কেন ছাপা হয়নি নাম? জ্যোতির মনে হয়েছিল আগে লোকের রিঅ্যাকশন দেখে তারপর নাম প্রকাশ করে সবাইকে চমকে দেওয়া হবে। তার ফল হল মজার, লোকেরা তো ভাবেইনি সত্যি সত্যি মেয়েরা এরকম লিখতে পারে, এমনকী কাছের লোকদের ধোঁকা লাগল। সবচেয়ে কৌতুকের ঘটনাটা ঘটালেন সত্যেন্দ্র। ডাকমারফত অনামিকা বইটি পেয়ে তিনি জ্যোতিকে চিঠিতে লিখলেন, জ্যোতির জ্যোতি কি প্রচ্ছন্ন থাকিতে পারে?
উপন্যাসটি যে সত্যিই স্বর্ণকুমারীর লেখা সে-কথা বিশ্বাস করতে পাঠকের সময় লাগল। কিন্তু ১৮৭৬ সালটি মেয়েদের লেখালিখির ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে উঠল শুধু দীপনির্বাণের জন্যই নয়, এই বছরে মহিলাদের আরও দুটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ বেরিয়েছে। কুমিল্লার নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানি লিখে ফেলেছেন রূপজালাল নামে একটি দীর্ঘ প্রণয়কাব্য। পিছিয়ে থাকা মুসলমান সমাজের পক্ষে তা সহ্য করা কঠিন হয়ে উঠেছে, অথচ নবাবকে চটানোও বিপজ্জনক। ফয়জুন্নেসা হয়ে উঠেছেন তাদের শাঁখের করাত।
অন্য আর-একটি গ্রন্থ খুবই গুরুত্বপূর্ণ, অন্তঃপুরবাসিনী জনৈক প্রৌঢ়া রাসসুন্দরী দেবীর নামে প্রকাশিত হয়েছে একটি আশ্চর্য আত্মজীবনী, আমার জীবন। তাঁর রচনা থেকে গোঁড়া হিন্দুবাড়ির অন্দরের এমন সব ছবি পাওয়া যাচ্ছে যা ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের আলোকিত জীবনযাত্রা থেকে একদম আলাদা। মালিনীর কাছ থেকে বইটি হাতে পেয়ে পড়তে পড়তে রাসসুন্দরীর জীবনের প্রতি ছত্রে ছত্রে স্বর্ণ চমকে ওঠেন।
একদিন সকালে যখন পাকঘরে ছেলেমেয়েদের খেতে বসিয়ে রাসসুন্দরী পাশের ঘরে গেছেন, তখনই কত্তার ঘোড়াটি উঠোনে ধান খেতে এল। রাশিকৃত ধানের প থেকে রোজই ধান খায় ঘোড়া কিন্তু তাকে দেখলে রাসসুন্দরীর বড় লজ্জা করে। তিনি পরদানশীন মহিলা, বুক পর্যন্ত ঘোমটা টেনে চুপচাপ উদয়াস্ত ঘরের যাবতীয় কাজ সারেন। বিধবা ননদিনীদের সঙ্গে কথা বলতেও লজ্জা পান, বউমানুষের তো এমনই রীতি। ঘোড়া তো কর্তার প্রতিভূ, তার সামনেও লজ্জায় বেরতে পারেন না। এখনও ঘোড়াকে দেখে ওপাশের ঘরে গিয়ে আটকে গেলেন রাসসুন্দরী, এদিকে বাচ্চারা মা মা করে ডাক শুরু করল পাকঘরে। কেউ কাঁদতে লাগল, ঘোড়াও ধান খেতে লাগল। যায় না।
রাসসুন্দরী এক-একবার এগোন আবার লজ্জায় পেছিয়ে যান। মনে মনে ভাবেন, কর্তার ঘোড়ার সম্মুখে আমি কেমন করিয়া যাই, ঘোড়া যদি আমাকে দেখে, তবে বড় লজ্জার কথা।
তখন তার বড়ছেলে এসে মাকে অভয় দেয়, মা, ও ঘোড়া কিছু বলবে না, ও তো আমাদের জয়হরি ঘোড়া, ভয় কি?
