ওই বছরে শীতে দেবেন ঠাকুর জামাই সারদাপ্রসাদকে সঙ্গে নিয়ে চিনভ্রমণে গেলেন।
আর বর্ষায় জ্যোতি ও কাদম্বরী হাওয়া বদলাতে এলেন শ্রীরামপুরের গঙ্গার ধারে বাগানবাড়িতে। অবধারিতভাবেই তাদের সঙ্গী হলেন রবি। জোড়াসাঁকোর দেওয়ালের বাইরে খোলা প্রকৃতির মাঝখানে গঙ্গাতীরে নতুনবউঠানের সঙ্গে দিন কাটাতে কাটাতে তার মালতীপুঁথির পাতা ভরে উঠল। নৌকোর ওপর বসে লিখে ফেললেন, শৈশব সঙ্গীত।
নতুন বর্ষার জলধারা রবির মনে আনন্দের স্রোত নামায়। স্রোতের ওপর ভেসে বেড়ানো মেঘের ছায়া রবির মনে তীব্র প্রণয়াকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলে। কিন্তু কার প্রতি? কাকে নিয়ে প্রেমের কবিতা লিখবেন রবি? চোখ বুজলেই সামনে ভেসে ওঠে এক অনিন্দ্যসুন্দর মুখ, সে মুখ হেকেটি ঠাকরুনের। এ কী সর্বনাশ হল তাঁর!
ভোরবেলা ঘুম ভেঙে গঙ্গার ধারে এসে বসেন রবি। বৃষ্টি পড়ছে। তার শরীর আনচান, চোখ দিয়ে জলধারা গড়িয়ে নেমে আসে। গলা থেকে বেরিয়ে আসে বিদ্যাপতির পদ, এ ভরা বাদর, মাহ ভাদর, শূন্য মন্দির মোর…
সামনে জেলেনৌকোগুলির আবছা চলাচল। পেছনে বাগানে রান্নার তোড়জোড়। নতুনবউঠান আজ বাগানে রান্না করবেন, বেশ পিকনিকের মতো। রবি, রবি বলে তার ডাক ভেসে আসছে বাগান থেকে। বোধহয় জলখাবারের আহ্বান। রবির হৃদয় চলকে ওঠে। আবার নিজেকে শাসন করেন তিনি। এটা ঠিক হচ্ছে না, হৃদয় সামলাতে না পারলে নতুনবউঠানের সামনে বড় লজ্জায় পড়তে হবে। আর জ্যোতিদাদাই বা কী ভাববেন? ওরা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করলেও সহ্য হবে না রবির। আবেগ লুকোনোর ঢাল হিসেবে সংগীতের জুড়ি নেই, রবি বিদ্যাপতির পদটি নিজের মতো গুনগুন করতে করতে বাগানে এসে বসলেন।
বকুলগাছতলায় ইটের উনোন জ্বলছে। চারদিকে হাতা, খুন্তি, মশলা, তরকারিপাতি ছড়ানো। দাসীরা জোগান দিচ্ছে, কুটনো কাটছে, হলুদ বাটছে বিরাট শিলনোড়ায়। টুলে বসে তদারকিতে ব্যস্ত কাদম্বরী।
একটু পাশেই পাতা হয়েছে বেতের চেয়ার টেবিল। সেখানে জলখাবারের ফল মিষ্টি সাজানো। একটি চেয়ারে সম্রাটের মতো বসে আছেন জ্যোতি, তার গায়ে ঢোলা মলমল পাজামার ওপর লখনউ চিকনের লম্বা আকাশনীল চাপকান। কাঁধে একটি উড়নি পাট করে রাখা।
জ্যোতির রূপের খ্যাতি অনেকদিনের। ছাত্রবয়সে তিনি যখন গাড়ির অপেক্ষায় প্রেসিডেন্সি কলেজের সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে থাকতেন, তাকে দেখতে ভিড় জমে যেত। কয়েক বছরের ছোট রসরাজ অমৃতলাল গল্প করেন, হিন্দু স্কুলের ছাত্র হিসেবে তিনিও উলটোদিকে দাঁড়িয়ে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতেন গ্রিক সৌন্দর্যের সেই প্রতিমূর্তির দিকে। রবির কাছেও সৌন্দর্য, সাহিত্য, সংগীতে জ্যোতিদাদাই আদর্শ।
রবি জানতে চান, কলকাতায় যাচ্ছ নাকি জ্যোতিদাদা? এত সকালে?
