সরলা, হিরন্ময়ীর স্কুলে যাতায়াত শুরু হয়েছে। স্কুল থেকে ফিরেই শশীপণ্ডিতের কাছে সংস্কৃত পড়া, তারপরেই চলে আসেন গানের মাস্টারমশাই ভীমবাবু। বড়মেয়ে হিরন্ময়ীর গুণপনা নিয়ে খুশি ছিলেন স্বর্ণকুমারী, এবার রাজা সৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুরের স্কুল থেকে আসা ভীমবাবু যখন সরলার গানের গলা নিয়ে ভাল রিপোর্ট দিলেন, সেই প্রথম মেজোমেয়ের দিকে ভাল করে নজর পড়ল তার।
শরৎকুমারীর মেয়ে সুপ্রভা বিশেষ পড়াশোনার ধার ধারে না, কিন্তু উপস্থিত বুদ্ধির জোরে সে বালিকামহলের নেত্রী। সরলার গান প্র্যাকটিসের সময় বেড়ে যাচ্ছে দেখে সে সরলাকে উদ্ধার করার একটা উপায় বলল, অতক্ষণ ধরে প্র্যাকটিস করতে যদি ভাল না লাগে, দরকার কী করার?
সরলা ভয় পেয়ে যায়, সে কী করে হবে? প্র্যাকটিস না করে তো উপায় নেই।
আছে বইকী, অকুতোভয় সুপ্রভা বলে, ওই সময়ে ঘড়ির কাটাটা রোজ একবার করে এগিয়ে দিলেই হবে।
ওরে বাবা, সে আমি পারব না, সরলা শিউরে ওঠে এই প্রস্তাবে।
সুপ্রভা বলে, ঠিক আছে, আমি করে দিচ্ছি। একটি চেয়ারের ওপর উঠে ঘড়ির কাঁটা কুড়ি মিনিট এগিয়ে দিয়ে সে চলে যায়।
কিছুক্ষণ পরে স্বর্ণ এসে কিছু একটা সন্দেহ করলেন। সরলা ঘড়িতে হাত পাবে না, কিন্তু সুপ্রভাকে এ ঘরে ঘুরঘুর করতে দেখেছেন তিনি। বুঝে নিলেন সবটাই কিন্তু দিদির মেয়েকে তো শাসন করা যায় না আর আসল দোষ তো সরলার। স্বর্ণ ঠিক করলেন চড় মেরে শাসন করবেন সরলাকে। কিন্তু ঘরে অন্য সকলে আছে, তাদের সামনে চড় মারা স্বর্ণর বিচারে অশোভন। তাদের ঘর থেকে চলে যেতে বলে তারপর একটি কোমল চপেটাঘাতে শাস্তি দিলেন মেয়েকে। কিন্তু মঙ্গলার বিরাশি সিক্কার চড়ের কাছে মায়ের এই চড় তো আদরমাত্র। লোকের সামনে মারলে বালিকার আত্মমর্যাদায় লাগবে, স্বর্ণর এই সংবেদনশীলতায় সরলার বালিকামনে যেন আলোর ছোঁয়া লাগে। শাস্তি পেয়ে সরলা এত খুশি কেন তা বুঝতে পারলেন না স্বর্ণ কিন্তু তারপর থেকে গানের তালিমটা কমিয়ে দিলেন আধঘণ্টা।
হেমেন আর নীপময়ীর সন্তানরা ঠাকুরবাড়িতে আর-এক রকম কড়া শাসনে থাকে, বাবা-মায়ের শাসন। অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে মেশার হুকুম নেই তাদের, নিজেদের মহলে গান ও পড়ার নিয়মনিগড়ে একদম বাঁধা। একটু বিচ্যুত হলেই হেমেন তাদের উত্তমমধ্যম লাগান।
স্বর্ণর ছোট মেয়েকে অবশ্য এ-সব কঠিন নিয়ম স্পর্শ করে না, তাকে নিয়ে সারাক্ষণই মেতে থাকেন কাদম্বরী। তার নিঃসন্তান মাতৃহৃদয়ের সব স্নেহমমতা দখল করে নিয়েছে ঊর্মিলা। শুধু সে যখন থেকে স্কুলে ভরতি হয়েছে, সরলা, হিরন্ময়ীর সঙ্গে এক পালকিতে যাওয়ার সুবাদে তিনবোনের মেলামেশা হচ্ছে কিছুটা।
