রবি আনার জন্য নাম ঠিক করলেন, নলিনী। ওই নাম নিয়ে সারারাত ধরে গানটি রচনা করলেন। না ঘুমিয়ে ভোরবেলা সূর্যের আলো ফোঁটার আগে বাগানে চলে এলেন। হাতে একগুচ্ছ বকুলফুল কুড়িয়ে আনার জানলা দিয়ে ঘরে ছড়িয়ে দিয়ে গান ধরলেন,
উঠ নলিনী, খোল গো আঁখি ঘুম এখনো ভাঙিল না কি
ভোরবেলার এই গানের প্রতীক্ষায় আনাও জেগে ঘুমিয়ে ছিলেন সারাটি রাত। জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন রবির দিকে, আনার ঊপার কলির মতো আঙুলগুলি মিশে গেল রবির কম্পমান হাতে।
একমাস সময় বড় তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে আসছে। রবি আনাকে গান শোনন, ভারতীর পৃষ্ঠা থেকে কবিকাহিনীর কবিতা শোনান আর আনা মুগ্ধ চোখে কাব্যসুরা পান করেন। কিছু একটা ঘটছে, রবি বুঝতে পারেন। কিন্তু কিছুতেই এগোতে পারেন না নিজে থেকে।
রবি যত ইংরেজি শিখলেন তার চেয়ে বেশি বাংলা শিখে ফেললেন আনা। তিনি এখন ভারতী পড়তে পারেন। রবি ঠিক করলেন ভারতীর সংখ্যাগুলি এই পাঠিকাকেই উপহার দিয়ে যাবেন।
রবির মনখারাপ লাগছিল বাড়ির জন্য, বাড়ি বলতেই তার মনে ভেসে ওঠে কাদম্বরীর মুখ। সেই গঙ্গাতীর তেমনি আছে, পাখিরা তেমনি ডাকছে, নতুনবউঠানের সাজা পান মুখে দিয়ে বিহারীলাল তেমনি খুশি হয়ে উঠছেন, শুধু রবি সেখানে অনুপস্থিত। ডানা থাকলে উঁকি দিয়ে দেখে আসতেন কী হচ্ছে সেখানে।
পেছন থেকে এসে চোখ টিপে ধরেন আনা। বলেন, কী এত ভাব আকাশপাতাল?
রবি ভাবেন আজ আবার কী কাণ্ড বাধাবেন আনা কে জানে? মনে নিশ্চয় কোনও মতলব আছে। এই চঞ্চলা মেয়েটিকে রবির ভাল লাগে আবার ভয়ও পান। চেনা জীবনের মাঝে কোনও অচেনা মহল থেকে উড়ে আসা আনাবাই যেন আপন মানুষের দূতী, হৃদয়ের সীমানা বাড়িয়ে দিচ্ছে ক্রমশই। যে কোনও মেয়ের কাছ থেকে পাওয়া স্নেহ, প্রীতি, প্রেম যেন জীবনের ওপর ঝরে পড়া প্রসাদ। যাকে ফেভার বলা যায় ইংরেজিতে। মেয়েদের ভালবাসা তা যেরকমই হোক, রবির মনে যেন না-ফোঁটা ফুল ফুটিয়ে রাখে। সেই ফুল ঝরে গেলেও গন্ধ মেলায় না। এই যে নলিনী না ডাকতেই কাছে আসে, রবি ভাবেন, একদিন হয়তো ডেকেও পাওয়া যাবে না তাকে। তবু তার আহ্বানে সাড়া দিতে সাহস হয় না। ডুবতে ভয় পান রবি।
উত্তর না পেয়ে রবির গা ঘেঁসে নেয়ারের খাটে বসে পড়েন আনা। রবির হাত ধরে টেনে বললেন, আচ্ছা রবি, টানো তো আমার হাত ধরে, দেখি কে জেতে টাগ অফ ওয়ারে!
