হে আমার বিয়াত্রিচে, জ্যোতি যখন অস্তমিত, এই উদীয়মান ভানুর দিকে একটু মনোযোগ দাও, গোমড়ামুখো কাদম্বরীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চান রবি।
কাদম্বরী বলেন, সবসময় ইয়ারকি ভাল লাগে না রবি। দেখছ না তোমার নতুনদাদা কেমন রঙ্গমঞ্চের অভিনেত্রীদের দিকে ধেয়ে চলেছেন। এমন বরষাদিনে আমাকে রেখে চলে গেলেন, তা হলে তো কলকাতাতেই থাকলে হত।
না বউঠান, এই নদীতীর তোমার মতো স্বামী-বিরহিণীর পক্ষেও মনোরম। রবি বলেন, উনি চলে গেলেন, কিন্তু তোমার নদী আছে, বাগান আছে, হরিণশিশু আছে, রূপকুমারী আছে আর ও দুটি চোখের একটু কৃপাদৃষ্টির আশায় পায়ের তলায় চাতকের মতো বসে আছি আমি।
কীসে আর কীসে, জ্বলন্ত কটাক্ষ করেন কাদম্বরী, তুমি কি নিজেকে তোমার নতুনদাদার সঙ্গে তুলনা কর? আমি তো তোমার কোনও রূপগুণ দেখি না এখনও। তুমি নিতান্ত একটি সতেরো বছরের শিশু।
রবির নবজাগ্রত পৌরুষে ঘা লাগে। চোখের কোনায় জল চিকচিক করে ওঠে। জ্যোতিদাদা আমার কতখানি জুড়ে আছেন সে আমিই জানি, কিন্তু তুমি যে আমার প্রিয়তর। তোমার কৃপাপ্রত্যাশী বলে এমন করে কি আঘাত দিতে হয়, হেকেটি ঠাকরুন!
দেখো, আবার কাঁদছ বাচ্চাদের মতো! আমি যখন রেগে থাকি তখন আমাকে বিরক্ত কোরো না তো রবি ঠাকুরপো! কাদম্বরী ঘরের দিকে উঠে যান।
বিষণ্ণ রবি বসে থাকেন। ভগ্নহৃদয়ের এই বেদনা কাকেই বা বলবেন। প্রায় সমবয়সি নতুনবউঠানের চোখে তিনি এখনও কিশোর, অথচ কিশোরের শরীর মন জেগে উঠছে সে-খবর তিনি রাখেন না। কেনই বা রাখবেন, তার তো মন ছেয়ে আছেন পুরুষোত্তম জ্যোতি ঠাকুর। মুহ্যমান রবি খাতা কলম টেনে স্বগতোক্তির মতো দু-চারটি লাইন নাড়াচাড়া করেন,
জানিতেম ওগো সখী, কাঁদিলে মমতা পাব,
কাঁদিলে বিরক্ত হবে একি নিদারুণ?
চরণে ধরি গো সখী, একটু করিও দয়া
নহিলে নিভিবে কিসে বুকের আগুন?
আবার যেদিন কাদম্বরীর মেজাজ ভাল থাকে সেদিন যেন স্বপ্নের মতো পরিবেশ রচিত হয়। সে-সব দিনে জ্যোৎস্নারাতে নদীর সামনে বসেন তিনজন। জ্যোতির গানে রবির কবিতায় যেন গন্ধর্বরা নেমে আসেন। চাঁদপরির মতো দুজনের মাঝখানে ঘুরে বেড়ান কাদম্বরী। এক-এক দিন কলকাতা থেকে চলে আসেন সস্ত্রীক অক্ষয়চন্দ্র। তার স্ত্রী শরৎকুমারী কিছুদিন হল লাহোর থেকে এসেছেন। ঠাকুরবাড়িতেও একজন শরৎকুমারী আছেন, তাই রবি তাকে মজা করে ডাকেন লাহোরিণী।
একদিন অক্ষয়ের কাছে ইংরেজ বালক কবি চ্যাটারটনের গল্প শুনছিলেন রবি। চ্যাটারটন প্রাচীন কবিদের নকল করে এমন কবিতা লেখেন যে কেউ ধরতে পারেনি। অবশেষে ষোলো বছর বয়সে তিনি আত্মহত্যা করে বিখ্যাত হন। রবি শুনে রোমাঞ্চিত হয়ে ভাবলেন, তিনিও বিদ্যাপতি চণ্ডীদাসের নকলে কবিতা লিখবেন।