জানকীনাথ এখন প্রবাসে। স্বর্ণ এই পুরো সময়টা সরস্বতীর সেবায় ব্যয় করবেন ঠিক করেছেন। মেয়েরা লিখতে পারে না– এই বদনাম ঘোচাতেই হবে তাকে। এতদিন ধরে লিখে সবে শেষ করেছেন তার প্রথম উপন্যাস দীপনির্বাণ। টডের রাজস্থানি কাহিনি অ্যানালজ অ্যান্ড অ্যান্টিকুইটিজ অভ রাজস্থান ঠাকুরবাড়ির ছেলেমেয়েদের খুব প্রিয় বই। বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুণ্ডলার প্রভাবে স্বর্ণ লিখতে চেয়েছেন ঘটনাবহুল একটি ঐতিহাসিক কাহিনি।
জ্যোতিদাদার মতো তিনিও রাজপুত নায়কদের বীরগাথায় মুগ্ধ। জ্যোতিদাদার মতোই মুসলমান ও ইংরেজ শাসনের চাপে কোণঠাসা হিন্দু সংস্কৃতিকে লেখার মাধ্যমে জাগিয়ে তোলার ব্রত নিয়েছেন স্বর্ণও। রবি কয়েক বছর আগে শান্তিনিকেতনে গিয়ে পৃথ্বীরাজের পরাজয় নামে একটি বীররসের কবিতা লিখেছিলেন। স্বর্ণও মহম্মদ ঘোরির হাতে পৃথ্বীরাজের পরাজয় নিয়ে তার দেশাত্মবোধক উপন্যাসের উপাদান আহরণ করেছেন এই রাজপুত ইতিহাস থেকে। আর্য অবনতির এই কাহিনিতে পৃথ্বীরাজ আর্যদের লুপ্ত শৌর্যের প্রতীক। স্ত্রীচরিত্রগুলিও সেইসব কল্পনার আর্যনারীর প্রতিচ্ছবি, যাদের জন্য গর্ব হয়। জ্যোতির ধারণা, আর্যভারতকে স্বদেশি মন্ত্রে দীক্ষিত করতে সাহায্য করবে এই উপন্যাসটি, তাই বইটি প্রকাশের ব্যাপারে জ্যোতি ও কাদম্বরী অত্যন্ত উৎসাহী। গ্রন্থ প্রকাশের তোড়জোড় চলছে।
লেখা ছাড়া স্বর্ণকুমারীর বাকি সময়টা কাটে নতুনবউঠান আর জ্যোতিদাদার সঙ্গে, ভারতীর মজলিশে। মাঝে মাঝে কখনও খেয়াল হলে নীচের মহিলাদের আসরে গল্প করতেও নামেন।
ঠাকুরবাড়ির উঠোনে সেদিন বিশু তাতিনি এসেছে। বিরাট শাড়ির পুঁটলি ঘিরে জমা হয়েছে মেয়ে-বউরা। কাদম্বরীর হাত ধরে স্বর্ণও নেমে এলেন নীচে।
একটি মেঘডম্বরু বিষ্ণুপুরী সিল্কের শাড়ি হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে কাদম্বরী বলেন, বেজায় দাম বলছ বিশু।
শাড়িওলি বলল, কিন্তু বোঠান, এ কাপড়ের জাত আলাদা, দু-তিন পুরুষ ঠেসে পরলেও ছিঁড়বে না। আর যিনি পরবেন তাকে দেখাবে যেন রাজরানি।
দু-তিন পুরুষ কী গো, আমরা কি পুরুষমানুষ নাকি? হি হি করে হেসে গড়িয়ে পড়ে রূপকুমারী।
সৌদামিনী সুপুরি কাটছিলেন, তিনি খোঁজেন লুপ্ত হয়ে যাওয়া এক বিশেষ বস্ত্র। বলেন, মায়ের ছিল একখানা ধূপছায়া রঙের সূক্ষ্ম পায়নাপল শাড়ি। এখন আর সেরকম একটা কাপড় আনতে পার না তিনি?
মিলের সুতোয় তৈরি একটি গানপেড়ে শাড়ি দেখে স্বর্ণ পুলকিত হন, তার পাড় জুড়ে বুনে তোলা কবিতার দুটি পঙক্তি– যমুনাপুলিনে কাঁদে রাধা বিনোদিনী/ বিনে সেই বাঁকা রায়শ্যাম গুণমণি।
