সম্প্রতি মহাকবি বিহারীলালও সেই দলে যোগ দিয়েছেন মনে হচ্ছে। দুষ্টু রবি ফোড়ন কেটে বললেন।
স্বর্ণ এবার বলেন, দাঁড়ান অক্ষয়বাবু, লাহোর থেকে আপনার শরৎকুমারী আসুন না, তখন লাহোরিণীর সামনে আপনার সব জারিজুরি বেরিয়ে যাবে।
জ্ঞানদা ভাবেন, কী আশ্চর্য, জ্যোতি কী করে বিগলিত মুখে বউয়ের গুণগান শুনছে? তিনি জানতে চান, কী নতুন, তোমার বউ যে সব তরুণ কবিদের হৃদয়হরণ করছে, তোমার বুকে কোনও জ্বালা ধরছে না?
জ্যোতি জবাব দেওয়ার আগেই কাদম্বরী বলেন, আর উনি যে নাটকের রিহার্সালে গিয়ে কত অভিনেত্রীর হৃদয় হরণ করছেন, মেজদি কি তার খবর রাখ? এক-একদিন তো বাড়ি আসতেই সময় পান না।
এ-কথা সত্যি যে আজকাল মাঝে মাঝে রিহার্সালে গিয়ে আটকে পড়েন জ্যোতি। আর এ-কথাও সত্যি, যে অভিনেত্রীর জন্য সব বাবুরা পাগল সেই স্বয়ং নটী বিনোদিনীই জ্যোতি ঠাকুরের রূপগুণে মুগ্ধ। কিন্তু আট বছরের পুরনো স্ত্রীর প্রতি জ্যোতির টান এখনও এতটুকু কমেনি।
কাদম্বরীর গলায় চাপা অভিমান ঠিকই টের পান জ্যোতি, বলেন, যখন বাইরে যাই আমার হৃদয়টা তো তোমার সিন্দুকেই জমা রেখে যাই বউ, তবু তোমার মনে সন্দেহ?
কী জানি, আমি তো তাদের মতো ছলাকলা পারি না! কাদম্বরী নিচু গলায় বলেন। তার মতো সুন্দরীও নই।
জ্ঞানদা তাঁকে ধমক দেন, সে কী নতুনবউ, তুমি এমন করে ঘরে আটকে দিতে চাও নতুনকে? ওর কত নামযশ, কত ব্যস্ততা। না হয় দু-চারজন নটী মুগ্ধ হল, তাতেই বা কী? মন ছোট কোরো না। তোমারও তো রূপমুগ্ধ কম দেখছি না।
জ্ঞানদার গলায় অসন্তোষ চাপা থাকে না। ঘরের মধ্যে আবার যেন একটা ঠান্ডা লড়াই শুরু হয়ে গেছে দুই রূপসি মেধাবিনীর। জ্ঞানদার গায়ে লেপটে থাকা মিহি তঁতের হলুদ চান্দেরিতে ঝড়ের পূর্বাভাস। আর কাদম্বরীর খোলা চুল যেন কালবৈশাখীর বিদ্যুৎ।
জ্যোতি বোঝেন মেজোবউঠান এখনও কাদম্বরীর ওপর অপ্রসন্ন। তাকে ঘিরে এত প্রশংসা যেন ভালচোখে দেখছেন না। কী যে করেন তিনি, এই দুই নারীই তাঁর অতি প্রিয়। কিন্তু প্রথমদিন থেকেই যেন দুজন দুজনকে বিষনজরে দেখেছেন। পরিস্থিতি সামলাতে জ্যোতি বলেন, মেজোবউঠান, আমি তো এখনও মুগ্ধ তোমাকে দেখে। আজীবনের মুগ্ধহরিণ। ইনি হেকেটি হলে তুমি বর্জিনী।
তা, বর্জিনী-বউঠান বুঝি শকুন্তলার মতো হরিণ শিশুকে গুণ করেছেন। জ্যোতিকে কটাক্ষ করে অমনি কাদম্বরী বলে ওঠেন।
স্বর্ণ অধীর বোধ করেন এতক্ষণ এ-সব আলোচনায়, তোমরা কি শুধু এ-সব রসের কথা বলবে না ভারতীর লেখাপত্র কিছু পড়ে শোনাবে? দাও নতুন কী লেখা এসেছে দেখি।
