সে আর শুনে কী হবে বাছা! সৌদামিনী বললেন, নীচের তলায় তো নাম না আজকাল, জানবে কী করে? আঁচলে তেলহলুদের দাগ নিয়ে আমরা খেটে মরছি আর তুমি সকালবেলা সেজেগুজে সাহিত্যচর্চা করছ। তাই বলছি সংসারের ব্যাপারে তুমি আর নাক গলাতে এসো না।
কোন কাজটা করিনি ঠাকুরঝি? এবার কেঁদে ফেলেন কাদম্বরী, আমাকে এত কথা শোনাচ্ছ কেন? রূপা তোমাদের চক্ষুশূল না আমি? সৌদামিনীর দিকে তাকিয়ে তিনি মনে মনে ভাবেন, তুমিই বা কম কীসে, চৌকিতে বসে গায়ে তেল মাখাচ্ছ আর হুকুম চালাচ্ছ!
বালাই ষাট, নীপময়ী এবার বললেন, তুমি কেন চক্ষুশূল হবে নতুনবউ? কিন্তু সংসারে থাকতে গেলে সংসারের নিয়ম একটু মানতে হয়, না হলে কথা ওঠে।
কী নিয়ম মানিনি? কাদম্বরী জানতে চান। তার মনে হয় সবাই যেন একযোগে পেছনে লেগেছে। কেউ কি তাঁর হয়ে বলার নেই!
শরৎকুমারীর রূপটান এতক্ষণে শুকিয়ে গেছে, গা থেকে ঘষে ঘষে সর-ময়দা তুলছিলেন, এখন বললেন, ছাড়ো তো ও-সব। ওর বাচ্চা হয়নি, বেচারা নিজের মতো সাহিত্য নিয়ে, বাগান নিয়ে, রূপা আর ঊর্মিলাকে নিয়ে মেতে আছে, থাকতে দাও না।
না, আমি আজ জানতে চাই, দোহাই তোমাদের। শরতের সহানুভূতি পেয়ে কাদম্বরী তার পাশে বসে পড়ে বলেন, আমার বিরুদ্ধে যা যা মনে আছে বলো।
জ্ঞানদার এতক্ষণে মনে হচ্ছে একটু বেশিই আক্রমণ করা হয়ে যাচ্ছে কাদম্বরীকে, তিনি সান্ত্বনা দিতে চান, দেখো নতুনবউ, তুমি ওদের থেকে দূরে দূরে থাক তো, বাইরের লোকেদের সঙ্গে রোজ মেলামেশা করছ, এ-সব সবাই ঠিক ভালচোখে নিতে পারছে না। পরদা তো আমিই ভেঙেছি, বাইরের পুরুষদের সঙ্গেও যথেষ্ট মিশি। কিন্তু বাড়ির মহিলাদের সঙ্গেও মিলেমিশে থাকি।
কাদম্বরী বলেন, আমি মিশি না এটা ঠিক কথা না মেজদি। ওরাই বরং আমাকে দূরে রাখে, কেন সেটাই বুঝি না আমি। সেজন্য নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি তেতলার ঘরে, সেখানেই নিজের জগৎ রচনা করেছি।
বোঠান তুমি একটু ষষ্ঠী ঠাকরুনের পুজো দাও না, মানদা দাসী বলল, এত বয়সে ছেলেপুলে হয়নি, দোষ কেটে যাবে। নিজের কোলে একটা এলে রূপা রূপা করে পাগলামিও সারবে।
কাদম্বরী ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলেন। তার ভেতরের কষ্টটাকে হঠাৎ এরা সবাই মিলে যেন উলঙ্গ করে দিয়েছে। সন্তান না হলে কি নারীজন্মের কোনও দাম নেই? শুধু মা হতে পারছেন না বলে বাড়ির মেয়েমহলে সবাই তাঁকে পর করে দেবে?
তাকে কাঁদতে দেখে স্বর্ণর খারাপ লাগে, এগিয়ে এসে পিঠে হাত দিয়ে বলেন, তুমি তো অনেক সৌভাগ্য পেয়েছ, না হয় সন্তান হয়নি, কাঁদছ কেন?
নীপময়ী বললেন, হ্যাঁ, আমাদের তো কখনও স্বামীর সঙ্গে ঘোড়ায় চেপে ময়দানে হাওয়া খাবার সৌভাগ্য হয়নি, আর ভক্ত পরিবৃত হয়ে গান-কবিতা শোনাও হয়নি। কাঁদতে হয়তো আমরা কাঁদব, তুমি কেন?
