ঊর্মিলার দেবশিশুর মতো হাসিতে বারান্দার কলহতিক্ত আসরটা যেন আলো হয়ে যায়। তাকে কোলে চেপে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিলেন কাদম্বরী, চোখে তখন খুশির অশ্রু।
০৯. দীপনির্বাণ
পৃথিবীর সেই বিরল সৌভাগ্যবতীদের একজন স্বর্ণকুমারী, যাঁর লেখিকা হওয়ার পথে গোলাপের পাপড়ি বিছিয়ে দিয়েছেন তার স্বামী, ছেলেমেয়েদের দেখাশোনায় বা সংসারের কাজে আটকে স্ত্রীর লেখাপড়ায় যাতে কোনও ব্যাঘাত না ঘটে সে দিকে কড়া নজর জানকীনাথের। তিন ছেলেমেয়ে জ্যোৎস্নানাথ, হিরন্ময়ী ও সরলাকে নিয়ে প্রথমে শেয়ালদার বৈঠকখানা রোডে বাসা বেঁধেছিলেন জানকী ও স্বর্ণকুমারী। বাচ্চাদের দেখার দায়িত্ব দাসীদের। এ ব্যাপারে স্বর্ণ মায়ের চেয়েও উদাসীন।
রোজ বিকেলে হাত মুখ ধুইয়ে পরিষ্কার জামা পরিয়ে শেয়ালদা স্টেশনে বেড়াতে নিয়ে যায় দাসীরা। দাসীর সঙ্গী দারোয়ান দাঁড়িয়ে থাকা বগিতে বাচ্চাদের বসিয়ে রেখে যুবতী দাসীর সঙ্গে একটু রসের কথাবার্তা বলে। ওই বিকেলের লোভনীয় অবসরটুকুর জন্য বাচ্চাদের মতো রোজই দাসী চাকরেরাও মুখিয়ে থাকে। কিন্তু একদিন বাচ্চাদের নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বগি শান্টিং করার জন্য হঠাৎ চলতে শুরু করল। সরলা কেঁদে উঠে বলে, একী, একী গাড়ি চলছে? কোথায় যাচ্ছে?
দাসীও ভয়ে চিৎকার করে উঠলে দারোয়ান তার বীরত্ব দেখিয়ে বগির সঙ্গে সঙ্গে হাত নেড়ে হাঁটতে লাগল। দুমিনিটের মধ্যেই অবশ্য গাড়ি থেমে গেল। ছেলেমেয়েদের এ-সব অ্যাডভেঞ্চারের কাহিনি স্বর্ণ বা জানকী কখনও জানতে পারেন না। তবে বাচ্চা জন্মানোর পর জানকীর বাবামশায় আর রাগ করে থাকতে পারেননি। মাঝে মাঝেই তিনি এসে নাতিনাতনিকে আদর করে যান, বাচ্চারাও সেই স্নেহস্পৰ্শটির জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকে।
কিছুদিন পর স্বর্ণ ও জানকী সিমলেপাড়ায় মিনার্ভা থিয়েটারের পাশের গলিতে একটি দোতলা বাড়িতে উঠে এলেন। সেখানে চার বছরের সরলা একদিন খেলতে খেলতে ছাদের মার্বেল সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে পড়ে রক্তারক্তি কাণ্ড বাধাল। সামনের দুটি দাঁত ভেঙে মেজেতে গড়াগড়ি। দাসীটি নিজেকে নির্দোষ দেখানোর জন্য সরলাকে এমন বকতে লাগল যে সে ভয়ে কাঁদতেও পারল না।
একে অসহ্য ব্যথা তার ওপর দিদি হিরন্ময়ী বলল, তোর দাঁত ভেঙেছে, চিরকাল ফোকলা থাকবি।
দাসীরা আবার আরও ভয়ংকর কথা বলল, সরলাদিদির বিয়ে হবে না, বর এসে ফোকলা দাঁত দেখে ফিরে যাবে।
অনেক সোরগোলের পর জানকীনাথ নেমে এসে ওষুধ লাগিয়ে দিলেন কিন্তু তপস্যারত স্বর্ণকুমারীর কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। তার ধারণা আতুপুতু না করলেই বাচ্চারা স্বাবলম্বী হবে। বাঙালি মায়েরা বাচ্চা মানুষ করতে গিয়ে যেভাবে নিজের জীবন বিসর্জন দেয় সেটা তার একেবারেই পছন্দ নয়।
মাতৃত্ব নিয়ে জ্ঞানদার বিচার প্রিয় ঠাকুরঝির থেকে একদমই আলাদা। বোম্বাই প্রবাসে প্রায়ই এ নিয়ে তর্ক বেধে যেত ননদ-ভাজে। স্বর্ণর মতে মাতৃত্ব একটি অনিবার্য জৈবিক ঘটনা, তা নিয়ে বেশি মাতামাতি করলে মেয়েদের লেখাপড়া করা সম্ভব না। জ্ঞানদা কিন্তু মনে করেন মেয়েদের প্রগতির পথে মাতৃত্ব কোনও বাধা হবে না, বরং যে সন্তানদের তিনি স্বেচ্ছায় পৃথিবীতে এনেছেন, অগ্রগতির পথে তাদের পেছনে ফেলে নয়, বরং সঙ্গে নিয়েই এগোতে হবে।
.