রবি ফাইল থেকে একটি কবিতা এগিয়ে দিয়ে বলেন, দেখো নদিদি, অক্রুর দত্তের বাড়ির এক মহিলার রচনা, খারাপ নয়, পড়ে দেখো।
স্বর্ণকুমারী কাগজটি হাতে নিয়ে দেখলেন কবিতার ওপরে মুক্তোর মতো হাতের লেখায় কবির নাম, গিরীন্দ্রমোহিনী দাসী। স্বর্ণ পড়তে থাকেন।
তখনই এক দাসী ছুটতে ছুটতে ঘরে ঢুকে কাদম্বরীকে আড়ালে ডেকে নিয়ে কী সব ফিসফিস করে। কাদম্বরীও ছুটে বেরিয়ে যান তার সঙ্গে। কী হল খোঁজ নিতে পেছনে জ্ঞানদাও গেলেন। নীচের মহলে তখন হইচই লেগে গেছে, রূপকুমারীকে পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ বলছে সে মালিনীর সঙ্গে গেছে আবার এক দারোয়ান নাকি তাকে ঘোড়ার গাড়িতে চেপে এক সাহেবের সঙ্গে চলে যেতে দেখেছে।
একটি বালিকাদাসী সৌদামিনীর গায়ে অলিভ তেল মালিশ করে দিচ্ছে, আর তিনি তাকিয়া ঠেস দিয়ে চৌকিতে আধশোয়া হয়ে আরাম নিতে নিতে রাগে টঙ হয়ে কাদম্বরীকে বলছেন, আর নয়, এবার তোমার পুষ্যিকে তাড়াও। ফের এলে আর ঘরে ঢুকতে দেব না। এতদিন অনেক সহ্য করেছি, আর না।
সামনে দাঁড়ানো কাদম্বরী মুখ গোঁজ করে বললেন, মা যাকে এত আদর করে পুষ্যি নিয়েছিলেন, তাকে তাড়িয়ে দিলে যদি তোমার প্রাণে সুখ হয়, আমি আর কী বলব বড়ঠাকুরঝি।
জ্ঞানদা নেমে এসে পরিস্থিতি দেখে সৌদামিনীর পক্ষ নেন, সত্যি নতুনবউ, আর একে ঘরে রাখা যায় না, বাড়ির মেয়েরা ভুল শিক্ষা পাবে। মা না হয় স্নেহের বশে আদর করে কাছে রেখেছিলেন, সে যদি এখন বেয়াড়া হয়ে যায়, নষ্ট হয়ে যায়, তাকে আর ঘরে রাখা যায় না।
কাদম্বরী মানতে চান না, ভুল মনে হলে শেখানো যায়, তোমরা কে কতটা শেখানোর চেষ্টা করেছ বলো তো? আমি জানি ওর মনটা সরল। বিধিনিষেধের গণ্ডি পেরিয়ে মজা দেখতে গিয়ে অনেক ভুল করে ফেলে কিন্তু অন্যায় জেনে করে না। তোমরা এত নিষ্ঠুরভাবে বিচার করলে মা স্বর্গ থেকেও কষ্ট পাবেন।
মায়ের নাম করে তুমি কেন এই বেয়াড়াপনাকে প্রশ্রয় দিচ্ছ নতুনবউ? জ্ঞানদা ধমকান, আমাদের বাড়িতে কোনও মেয়ে কি কখনও এরকম কাজ করতে সাহস করত? নিজের পেটের মেয়ে হলে তুমি তার এমন বেয়াড়াপনার প্রশ্রয় দিতে?
কাদম্বরীর চোখ জ্বালা করে, মেজোবউঠান তাকে অযথা আঘাত করতে চাইছেন কিন্তু তিনি ঠোঁট চেপে চুপ করে থাকেন।
সৌদামিনীও কাদম্বরীর ওপর রাগ করেন, আমাকে সংসারটা চালাতে হয় নতুনবউ, তুমি ওকে আগলে রেখে অশান্তি জিইয়ে রাখছ। একে তোমার চালচলন নিয়ে বাঁকা কথা শুনতে হয় আমাকে, তার ওপর ওই অবাধ্য মেয়েটাকে পুষছ।
আমার চালচলনে আবার কী দোষ দেখলে বড়ঠাকুরঝি? কাদম্বরী অভিমানী স্বরে জানতে চান।
