এমন শাড়ি আগে দেখিনি তো! স্বর্ণ বলেন। কিন্তু কাদম্বরী মনে করান, কেন ঠাকুরঝি, সেই যে একসময় স্ত্রীশিক্ষা আর বিধবা বিয়ে চালু করার জন্য বিদ্যাসাগর মশায়কে সম্মান জানাতে তাঁতিরা বিদ্যেসাগরি ধুতি বুনেছিল, যার পাড়ে লেখা হয়েছিল, বেঁচে থাকুন বিদ্যোসাগর চিরজীবী হয়ে, মনে নেই!
বিশু তাঁতিনির কাছে গামছার বাহারও কম নয়। সে চমৎকার ছড়া কেটে বলে, জানো তো দিদিমণি বউমণিরা, কথায় বলে, নিরগুণ পুরুষের তিনগুণ ঝাল। পরনে গামছা, গায়ে ঠাকুরদাদার শাল।
মানে কী তাঁতিনি? রূপকুমারী জানতে চায়। দেবেন ঠাকুরের সৌজন্যে সে এ-বাড়িতে টিকে গেছে। সব শুনে রূপাকে ধমক দিয়ে সংযত হতে বলেছেন দেবেন্দ্রনাথ, কিন্তু সারদার আদরের পুষ্যিকে বাড়িছাড়া করতে তার মন সায় দেয়নি।
কাদম্বরী রূপাকে কাছে টেনে নিয়ে বলেন, বোকা মেয়ে, এটাও বুঝলি না, মানে হল যে পুরুষের গুণ নেই, কাপড় কেনার মুরোদ নেই সে গামছার ওপর ঠাকুরদাদার শাল জড়িয়ে দুর্দশা ঢাকতে চায় আর ঈর্ষায় অন্যের ওপর ঝাল ঝাড়ে।
মেয়েদের কারও কারও ভুরু কুঁচকে যায় এ-কথায়, কেননা স্বর্ণ আর কাদম্বরী যত মহার্ঘ সব সিল্কের শাড়ি বাছছেন, অনেকেরই তা কেনার সামর্থ্য নেই। বাড়ির বউরা স্বামীর উপার্জনে গরবিনী, তাঁদের খরচের হাতটাও বড়। কিন্তু মেয়েদের অনেকের হাতেই অত টাকা থাকে না, তাদের স্বামীরা ঘরজামাই, ভাইদের মতো ততটা সম্পন্ন নন। আর শরৎকুমারী, সৌদামিনীরা ঘরে থাকেন বলেও কমদামি বেগমবাহার, বাগেরহাট বা ফরাসডাঙা কেনেন পারিবারিক তহবিল থেকে। নানারকম শাড়ির ঝলকানিতে রঙবেরঙের তন্তুজালে উঠোন আলো হয়ে যায়।
স্বর্ণর বর জানকী অবশ্য ভাল রোজগার করেন। ঘরজামাই হওয়ার গ্লানিও তিনি বহন করেননি কোনওদিন। বরং দেবেন ঠাকুরের আদরিণী কন্যাকে আদরে সম্পদে ভরিয়ে দিয়েছেন তিনিও।
কাদম্বরী একটি মভরঙের বালুচরী বেছে স্বর্ণকুমারীকে বললেন, তোমার প্রথম উপন্যাসের প্রকাশ উপলক্ষে এটা আমার উপহার, অনুষ্ঠানের দিন এই শাড়িটা পরবে। স্বর্ণ আনন্দে নতুনবউঠানকে জড়িয়ে ধরেন। দু-একদিন পরেই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ হচ্ছে তার প্রথম উপন্যাস দীপনির্বাণ, সেই নিয়ে নতুনবউঠানের উত্তেজনার স্পর্শে স্বর্ণও আবেগতাড়িত হলেন।
স্বর্ণ সাজগোজ করতেও ভালবাসেন। এই কিছুদিন আগে তিনি যখন মিস ক্রয়েডের ডাকা মেয়েদের মজলিশে গেলেন, অন্য সবাই হা করে তার সাজগোজ দেখতে থাকেন। চওড়া সাদা পাড়ের কালো বোম্বাই শাড়ি, ফ্রিল ও লেস লাগানো বারো আনা হাতার জ্যাকেট, সঙ্গে মুক্তোর সাতলহরী হার। সভায় এসেছিলেন কবি কামিনী রায়, তিনি তো স্বর্ণকে বলেছেন সাক্ষাৎ স্বর্গচ্যুত সরস্বতী। স্বর্ণ ঠিক করেছেন কামিনীর সঙ্গে সই পাবেন।