কেন যে এই খেলাটাই খেলতে হবে বোঝেন না রবি। খেলা শুরু হতে না হতেই শক্তি পরীক্ষায় হেরে গিয়ে আনা এসে পড়লেন রবির কোলে। তারপর শুরু হল রবির গলা জড়িয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা। ঠোঁটের এত কাছে ঠোঁট নিয়ে আসেন আনা, তবু কি একবার চুমু খেতে পারে না রবি? আনা ভাবেন, হাদা একেবারে! কোনও রসকষ নেই! আনার একটু প্রসাদ পাওয়ার আশায় কত ছেলে পেছন পেছন ঘুরছে, আর এই কিশোর কবির কাছে তার মোহিনীশক্তির কোনও মর্যাদাই নেই! রবি কি জানে না কবির। হৃদয়েশ্বরী হওয়ার জন্য কত প্রণয়ীকে উপেক্ষা করছেন আনা! স্বয়মাগতা নারীকে হেলায় ফিরিয়ে দিতে পারেন যিনি, তাকে জয় করতে আনা ব্যাকুল হয়ে ওঠেন! অথচ রবির ব্যাকুল মনে অন্য এক রহস্যময়ীর ছায়া।
শেষে একদিন মরিয়া হয়ে আনা বললেন, জানো কোনও মেয়ে ঘুমিয়ে পড়লে যদি কেউ তার দস্তানা চুরি করতে পারে তো কী হয়? সাদা মহার্ঘ লেসের বিলিতি গাউন পরা আনাকে এঞ্জেলের মতো পবিত্র দেখায়। অথচ মুখ দুষ্টু হাসিতে ভরপুর।
রবি তো কিছুই বোঝেন না, কখন যে কী বলে মেয়েটা। এই প্যাঁচপেচে ভাদ্রের গরমে দস্তানার কথা আসেই বা কেন! অবাক হয়ে জানতে চান, কী হয়? কী আবার হবে দস্তানা চুরি করলে? চোর ধরা পড়লে মেয়ের বাবার হাতে পিট্টি খাবে।
ধুর বোকা, আনা রবির গালে টোকা দিয়ে কানে কানে বলেন, ঘুম ভাঙিয়ে মেয়েটিকে চুমু খাওয়ার অধিকার জন্মায় তার। আনার প্রগলভ উসকানিতে কান গরম হয়ে ওঠে রবির।
এমন আজব নিয়ম কোন শাস্ত্রেই বা লেখা আছে, আর কেনই বা এমন করে তাকে চোরা ঘূর্ণিতে টানছে আনা? রবি অন্য গল্প শোনান, গ্যেটের গল্পটা জানো তো নলিনী, য়ুরোপে একরকম তাস খেলায় মহিলাদের কাছে পুরুষ হেরে গেলে চুম্বন দণ্ড দিতে হয়। গ্যেটে এই খেলাটা খেলতেন কিন্তু হেরে গেলে চুম্বনের পরিবর্তে মহিলাদের কবিতা উপহার দিতেন। তুমি বলো, চুম্বনের চেয়ে কবির কবিতা কি অনেক লোভনীয় উপহার না?
আনার মোটেই পছন্দ হয় না গল্পটা। তিনি দৃঢ়ভাবে জানান, চুম্বন ছাড়া কবিতা লেখা যায় না। কিন্তু কবিতা না থাকলেও চুম্বন থাকবে। বলেই আনা টুপ করে রবির বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।
ঘুমন্ত আনার দিকে তাকিয়ে থাকেন বিস্মিত রবি। পাশেই পড়ে আছে খুলে রাখা আনার দস্তানা। ভাবেন, তার কী করণীয়? আনা কিছু কি ইঙ্গিত করছে? কিন্তু রবির দ্বিধা কাটে না, দস্তানার দিকে হাত বাড়িয়েও আবার গুটিয়ে নেন। না, রবি কিছুতেই পারবেন না আনাকে চুমু খেতে। অনিবার্য নিয়তির মতো তার মনে পড়ে যাচ্ছে কাদম্বরীর মুখ।
ঘুমপরিকে ফেলে রেখে চুপিচুপি ঘর থেকে বেরিয়ে যান রবি। চুম্বন নয়, আনার জন্য তাঁর মাথায় ভেসে বেড়ায় কবিতার লাইন,
শুনেছি শুনেছি কি নাম তাহার
শুনেছি শুনেছি তাহা
নলিনী নলিনী নলিনী নলিনী
কেমন মধুর আহা!
