বর্ণটি আছিল মোর অত্যন্ত উজ্জ্বল। উপযুক্ত তারি ছিল গঠন সকল ॥
সেই পরিমাণে ছিল হস্তপদগুলি। বলিত সকলে মোরে সোনার পুতুলী ॥
ঘাট থেকে দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে এ হেন সরলা বালিকা সেদিন জানতে চেয়েছিলেন, মা, আমাকে যদি কেউ চায়, তুমি কি আমাকে অন্যের হাতে দিয়ে দেবে?
এ-কথা শুনে মা চোখের জল মুছে বললেন, ষাট ষাট, তোমাকে কেন দেব? কে এসব বলল তোমাকে?
মায়ের কান্না দেখে রাসু বোঝেন অন্যের ঘরে যেতেই হবে। শুনে ভয়ে তাঁর নাওয়া-খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। পরে অবশ্য বিয়ের কথা উঠতে নতুন শাড়ি গয়না বাজনাবাদ্যির আবহে একটু একটু আনন্দও হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের পরে বর যেই তাঁকে পালকিতে তুলে রওনা দিলেন রাসু হাপুস নয়নে কেঁদে উঠলেন। নিজেকে বলির পাঁঠার মতো মনে হচ্ছিল।
সেদিন রাসসুন্দরীর মাথার ওপর থেকে মাতৃচ্ছায়া সরে গেল, তিনি মনে মনে ভগবানকে বললেন, লোকে যেমন আমোদ করিয়া পাখী পিঞ্জরে বদ্ধ করিয়া থাকে, আমার যেন সেই দশা ঘটিয়াছে। আমি ঐ পিঞ্জরে এ জন্মের মতো বন্দী হইলাম, আমার জীবদ্দশাতে আর মুক্তি নাই।
প্রথম ছ-সাত বছর শাশুড়ির কাছেও খুব যত্নে ছিলেন রাসু। সেই যে বিয়ের পর পালকি থেকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন শাশুড়ি, কোনও কাজই করতে দেননি। রাসুর দিন কাটত পাড়ার বালিকাদের সঙ্গে খেলাধুলো করে। সময় পেলে মাটি দিয়ে নানারকম পুতুল গড়তেন। একবার মাটির সাপ গড়ে রং করে পালঙ্কের নীচে রেখে দিয়েছেন, আর বাড়ির লোকেরা আসল সাপ ভেবে হইচই বাধিয়ে দিল। লাঠি নিয়ে এসে সাপ ভাঙার পর সবাই হেসে কুটোপাটি আর রাসু লজ্জায় অধোবদন। সেই থেকে আর মাটির পুতুল গড়েননি।
কিন্তু কিছু তো করতে হবে। তখন টাকাপয়সার চল হয়নি, কড়ি দিয়ে বেচাকেনা হত। রাসু কড়ি দিয়ে নানারকম জিনিস তৈরি শুরু করলেন, ঝাড়, আরশির গায়ে ঝোলানোর মালা, পদ্মফুল করে ঘরে ঘরে লটকে দেন। শাশুড়ি হাসিমুখে প্রশ্রয় দেন বালিকাবধূটিকে। কিন্তু এই সুখ বেশিদিন রইল না। চোখের দৃষ্টি হারিয়ে শাশুড়ি সান্নিপাতিকে শয্যাশায়ী হলেন আর সংসারের সব ভার এসে পড়ল রাসুর ওপর।
সেইসব ভয়াবহ দিনের কথা মনে করে রাসু তালপাতায় লিখতে থাকেন, ক্রমে ক্রমে ওই সকল কাজ আমার পক্ষে ঈশ্বরেচ্ছায় এমন সহজ হইল যে, আমি একাই দুবেলার পাক করিতে পারগ হইলাম, এবং সমুদায় কাজ করিয়া বসিয়া থাকিতাম। তখন মেয়েছেলেরা লেখাপড়া শিখিত না, সংসারে খাওয়াদাওয়ার কর্ম সারিয়া কিঞ্চিৎ অবকাশ থাকিত, তখন কর্তাব্যক্তি যিনি থাকিতেন, তাহার নিকট নম্রভাবে দণ্ডায়মান থাকিতে হইত। যেন মেয়েছেলের গৃহকর্ম বৈ আর কোন কর্মই নাই।