অনেক মেয়েরাই সেখানে এসেছিলেন, কিন্তু গিরীন্দ্রমোহিনী আসেননি। স্বর্ণর খুব ইচ্ছে তার সঙ্গে আলাপ করে বন্ধুত্ব পাবেন। চিঠিতে যোগাযোগ হয়েছে, তাতে সামনাসামনি সাক্ষাতের ইচ্ছে আরও বেড়েছে কিন্তু তাদের বাড়ির মেয়েদের এখনও বাইরে বেরোনোর নিয়ম নেই।
এখনও মেয়েরা এরকম বন্দি হয়ে থাকবে এটা অসহ্য লাগে, ঘরের কোণ থেকে মেয়েদের বাইরে নিয়ে আসার জন্য আন্দোলন করতে ইচ্ছে হয় স্বর্ণর। স্বদেশিভাব জাগানোর জন্য মেয়েদের মধ্যে সখ্য গড়ে তুলতে হবে, ফিমেল বন্ডিং। তাই তো স্বর্ণ একের পর এক লেখিকার সঙ্গে সই পাতান। লাহোরিণী শরৎকুমারী তার বিহঙ্গিনী সই। গিরীন্দ্রমোহিনীকে পাতিয়েছেন মিলনসই। অথচ তার সঙ্গেই মিলন হয়নি এখনও। তাই স্বর্ণ চিঠির পর চিঠি পাঠান তার মিলনসইকে, কখনও কখনও বন্ধুত্বের তীব্র আকাঙ্ক্ষায় গিরির উদ্দেশে লেখা কবিতা প্রায় প্রেমের কবিতার মতো শোনায়,
বিরহে থাকে প্রেম মরমে মিশি,
তাই অদরশনে সুখ সাধে ভাসি,
বিরহে আঁখি জাগে সকলি জেগে থাকে,
আঁখিতে আঁখি হলে শুধু জাগে হাসি।
পত্ৰকবিতা পেয়ে গিরিও উতলা হন, কিন্তু তার উপায় নেই। তিনি গোঁড়া পরিবারের গৃহিণী, বাইরে বেরোনোর হুকুম নেই। লুকিয়ে চুরিয়ে লেখালিখি শুরু করেছিলেন। স্বামী জানতে পেরে পরে অবশ্য অনুমতি দিয়েছেন। ঘরসংসার সামলে স্ত্রী যদি সাহিত্যচর্চা করেন, তাতে তার আপত্তি নেই। এখন তো কত মেয়েরাই লিখছে ভারতী, বামাবোধিনীর মতো পত্রপত্রিকায়। গিরিকে তিনি লেখা পাঠানোর উৎসাহ দেন। শিক্ষিত ভদ্রলোকের পক্ষে শিক্ষিত পত্নী অত্যন্ত গৌরবের। বাড়ি বসে যত ইচ্ছে লেখাপড়া করুক, কিন্তু পরদা ভেঙে স্ত্রীর বাইরে বেরোনোর কথা ভাবতে পারেন না দত্তমশায়। দীপনির্বাণের প্রকাশ উপলক্ষেও গিরিকে ডাক পাঠিয়েছেন স্বর্ণ, কিন্তু তিনি কি ছাড়া পাবেন! এবারেও স্বর্ণকে হতাশ করলেন গিরিন্দ্রমোহিনী। পৌষের এক শিরশিরে বিকেলে প্রকাশিত হল দীপনির্বাণ, আর বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই সাড়া পড়ে গেল বাংলা বইয়ের বাজারে। আশ্চর্য ব্যাপার, বইটিতে লেখকের নাম ছাপা হয়নি। কানাঘুষা শোনা যাচ্ছে ঠাকুরবাড়ির কোনও মেয়ের লেখা। এর আগেও দু-চারজন মহিলা আখ্যান লেখার চেষ্টা করেছেন, সেগুলো কোনওটাই এর মতো পরিশীলিত হয়নি।
সাধারণী পত্রে সমালোচনায় সন্দেহের চোখে ব্যস্তুতি লেখা হল, শুনিয়াছি এখানি কোন সম্ভ্রান্তবংশীয়া মহিলার লেখা। আহ্লাদের কথা। স্ত্রীলোকের এরূপ পড়াশোনা, এরূপ রচনা, সহৃদয়তা, এরূপ লেখার ভঙ্গী বঙ্গদেশ বলিয়া নয় অপর সভ্যতর দেশেও অল্প দেখিতে পাওয়া যায়।
