সূর্য অস্ত যাচ্ছে। দেশের ছবি মুছে যাচ্ছে চোখের সামনে থেকে। রামমোহন রায় এবং দ্বারকানাথ বিলেতে গিয়ে আর দেশে ফিরতে পারেননি, তাই সকলেই কালাপানি পেরতে ভয় পায়। যখন জাহাজ জেটি ছাড়ল, হাত নাড়তে নাড়তে ক্রমশ ছোট হয়ে এল বন্দরে দাঁড়িয়ে থাকা সত্যেন ও পাণ্ডুরং মেয়েদের অবয়ব, জ্ঞানদার বুক দুরুদুরু করে। কত দূরে চলে যাবেন, আর কোনওদিন ফেরা হবে কি না কে জানে!
জাহাজপথ অতি মনোহর। জ্ঞানদা বাচ্চাদের নিয়ে সমুদ্রযাত্রা পুরোমাত্রায় উপভোগ করছেন। মুসলমান চাকরটি খুব সেবাযত্ন করে, জাহাজ লিভারপুল পৌঁছলে সে অবশ্য বিলেতের তীর থেকে ফিরে আসবে। বিলেতে সঙ্গে থাকবে গুজরাতি রামা চাকর। এসব ব্যাপারে সত্যেনের ব্যবস্থা পাকা।
সমুদ্রের নীল জল ক্রমে অন্ধকার হয়ে আসে। রাত্রি নামলে আলোয় ভরে যায় জাহাজটি। সুসজ্জিত ইংরেজ নারীপুরুষেরা জোড়ায় জোড়ায় ডেকে ভ্রমণ করছে। সুরেন, বিবিদের সুন্দর পোশাক পরানো হয়েছে, তারা এই অবারিত অভাবিত পরিসরে মনের আনন্দে খেলে বেড়াচ্ছে। ছোট্ট চোবি রামা চাকরের কোলে। মেমসাহেবরা দেবদূতের মতো শিশুটিকে দেখে আদিখ্যেতা করে গাল টিপে দিচ্ছে প্রায়ই। সন্ধে গম্ভীর হলে সবাই ডাইনিং রুমের দিকে রওনা দিল।
বুক দুরুদুরু সংবরণ করে জ্ঞানদাও সুন্দর করে সাজলেন। যে শাড়ি পরে এসেছিলেন সেটি পালটে পরলেন গুজরাত থেকে আনা একটি ঘননীল বাঁধনি সিল্ক। এই বাঁধনি কাপড়গুলি ভারতের মেয়েদের হাতের অপূর্ব শিল্প। প্রথমে সাদা ক্যানভাসের মতো পুরো শাড়িটাতে বিন্দু বিন্দু করে সূক্ষ্ম সুতোর বাঁধন দিয়ে উজ্জ্বল কোনও রঙে চোবানো হয়। রং বসে গেলে শুকিয়ে নেওয়া হয়। শাড়ি। পাড়টিও আলাদা বাঁধন দিয়ে আলাদা রং করা হয়। শুকনো শাড়ি থেকে সুতোর বাঁধন খুলে ফেললেই আসল ম্যাজিক, সারা শাড়িতে লাল, সবুজ, নীল রঙের ওপর বিন্দু বিন্দু সাদা নক্ষত্র ফুটে ওঠে। আমেদাবাদে থাকতে গুজরাতি গ্রামে গিয়ে নিজে এ-সব শাড়ি সংগ্রহ করেছেন জ্ঞানদা। আজকের গ্রে রঙের পাড় দেওয়া নীল শাড়িটিতে তার চেহারার আভিজাত্য যেন ঠিকরে উঠছে। ডাইনিং রুমে তিনিই একমাত্র ভারতীয় মহিলা, সবার চোখ ঘুরে ঘুরে আসছে তার দিকে। কোণের টেবিলে সুরেন ও বিবিকে নিয়ে সঙ্গী ইংরেজ দম্পতির সঙ্গে বসেছেন জ্ঞানদা। ঘরে মোসার্টের সুর বাজছে হালকা চালে। কাটা-চামচ সহযোগে প্রতিটি খাবারের স্বাদ নিতে নিতে গল্প করছেন তারা। হলঘরে দু-একটি ইংরেজ মেয়ের কাঁধখোলা গাউন যেন একটু বেশিই উন্মুক্ত। পোশাকের শাসন না মেনে তাদের স্তনের আভাস উপচানো মাখনের মতো উঁকি মারছে। অধিকাংশ পুরুষের মুগ্ধ দৃষ্টি। সেইদিকে। জ্ঞানদার একটু অস্বস্তি হয়।