বিরক্ত হয়ে স্বর্ণ বললেন, আঃ সেজোবউঠান, শুধুমুধু নতুনবউঠানকে ঠেস দিচ্ছ কেন? তুমি যা করনি অন্য কেউ সেটা করতে পারবে না তা তো হয় না। সেজদাদা যখন তোমাকে ওস্তাদের কাছে গানের তালিম দেওয়ালেন, তখনও অনেকে ভুরু কুঁচকেছিল, তাতে কি তুমি থেমে গেছ? তোমার মেয়েদের যে অন্যদের সঙ্গে মিশতে দাও না, আলাদা করে গান শেখাচ্ছ, পড়াচ্ছ, তাতে কি আমরা আপত্তি করছি? বাবামশায় আমাদের সবাইকে নিজের মতো করে জীবন গড়ে নিতে দিয়েছেন, তাতে তুমি আমি কেন আপত্তি জানাব?
শরৎকুমারীও অশ্রুময়ী কাদম্বরীকে জড়িয়ে ধরে বললেন, সত্যি বাপু, নতুনদাদার আদরের বউটাকে কাদাচ্ছ কেন তোমরা?
জ্ঞানদার অবশ্য এই কান্না ন্যাকামি মনে হয়, কাদম্বরী কেঁদেই বাজিমাত করবে ভাবছে। কিন্তু তিনি তা মুখে বলেন না। বরং বললেন, নতুনবউ, তুমি নিজের মতোই থাকো কিন্তু ওই রূপাটাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি কোরো না, তা হলেই কেউ কিছু বলবে না তোমাকে।
কাদম্বরী কান্না থামিয়ে হঠাৎ ফুঁসে ওঠেন, আমার যা হয় তোক মেজদি, কিন্তু প্রাণ থাকতে আমি ওই অসহায় নিরপরাধ মেয়েটাকে তোমাদের ক্রোধানলে বলি হতে দেব না।
এই বিদ্রোহে যেন আগুনে ঘি পড়ে। জ্ঞানদা, নীপময়ী, সৌদামিনীর মুখ রাগে গনগনে। আঁচলের চাবির গোছা খুলে মেঝেতে ছুঁড়ে দিয়ে সৌদামিনী বললেন, ভাল, তবে আজ থেকে সংসারের ভার তুমিই নাও, আমাকে বেগার খাটার দায়িত্ব থেকে ভারমুক্ত করো নতুনবউ।
মেয়েদের কলহের ঝনঝনানির সঙ্গে তাল মিলিয়ে রুপোর কারুকাজ করা চাবিটি ঝমঝম শব্দে মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল।
কিছুক্ষণ নৈঃশব্দ্যের পর জ্ঞানদা বললেন, তা হলে বাবামশায়ের কাছে। চিঠি লেখা হোক, তিনিই ঠিক করুন রূপার ভবিষ্যৎ। তিনি রাখলে রাখবেন, না রাখলে যা বলবেন তাই হবে।
আর চাবিটা? সৌদামিনী জিজ্ঞেস করেন, সংসারের হাল কে ধরবে?
সংকটকালে জ্ঞানদাই সিদ্ধান্ত নেন, চাবিটা মেঝে থেকে কুড়িয়ে আবার সৌদামিনীর আঁচলে বেঁধে দিয়ে বলেন, ছোট ছোট বিষয়ে মাথা গরম করতে নেই বড়ঠাকুরঝি। তোমার এই আঁচলেই চাবিটা ভাল মানায়।
কাদম্বরীর মনে হয় চারদিকে সবাই তার বিরুদ্ধে, তাঁকে নিয়েই এত অশান্তি। তিনি তো কিছুই চাননি, শুধু নিরপরাধকে বাঁচাতে চেয়েছেন। অশ্রু চেপে একা একাই তেতলার নির্জন কোণের দিকে পা বাড়ান তিনি।
স্বর্ণ তার আড়াই বছরের ফুটফুটে মেয়ে ঊর্মিলাকে কোলে করে দৌড়ে আসেন তার দিকে, কাদম্বরীর কোলে মেয়েটাকে তুলে দিয়ে বলেন, নতুনবউঠান, আজ থেকে ঊর্মিলা তোমার মেয়ে, তোমার কাছেই থাকবে।