সে-কথার উত্তর না দিয়ে জ্যোতি আঙুরের রসে চুমুক দেন। বলেন, কী গাইছিলি, জোর গলায় গা তো! চেনা চেনা লাগছিল সুরটা? আবার একটু অচেনা যেন? বিদ্যাপতি?
রবি চেয়ারে বসে পড়ে বললেন, পদ বিদ্যাপতির, সুরটা আমার নিজের মতো করে নিয়েছি। তাই চিনতে পারছ না। রবি আবার গানটা ধরে।
মাথার ওপর চাঁদোয়া, বাইরে বৃষ্টি। বিদ্যাপতির পদে পরিবেশ হয়ে ওঠে মেঘমন্দ্রিত। রবির গানে গলা মেলালেন জ্যোতিরিন্দ্র আর আবেশে চোখ বন্ধ করে কাদম্বরী শুনতে থাকেন।
রবির ফলের রস খেতে ইচ্ছে করে না, এই ভরা বাদরে কফির পেয়ালার দিকে হাত বাড়ান তিনি। তার চুলে বৃষ্টি লাগা, গায়ের মেরজাই আধভেজা। চোখে সর্বনাশ।
কাদম্বরী হাঁ হাঁ করে ওঠেন, আরে পাগল, আগে তো কিছু খাবার মুখে দাও।
খেতে ইচ্ছে করছে না বোঠান, রবির চোখের দিকে তাকিয়ে কাদম্বরীর মনে হয় যেন কালবৈশাখীর আভাস। কয়েকদিন ধরেই রবির মনের অশান্তভাব লক্ষ করেছেন তিনি। তার বুক গুরুগুরু করে অজানা শঙ্কায়। কী হয়েছে ওর, সামলাতে পারবেন তো রবিকে!!
মনের কথা বুঝতে না দিয়ে তিনি বলেন, এমন কিছু ভাল গাওনি। নেহাত বৃষ্টির দিন বলে তোমার জ্যোতিদাদার পছন্দ হয়েছে।
রবি বোঝে না কেন কিছুতেই খুশি হন না কাদম্বরী ঠাকরুন। বিশেষ করে রবির কোনও গুণ যেন ওঁর চোখে পড়ে না। ঝগড়ার সুরে রবি বললেন, জ্যোতিদাদা ভাল বললে তুমি আমাকে হিংসে করো বউঠান, তাই প্রশংসা করতে চাও না।
জ্যোতি হাসেন, আঃ, কী ছেলেমানুষের মতো ঝগড়া কর না তোমরা। আরেকটা গান কর রবি। তোর গান দিয়ে দিনটা শুরু করলাম আজ, দেখি রিহার্সালটা জমে কিনা।
নাটক নেমে গেছে, সবাই ভাল বলছে, তবু এত রিহার্সালে যাওয়ার কী দরকার তোমার? কাদম্বরী ঠোঁট ফোলান, এমন বাদলাদিনে জমিয়ে খিচুড়ি মাছভাজা আর গান হতে পারত। আজ না গেলেই নয়!
জ্যোতি বলেন, আমার না গেলে চলে না বউ, ওরা অপেক্ষা করবে। আমি তো ফিরে আসব তাড়াতাড়িই। গান আর খিচুড়ি রাতের জন্য তুলে রেখো, এখন রবির সঙ্গে গান কবিতা কর।
কে অপেক্ষা করবে, বিনোদিনী? কাদম্বরী নাছোড় জানতে চান। তীব্ৰচোখে তাকিয়ে থাকেন জ্যোতির দিকে।
তুমি বড় সন্দেহপ্রবণ, বিরক্ত জ্যোতি উঠে দাঁড়ান। আমাকে নটার স্টিমার ধরতে হবে, রবি তোর বউঠানকে দেখিস।
জ্যোতি চলে যান, কাদম্বরী মুখ গোমড়া করে বসে থাকেন। সেদিকে তাকিয়ে রবি ভাবেন এই নারীটি যে আমার সামনে বসে খাওয়ায়, ঝগড়া করে, স্বামীর জন্য অভিমান করে সে নতুনবউঠান। আর আমার মনের ভেতরে যিনি ঢুকে বসে জ্বালাচ্ছেন, কারওঁ বউ নন, বউঠান নন, সেই রহস্যময়ীটি হেকেটি ঠাকরুন। তিনিই আমার কবিতার বিয়াত্রিচে।