সঙ্গিনী মিসেস মেরি ফিলিপের অনুরোধে একটু রেড ওয়াইন নিয়েছেন জ্ঞানদা। এর আগে স্বামীর সঙ্গে পার্টিতে পান করলেও এখন এত অচেনা লোকের সামনে একটু বাধোবাধো ঠেকে। সত্যেনের চাকরির সুবাদে একটু আধটু পান করতে হয় ঠিকই, কিন্তু ব্রাহ্মধর্মের প্রভাবে ঠাকুরবাড়িতে এখন বইছে মদ্যপান বিরোধিতার হাওয়া। জ্যোতিদের সঞ্জীবনী সভাতেও মদের। বিরুদ্ধে আন্দোলন হচ্ছে। সারা কলকাতার বাবুরা যেভাবে সুরাসমুদ্রে গা ভাসিয়ে বাইজি চর্চায় মেতে আছেন তা দেখে ওঁরা শিউরে ওঠেন। এখন দেবেন ঠাকুরের পুত্রবধূকে ওয়াইন পান করতে দেখে কে কোথা থেকে খবরের কাগজে রিপোর্ট করে দেবে কে জানে! ওয়াইন যদিও মদ নয়, তবু জ্ঞানদা একটু সাবধান থাকতে চান। অনেক সাধ্যসাধনা করে বাবামশায়ের কাছ থেকে বিলেত যাওয়ার অনুমতি পাওয়া গেছে, তিনি আবার রুষ্ট না হন!
ডিনারের পর ডেকের ওপর শুরু হল বাজনার তালে তালে ইংরেজ নারীপুরুষের জোড়ায় জোড়ায় বলনৃত্য। এক সাহেব জ্ঞানদার হাত ধরে নাচের জন্য টানাটানি করতে থাকে। জ্ঞানদা এতে খুব একটা অনভ্যস্ত নন, বোম্বাই আমেদাবাদে থাকাকালীন ম্যাকগ্রেগরের পাল্লায় পড়ে অনেকবার নাচে অংশ নিতে হয়েছে তাকে। কিন্তু অপরিচিত কারও সঙ্গে নাচার প্রশ্ন ওঠে না, তিনি মৃদু হাসিতে প্রত্যাখ্যান করলেন। সুরেন আর বিবি দুজন দুজনের পার্টনার হয়ে ডান্স করছিল। বিবির পাকা হাবভাব দেখে জ্ঞানদার মজা লাগে, সেই রাত্রে অল্প ওয়াইন পান করতে করতে তিনি নাচগান উপভোগ করলেন। পরদিন সকাল থেকে শুরু হল জ্বর বমি মাথা ঘোরা। সত্যেন তাকে সাবধান করে দিয়েছিলেন, তবু এত তাড়াতাড়ি সি সিকনেস দেখা দেবে তা বোঝেননি জ্ঞানদা। চাকরদুটো এ যাত্রায় খুব সেবা করল।
কলকাতার বাবুমহল অবশ্য ঘটনাটাকে বিশেষ সুনজরে দেখলেন না। স্ত্রী-স্বাধীনতার এহেন বাড়াবাড়ি করে সিভিলিয়ান সত্যেনবাবু নিজের বউকে মাথায় তুলছেন আর অন্য মেয়ে-বউদের গোল্লায় যাওয়ার পথ প্রশস্ত করছেন। ঘরকন্না না সামলে মেয়ে-বউরা সবাই এখন কালাপানি পেরতে চাইলে বাঙালির সংসার লাটে উঠবে। সমাচার চন্দ্রিকা তো স্পষ্টই সমালোচনার সুরে লিখেছে, আমাদেবাদের [আমেদাবাদের] সিবিল এবং সেসন জজ বাবু সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী নিজ পুত্র কন্যাদিগের সহিত লিবারপুলে পৌঁছিয়াছেন। সন্তানদিগকে বিলাতে রাখিয়া শিক্ষা দেওয়াই গমনের উদ্দেশ্য।– কালেকালে কত কি হবে?
