা তোমাকে চুমু খেতে দেবে না। তোমার মুখের সীমানা যেন কোনওদিন দাড়িতে ঢাকা না পড়ে।
রবি দেখলেন, আনার মুখ কৌতুকে উজ্জ্বল, চোখে রহস্যের ইশারা। ও কেন চুমুর কথা বলল? এর কি কোনও মানে আছে? রবির কী করা উচিত? রবির বিহ্বল লাগে।
আনা আবার জানতে চান, তুমি কি কোনও মেয়েকে চুমু খেয়েছ? চুমু খেতে না শিখলে কবিতা লিখবে কী করে রবি? ও কী, ব্লাশ করছ কেন? কাম অন ইয়ং ম্যান, পুরুষ কি ব্লাশ করে?
অপ্রস্তুত রবি কবিতার খাতায় ফিরে যেতে চান।
আনা শুনতে চান প্রেমের গান। রবির হাত ধরে বললেন, কবি, তোমার গান আমাকে মৃত্যুশয্যা থেকে টেনে তুলতে পারে। কী অপূর্ব তোমার গান!
রবির মনে পড়ে তার গান শুনে নতুনবউঠান কেমন তাচ্ছিল্য করেন। শুধু জ্যোতিদাদার উৎসাহে এতদিন গান গেয়ে চলছিলেন তিনি। আনা, তুমি আমার জ্যোতিদাদার গান শুনেছিলে?
আনা বলেন, হ্যাঁ, জ্যোতি ঠাকুরও খুব সুন্দর গাইতেন। কিন্তু তুমি যখন গান কর আমার শরীরে পদ্মকাঁটা ফুটে ওঠে।
রবির এবার বোল ফোটে, বলেন, আনা তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মেয়ে! তোমার দেহ সুন্দর, মন সুন্দর, ভাষা সুন্দর। তুমিই আমার গানকে সুন্দর করেছ আনা।
তুমি আমাকে একটা নাম দেবে কবি? রবির সামনে অঞ্জলি পেতে আনা বলেন, সবাই যে নামে ডাকে তুমি সেটায় ডাকবে না। তোমার গান থেকে, কবিতা থেকে একটা নাম দাও।
দেব, নিশ্চয় দেব, ফিসফিস করে রবি বললেন, কিন্তু আজ নয়। কাল ভোরে তুমি যখন ঘুমিয়ে থাকবে, তোমার জানলার কাছে গিয়ে নতুন নামে ডেকে ঘুম ভাঙাব আমি।
আনন্দে উচ্ছল হয়ে ঘুমোতে যান আনা। রবির চোখে ঘুম আসে না। যাঁকে ছেড়ে এসেও দিনরাত মনে পড়ে, তিনি রবির ব্যাকুলতাকে পাত্তা দেননি। আর এখন এই ব্যাকুল নবযুবতাঁকে নিয়ে রবি কী করবেন? কী নামে ডাকবেন তাকে? কীভাবে ভাঙাবেন তার ঘুম?