ছেলের কথা শুনে মনে মনে নিজেকেই ধিক্কার দেন তিনি। ছি ছি আমি কি মানুষ! সবাই ভাবছে আমি ঘোড়া দেখে ভয় পাই, আসলে যে লজ্জায় পালাচ্ছি সেকথা শুনলে ওরা ভাববে পাগল। কেউ তো আমাকে শাসন করছে না, ঘরে নিজের মতো থাকতে ভয় পাই কেন নিজেই বুঝি না।
ছেলের হাত ধরে রাসসুন্দরী পাকঘরে আসেন। আর ঘোড়া দেখে লজ্জা করবেন না মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন। পাকঘরই তার নিজের জায়গা। সারাদিন কেটে যায় পঁচিশ-তিরিশজন লোকের রান্নাবান্নায়, বারবাড়িতে আটটি দাসীচাকর অন্দরে কেউ নেই। আগে চাকরানিদের সঙ্গেও কথা বলতেন না, তিনি নিজেই লিখছেন যে ইদানীং তাদের নির্দেশ না দিলে তারা বড্ড কাজে ফাঁকি দেয়।
কাজ সারা হলে গোপনে পড়াশোনা করেন রাসু। জানতে পারলে লোকে ছি ছি করবে সে তার সইবে না। কত যত্নে পাকঘরের খড়ির নীচে চৈতন্য ভাগবতের পাতা লুকিয়ে রেখে একটু একটু করে পড়তে শিখেছেন তিনি। এখন জীবনের না বলতে পারা কথা কিছু কিছু লিখেও রাখেন, সেই স্মৃতিচারণের তালপাতায় আজও দুটি নতুন পক্তি লিখলেন–
এখন কখন মনে পড়ে সেই দিন।
পিঞ্জরেতে পাখী বন্দী, জালে বন্দী মীন।
ফরিদপুরের ভড় রামদিয়া গ্রামের সীতানাথ সরকারের সঙ্গে বারো বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল রাসসুন্দরীর। তখনও তিনি এক সরলা বালিকা। বিয়ের আগে বাপের বাড়ি খেলতে খেলতে শুনে এলেন তাকে নাকি পরের ঘরে যেতেই হবে।
ঘাটের ধারে একটি লোক তাকে দেখিয়ে বলেছিল, এ মেয়েটি বেশ সুন্দর। যার ঘরে যাবে সে খুব সৌভাগ্যশালী।
আরেকজন বললে, কতজন যেচে নিতে এসেছে, এর মা কাউকেই মেয়ে দিতে চাননি।
সেই প্রথম রাসুর মনে পরের ঘরে যাওয়ার ভয় ঢুকল। যখন চারদিকে গৌরীদানের বাড়বাড়ন্ত আট-ন বছরের মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায় তখনও এই বালিকা পরম নিশ্চিন্তে মায়ের কোলে মুখ ডুবিয়ে বসে ছিলেন। বলিপ্রদত্ত ছাগলছানার মতো নিরুদ্বেগ। খেলার সঙ্গিনীরা তাকে সোহাগের আরশি বলে ঠাট্টা করলেও তিনি কেঁদে ভাসিয়ে দিতেন। সে যে সংসারের অনেক নিয়ম জানতে পারেননি তার একটা কারণ এই যে তাঁর মা তাকে একটু তুলে তুলে মানুষ করছিলেন। সঙ্গিনীদের দুষ্টুমি থেকে বাঁচাতে তার খেলা বারণ হল। তাঁদের বাড়িতেই বসত ছেলেদের বাংলা শেখার স্কুল। গ্রামে তখন মেয়েদের পড়াশোনা শুরু হয়নি। দাদারা রোজ সকালে তাঁকে কালো ঘাগরার ওপর ওড়নি পরিয়ে পাঠশালায় বসিয়ে রাখা শুরু করলেন। এক মেমসাহেব পড়াতে আসতেন। শুনে শুনে আর দেখে দেখে বালিকা সেখানেই কিছু বর্ণমালা শিখেছিলেন। পাঠশালায় চুপ করে বসে থাকলেও তার রূপের খ্যাতি ছড়াতে লাগল। লোকে। তাকে দেখে যা যা বলত মনে করে গোপনে ছড়া বেঁধেছেন রাসসুন্দরী