রাসু এ-সব নিয়মই অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। উদয়াস্ত খাটনির পর প্রায়ই নিজে খাওয়ার সময় পান না। সকালে উঠেই আগে কর্তার ভাত রান্না করে খাওয়ান। তারপর গুষ্টির সবার ভাত ডাল মাছ তরকারি, আটটি বাচ্চাকে খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো, পুজোআর্চার পর নিজের খাওয়া। কোনও কোনও দিন বাচ্চাদের ঘুম ভেঙে গেলে তার আর খাওয়া হয় না। কর্তা ঘরে থাকলে কাজ সেরে ঘোমটা টেনে গলবস্ত্র হয়ে তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা। কর্তা মানুষটি ভাল, কিন্তু পত্নীর দিকে নজর দেওয়ার কথা তার মাথায় আসে না।
ঘরে ঢুকেই তিনি হাঁক পাড়েন, কই গো, কোথায় গেলে, পা ধোয়ার জলটল দাও। যন্ত্রচালিত রোবটের মতো ছুটে এসে সেবা করেন রাসু। বুক। পর্যন্ত ঘোমটার ফাঁক দিয়ে কোনওরকমে স্বামীর যে পাদুটি দেখতে পান জল ঢেলে ধুইয়ে দেন।
জলখাবার খেয়ে কোনও বই নিয়ে বসেন সীতানাথ। ছেলেদের সঙ্গে পড়া নিয়ে আলোচনা করলে কান খাড়া করে শোনেন রাসু। তার খুব ইচ্ছে চৈতন্য ভাগবত পড়বেন। কিন্তু তিনি তো বইটাই চেনেন না।
রাসসুন্দরীর জীবনে একটা ম্যাজিক ঘটে গেল যেদিন মালিনীর সঙ্গে তার হঠাৎই দেখা হয়ে যায় খিড়কির পুকুরঘাটে। তার কাছেই ধীরে ধীরে আঁক কষতে শেখেন রাসু। বিদ্যেসাগরের বর্ণপরিচয় কিনে মালিনীর কাছে। বসে বসে অক্ষর শেখেন। সেদিনের কিশোরী বই-মালিনী রাসুর ভেতরে যে আগুন উসকে দিয়েছিল সে-খবর কেউ রাখেনি, কিন্তু তালপাতার পুঁথিতে যে লেখার শুরু তা যে আজ ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত, তাতেই বেজায় খুশি মালিনী। প্রথমেই একটি কপি নিয়ে দৌড়ে এসেছে স্বর্ণকুমারীর কাছে।
স্বর্ণ এতদিন ভাবতেন তাকেই লেখার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে অহরহ, কিন্তু এই বই পড়ার পর তার সেই প্রত্যয় নড়ে গেল। এই অবরোধে বন্দি প্রৌঢ়া লেখার জন্য তার চেয়েও কত বেশি ঝুঁকি নিয়েছেন দেখে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে স্বর্ণর।
পরের সপ্তাহে মালিনী এলে আবিষ্কারকের সম্মান দিয়ে স্বর্ণ তাকে জড়িয়ে ধরেন। তেতলার ঘরে মুড়ি, ফুলকপির বড়া ও নতুন বঙ্গদর্শন সহযোগে মজলিশ জমিয়ে তোলেন স্বর্ণ, মালিনী ও কাদম্বরী।
মালিনী জানতে চায়, নতুন সংখ্যাটি পড়ছ স্বর্ণদিদি? বঙ্কিমবাবু যে কী ভাল। কাজ করছেন এই পত্রিকা বের করে, কত নতুন নতুন লেখা পড়া যাচ্ছে।
স্বর্ণ পালঙ্ক থেকে নেমে লেখার টেবিল থেকে বঙ্গদর্শনের একটি কপি নিয়ে আসেন, দেখো দেখো, আমি তো হাঁ করে বসে থাকি কবে নতুন সংখ্যাটি আসবে। প্রতিমাসে বিষবৃক্ষ না পড়লে আমার ঘুম হয় না যেন।
