খোঁপায় বেলকুঁড়ি লাগাতে লাগাতে কাদম্বরী বললেন, বিষবৃক্ষের কুন্দনন্দিনীকে আমার খুব ভাল লেগেছে। নিঃসঙ্গ মেয়েটির দুঃখ আমার ঘুম কেড়ে নেয়। কেউ কি তাকে সত্যি ভালবাসবে না?
কুন্দ আর সূর্যমুখীর দ্বন্দ্বটাই তো গল্প জমিয়ে দিয়েছে, স্বর্ণ উত্তেজিত হয়ে পড়েন, বঙ্কিমবাবুর সাহস আছে বলতে হবে, বিধবার প্রেম দেখাচ্ছেন এত খোলাখুলি, পেটরোগা বাঙালির হজম হলে হয়।
কাদম্বরী উঠে এসে স্বর্ণকে জড়িয়ে ধরে বলেন, তুমি যে প্রতিকূলতাকে জয় করেছ নিজের চেষ্টায় সেটা কি কম বড় কথা হল! মেয়েদের লেখালেখিকে এখনও বিদ্বজ্জনরা গুরুত্ব দেন না, কিন্তু আমরা তো জানি কত অসম্ভবকে সম্ভব করতে হচ্ছে তোমাকে।
স্বর্ণ বললেন, দেখোনা নতুনবউঠান, বাড়িতে সবাই আমার লেখার আদর করেন ঠিকই, কিন্তু বাইরের লোকেরা অনেকেই ভাবেন আমার নামে আসলে জ্যোতিদাদা লিখে দিচ্ছেন।
যাঃ, তাই আবার হয় নাকি? কাদম্বরী হেসে লুটিয়ে পড়েন, মানুষের কল্পনাশক্তি কত লম্বা দেখো!
শোনো মালিনী, এই লম্বা জল্পনাকল্পনা সব মেয়েদের বিরুদ্ধে তেড়ে আসছে, স্বর্ণ বিরক্ত হয়ে বললেন। আমার সই গিরীন্দ্রমোহিনী তো কোনওদিন কোনও সাহিত্যসভায় আসতেই পারেননি। কতদিন ধরে দুজন দুজনকে চিঠি লিখছি, পরস্পরের লেখা পড়ছি, সাক্ষাতের জন্য ব্যাকুল হচ্ছি, কিন্তু গিরিকে বাড়ি থেকে বেরোতে দেয় না। এই তো মেয়েদের অবস্থা! রাসসুন্দরী দেবীর মুখ কি কোনওদিন দেখতে পাব আমরা?
সখীদের এই মিলনবাসরে হঠাৎ এসে পড়ে স্বর্ণর ছোট্ট মেয়ে ঊর্মিলা। কাদম্বরী হাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নেন ফুটফুটে শিশুটিকে।
ঊর্মিলাও কাদম্বরীর কোলে উঠে মহা খুশিতে তার গলা জড়িয়ে ধরে। কিন্তু স্বর্ণর অত আহ্লাদ আসে না। কতদিন পরে এমন আসর বসেছে, আজ এই সৃজনশীল মজলিশে বাচ্চাকাচ্চার উৎপাতে সময় নষ্ট করতে তার একটুও ইচ্ছে নেই।
দাসীকে চিৎকার করে ডেকে বলেন, ঊর্মিলাকে নিয়ে যাও, ও এখানে। এল কী করে? তুমি কি ঘুমোচ্ছ নাকি?
দাসী কাঁচুমাচু হয়ে বলে, আমার দোষ নেই মাঠান, ওকে বসিয়ে রেখে পেচ্ছাপ করতে গেছিলাম, সেই ফাঁকে পালিয়ে এসছে।
দাসীর অমার্জিত শব্দ ব্যবহারে আরও খেপে যান স্বর্ণ, যাও বলছি, আমাকে আর বিরক্ত কোরো না, বেবিকে নিয়ে নীচে যাও।
কাদম্বরী আর চুপ করে থাকতে পারেন না, দাসীকে বলেন, তুই যা, আমি দেখছি। ঊর্মিলা আমার কাছেই থাকবে। স্বর্ণর দিকে ফিরে বলেন, ছোট্টশোনাটা থাকলে কোনও অসুবিধে হবে না, কী যে কর না তুমি!