বাগানে বসে জলস্রোতের মতো লিখতে শুরু করলেন ভানুসিংহের কবিতা। বন্ধুদের বললেন, লাইব্রেরি থেকে বহু প্রাচীন এক কবির পুঁথি উদ্ধার করেছেন, কবির নাম ভানুসিংহ। বন্ধুরাও শুনে উত্তেজিত, এমন কবিতা বিদ্যাপতি চণ্ডীদাসের হাত দিয়েও বেরোয়নি! পরে অবশ্য আসল কবির পরিচয় পেয়ে তারা ঢোক গিলতে বাধ্য হলেন।
জ্যোতি তখন অশ্রুমতী নাটকটি লিখছিলেন। ভানুসিংহের প্রথম পদটিই তার এত পছন্দ হল যে মঞ্চাভিনয়ের সময় নাটকে এটি গান হিসেবে জুড়ে দেবেন ঠিক করলেন। পদটি ছিল–
গহন কুসুম কুঞ্জ মাঝে মৃদুল মধুর বংশী বাজে
বিসরি ত্রাস লোকলাজে সজনি, আও, আও লো।
মোরান সাহেবের বাগানে কোনও কোনও নির্জন দুপুরে রবি আর কাদম্বরী তেঁতুলের আচার খেতে খেতে বাগানের দোলনায় আড্ডা দেন। কাদম্বরী সেদিন বেশ সেজেছেন, গায়ে হাল ফ্যাশানের লেস দেওয়া বহুবর্ণ জ্যাকেটের সঙ্গে নীলাম্বরী শাড়ি। কিন্তু ওই জ্যাকেট বস্তুটি কোনওদিন পছন্দ হয় না রবির।
তিনি বোঠানের গায়ে পড়ে ঝগড়া বাধান, এটা কি একটা ড্রেস, না উমেশ দরজির সেলাই করা ঢাকনি? যত রাজ্যের জলের দরে কিনে আনা ঝড়তি পড়তি রেশমি ছিটকাপড় জুড়ে দরজিরা যা তৈরি করে দেয় তাই আদর করে গায়ে তোল তোমরা, আবার নাম দেওয়া হয়েছে জ্যাকেট! এর চেয়ে সেকেলে সাদা কালোপেড়ে ঢাকাই শাড়ি পরলে ঢের বেশি মানাত!
আহা রে, তুমি ফ্যাশানের কী বোঝ হে বালক? কাদম্বরীও ছাড়বেন না, জানো আমি নিজে সব ডিজাইন এঁকে দরজি দিয়ে করিয়েছি? আর দেখো, জ্যাকেটের বর্ডারের এই এমব্রয়ডারিটাও আমার করা।
ওঃ, ভারী তো এমব্রয়ডারি, জ্যাকেটে নকশা তোলা তো ফাঁকিবাজি। রবি বলেন, জ্যোতিদাদাকে যেমন করে দিয়েছ, আমার আচকানে তেমনি এমব্রয়ডারি করে দেখাও, তো বুঝি!
ইস! কী আবদার! কাদম্বরী হাতের একটি এমব্রয়ডারির ফ্রেম দেখিয়ে বললেন, এই দেখো কী সেলাই করছি এটা। সাধের আসন।
সেটা আবার কী জিনিস, নিজের কোলে কবিতার খাতায় হিজিবিজি কাটতে কাটতে রবি জানতে চান।
কাদম্বরীর ঠোঁটে মোনালিসার হাসি, বলেন, এটা কবি বিহারীলালের জন্য আমার উপহার, তার কবিতার চারটে পঙক্তি এমব্রয়ডারি করে বুনে দিচ্ছি সাধের আসনে।
রবির ম্লান মুখের দিকে তাকিয়ে সান্ত্বনা দেন, যেদিন বিহারীলালের মতো কবিতা লিখতে পারবে, সেদিন তোমার পাওনা হবে এরকম উপহার।
রবি কাদম্বরীর কথায় কান না দেওয়ার জন্য কবিতার খাতায় মন দিলেন। জ্যোতি বাগানে এসে দেখলেন বকুলগাছে বাঁধা দোলনায় গুনগুন করতে করতে দোল খাচ্ছেন কাদম্বরী আর তার পায়ের কাছে মাদুরের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে রবি লিখছেন নতুন কবিতা,