এখন স্বর্ণকুমারী সিমলের বাড়ি ছেড়ে জোড়াসাঁকোয় আছেন, জানকীনাথ ব্যারিস্টারি পড়তে গেছেন বিলেতে। বাইরের দিকের তেতলায় জ্যোতিদাদার ঘরের পাশেই স্বর্ণর শোবার ঘর। একেবারে যাকে বলে, নিজস্ব কুঠুরি। এখানে সারাদিন তিনি লেখেন, পড়েন, ভারতী সম্পাদনায় সাহায্য করেন নতুনবউঠান ও জ্যোতিদাদাকে। এই ঘর সরস্বতীর আপন দুনিয়া।
বাচ্চারা থাকে অনেক দূরে, ভেতরে মহলের তেতলায় দাসীদের সঙ্গে। দিনান্তে একবারও তাদের সঙ্গে দেখা হয় না বহুদিন। মায়ের সঙ্গ না পেলেও জোড়াসাঁকো বাড়ির বিশালত্ব, মাস্টার পণ্ডিত, দাসদাসী, ভাইবোনেদের সঙ্গে মেলামেশা, চলাফেরার মধ্যে দিব্যি দিন কেটে যায় সরলা, হিরন্ময়ী, জ্যোৎস্নানাথের। অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে একটু পার্থক্য ছিল যে, ঝি চাকর থাকলেও তারা মাঝে মাঝে মা-বাবার সংসর্গ পেত কিন্তু স্বর্ণর শিশুরা একেবারে তাদের হাতেই সমর্পিত।
তিনজনের তিনটি আলাদা দাসী, তারা যে যার ভাগের বাচ্চার জন্য ভাল খাবারটুকু জোগাড় করার চেষ্টা করে। নাওয়া, ধোয়া, পরিচ্ছন্নতা দেখে। তবে স্বভাব অনুযায়ী দেখাশোনার তারতম্য হয় তো বটেই। সরলার মঙ্গলা দাসী হিন্দুস্তানি গয়লানি, গায়ের রং যেমন ঘোর কালো তেমনি তার মেজাজ। দেখভাল করে বটে, তবে তার কথার একচুল এদিক ওদিক করলেই মেরে সরলার ফরসা চামড়া লাল করে দেয়। তখন তার মার প্রতি খুব অভিমান হয়। সরলার আগের বাড়ির যাদুদাই স্নেহের টানে মাঝে মাঝেই দেখতে। আসে হাতের ঠোঙায় কিছুমিছু খাবার নিয়ে। সে বড় স্নেহপ্রবণ, আদরে চুমুতে ভরিয়ে দেয় এলেই। কিন্তু তাকে দেখলেই ভাইবোনেরা বড় হাসিঠাট্টা করে বলে সরলার লজ্জা করে। ওদিকে সতীশ পণ্ডিতের কাছে পড়তে বসেও আরেকপ্রস্থ মার খেতে হয় বালক-বালিকাদের। তিনি বাড়িতেই থাকতেন, ফলে পাঠশালার বাইরেও যখন তখন তার রুলের বাড়ি গায়ে পড়ার সম্ভাবনাও সামলে চলতে হয় বাচ্চাদের। সকালে উঠে দুধ খেয়েই বাইরের পড়ার ঘরে তার কাছে আসতে হয়, তিনি প্রথমেই দেখেন দাঁত ঠিকমতো মাজা হয়েছে কি না, না হলেই রুলের গুঁতো।