তোমরা আবার বাচ্চাদের বড্ড মাথায় তোল বউঠান, স্বর্ণ নিজের মতে স্থির থাকেন, যেমন মেজোবউঠান তেমন তুমি। আমরা যেভাবে বড় হয়েছি, এ-বাড়ির হাওয়া বাতাসে ওরাও সেরকম বড় হয়ে যাবে। তার জন্য আমার অমূল্য সৃষ্টিশীল সময় নষ্ট করতে পারি না বাপু।
কাদম্বরীর চোখে জল আসে, তোমাদের কোল আলো করে দেবশিশুরা না চাইতে এসেছে বলে এমন অবহেলা করছ ঠাকুরঝি, আমার যে কোল খালি। ঊর্মিলাকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়ে সাহিত্য আলোচনা করার জোর আমার নেই।
মালিনী এবার কাদম্বরীর পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়। স্বর্ণ বলেন, বউঠান, ঊর্মিলা তো তোমারই মেয়ে, আমার হলে কি আমি ঘর থেকে যেতে বলতাম। কাদম্বরী ও স্বর্ণ পরস্পরকে জড়িয়ে ধরেন প্রবল সখীত্বে। সেই মুহূর্তে বালিকা ঊর্মিলাকে ঘিরে রচিত হয় তিন নারীর সুরক্ষা বলয়।
১০. আনাবাই নলিনী
১৮৭৭-এর গ্রীষ্মকালের এক ফুরফুরে বিকেলে তিনটি শিশুকে নিয়ে অন্তঃসত্ত্বা জ্ঞানদা একা-একাই বিলেতের জাহাজে চেপে বসলেন। এ যাত্রায় সত্যেন তাদের সঙ্গী হতে পারলেন না, পরিচিত এক ইংরেজ দম্পতির সঙ্গে জ্ঞানদাকে পাঠিয়ে দিলেন লিভারপুলের উদ্দেশে। দেখাশোনার জন্য সঙ্গে গেল একটি গুজরাতি ও একটি মুসলমান চাকর। স্ত্রীর ওপর সত্যেনের অগাধ ভরসা। তিনি জানেন জ্ঞানদা সব সামলে নেবেন।
বোম্বাই বন্দরে তাকে সি অফ করতে এসেছেন পাণ্ডুরং পরিবারের গৃহিণী ও মেয়েরা। ওঁদের বড় মেয়ে আনা বেশ কিছুদিন বিলেতে কাটিয়ে এসেছেন অথচ ভারতীয় সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়েও তাঁর আগ্রহ প্রবল। একা বিলেতযাত্রা। নিয়ে জ্ঞানদার মনে একটু ইতস্তত ভাব ছিল। এই কদিনে আনা তার সেই ভয় কাটিয়ে দিয়েছেন। লন্ডনের মহা মহা ব্যাপার সম্বন্ধে আনা তড়খড়ের বর্ণনা, উৎসাহ এবং তাঁর নব আহরিত বিলিতি দ্যুতিতে জ্ঞানদাও উৎসাহিত। প্রগতির যাত্রায় এই পরিবারের মেয়েদের কাছে তার ঋণ বেড়ে চলেছে।
প্রসন্ন ঠাকুরের ছেলে জ্ঞানেন্দ্রমোহন খ্রিস্টধর্ম নিয়ে লন্ডনে বাস করছেন, বিলেতে তিনিই জ্ঞানদা ও ছেলেমেয়েদের স্থানীয় অভিভাবক হবেন। সত্যেনের মতে ইংরেজদের আদবকায়দা শেখার জন্য জ্ঞানদার বিলেতে গিয়ে বসবাস করা অত্যন্ত জরুরি। সুরেন, বিবি ও চোবিকেও বিলিতি কেতায় দুরন্ত করে ভোলা তার উদ্দেশ্য। এরপর নিজে যখন যাবেন, বাবামশায়ের অনুমতি পেলে ঠিক করেছেন রবিকেও সঙ্গে নিয়ে যাবেন ব্যারিস্টারি পড়াতে।
জ্ঞানদা দুর্জয় সাহসিনী। তার মতো আর কোনও বাঙালি মেয়েই কোনও পুরুষ সঙ্গী ছাড়া তিনটি বাচ্চা নিয়ে কালাপানি পেরোনোর কথা ভাবতে পারেনি। তার সাহস দেখে ঠাকুরবাড়ির অন্য মহিলাদের হাত পা ঠান্ডা হয়ে যায়। তবু প্রথমদিন সন্ধের মুখে জাহাজের ডেকে পঁড়িয়ে মনখারাপ লাগে জ্ঞানদার।
