ইতিমধ্যে দাসীরা পাথরের থালায় থালায় জলখাবারের ফল সাজিয়ে এনেছে। নীপময়ী চুপচাপ স্বর্ণর কথা শুনছিলেন, থালা থেকে দু-একটি আঙুর মুখে দিয়ে এবার বললেন, রবিকে নিয়ে অত বাড়াবাড়ি বাপু আমার ভাল্লাগে না, আগে তো দেওর বউঠানের এত মাখামাখি দেখিনি, সে তোমরাই চালু করেছ মেজদি। তুমি যেমন জ্যোতিকে একেবারে মাথায় তুলেছিলে, এখন নতুনবউ রবিকে তুলছে। দেওর-বউঠানের ভাব ভাল, অতিভাব চোখে লাগে।
তাতে আবার দোষের কী দেখলে সেজো? বিরক্ত হন জ্ঞানদা, পরিবারের মধ্যে এমন সহজ মেলামেশায় মনের বিকাশ হয়। কাব্যসাহিত্যের আদানপ্রদানে মন বড় হয়। তুমি যে ঘরে বসে এত ভাল গান শিখলে, বাইরের মানুষকে শোনাও না কেন?
নীপময়ীও বিরক্ত, তা মেজদি, তোমার গায়ে লাগছে কেন? আমার তো ঘরেই ভাল লাগে। গান শিখেছি নিজের জন্য, বাইরের লোক ডেকে শোনানোর জন্য তো নয়। পরদা উঠে গেলেও একটা আব্রু থাকা ভাল, তেতলার ছাদে আসর জাঁকিয়ে একগাদা পরপুরুষের সামনে মক্ষীরানি হয়ে বসে থাকা আমার পোষাবে না আর তোমার মতো পার্টিতে গিয়ে সাহেবমেমদের সঙ্গে বলডান্সও করতে পারব না।
বউয়েরা নিজেরাই নিজেদের ঠেস দিচ্ছে। সৌদামিনী কথা ঘোরানোর জন্য দাসীদের হুকুম দেন, যা তো রূপাকে খুঁজে আন, ধরে আন যেখান থেকে পারিস। দেখি আজ তার কতবড় বুকের পাটা।
মেয়েমহলের তিক্ততায় আর মন বসে না স্বর্ণর, ফলাহার শেষ হলে তিনি জ্ঞানদাকে টেনে নিয়ে যেতে চান তেতলার দিকে, ভারতীর আসরে। জ্যোতির ঘরেই আপাতত ভারতীর দপ্তর। সেখানে যথারীতি রবি, জ্যোতি, অক্ষয় ও কাদম্বরী মহা উৎসাহে সম্পাদকীয় কাজকর্ম করছেন। লেখা জমা করার জন্য একটি হলুদ টিনের বাক্স কেনা হয়েছে ঠাকুরবাড়ির তহবিল থেকে। সেটা থাকে কাদম্বরীর জিম্মায়।
কফি ও বড়া সহযোগে সেখানে তখন মহা কর্মযজ্ঞ চলছে। রবি ও অক্ষয় লেখা পড়ে বাছাই করছেন, সাজাচ্ছেন। কাদম্বরী মহা উৎসাহে বাছাই করা লেখা সাজিয়ে রাখছেন হলুদ টিনের বাক্সে। বাড়ির অন্য মেয়েদের থেকে তিনি যেন আলাদা, কাজের মধ্যে থাকলেও মনে হয় তিনি যেন দুটো ডানায় উড়ে বেড়াচ্ছেন মাটি থেকে ওপরে।
জ্যোতি হিসেবপত্র নিয়ে ব্যস্ত। ভারতীর খরচ জোগাতে দ্বিজেন ও জ্যোতি দুজনেই পঞ্চাশ টাকা করে জমা করেছেন। অল্পস্বল্প গ্রাহকচাঁদাও উঠছে। দপ্তরে বেশ কিছু গ্রাহক আবেদন জমা পড়েছে, তা নিয়ে সকলের হইচই। প্রথম সংখ্যার আগে গ্রাহক সংগ্রহের জন্য হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপন দেওয়ার আইডিয়াটা কাজে লেগে গেছে। বিজ্ঞাপনে লেখা হয়েছিল,
‘আগামী শ্রাবণ মাস হইতে ভারতী নামে সাহিত্য-বিজ্ঞান-দর্শন প্রভৃতি নানা বিষয়িণী এক খানি মাসিক সমালোচনী পত্রিকা প্রকাশিত হইবে। এখনকার সুপ্রসিদ্ধ লেখকের মধ্যে অনেকে এই পত্রিকার সাহায্য করিবেন। ইহার কলেবর রয়েল ৮ পেজি ৫ ফৰ্ম্মা। মূল্য বার্ষিক ৩ তিন টাকা। বিদেশে বার্ষিক […] ছয় আনা ডাকমাসুল লাগিবে। ইহা প্রতি মাসের ১৫ই প্রকাশ হইবে। যাঁহারা ইহার গ্রাহকশ্রেণীভুক্ত হইতে চাহেন তাঁহারা যোড়াসাঁকো দ্বারকানাথ ঠাকুরের লেন ৬ নং বাটীতে শ্রীযুক্ত প্রসন্নকুমার বিশ্বাসের নামে পত্র লিখিবেন।
—শ্রীদ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। সম্পাদক।‘
কাগজ বেরলেই দুজন বিলি সরকার হাওড়া ও কলকাতায় লেখক, গ্রাহক ও বিশিষ্টদের কাছে পৌঁছে দেন। মফস্সলে ডাক মারফত ৮৪ কপি পাঠানো হল প্রথমদিনেই।
বাড়ির মধ্যে থেকেই বেশিরভাগ লেখা সংগ্রহ হয়ে যায়। প্রধান লেখক রবি, জ্যোতি ও অক্ষয়। প্রথম সংখ্যায় রবির কবিতা ও গল্প একসঙ্গেই প্রকাশিত হল। অক্ষয় কবিতা ছাড়াও সরস সাহিত্য আলোচনায় হাত পাকাচ্ছেন। দ্বিজেন মাঝে মাঝেই ভাবগম্ভীর প্রবন্ধ লেখেন, আবার গঞ্জিকা নামে কৌতুক বিভাগেরও তিনি প্রধান রচয়িতা।
স্বর্ণ ও জ্ঞানদা জ্যোতিদের ঘরে এসে পৌঁছলে আসর জমে উঠল। রবি স্বর্ণকে বললেন, দেখোনদিদি, কত মেয়েরাও কবিতা পাঠিয়েছেন। অবশ্য মেয়েরা একটু চোদ্দোমাত্রা মিলিয়ে লিখলেই সবাই ধন্য ধন্য করছে, আর ছেলেদের বেলায় যত সূক্ষ্মবিচার।
স্বর্ণ তর্ক তোলেন, তা কেন বলছিস রবি, মেয়েদের লেখাও যথেষ্ট চুলচেরা বিচার করা হয়। এত যে মেয়েদের কবিতা এসেছে, কোনওটাই তোর ভাল লাগেনি?
রবি মোটেই মেয়েদের লেখার গুণ বিচার করতে চায় না, মেয়েদের নিয়ে কাব্য লিখতে চায়, কাদম্বরী হাসিমুখে ঠাট্টা করেন। মেয়েরা যেন শুধু কবির প্রেরণা হয়ে থাকবে, কবিতা লিখবে না।
রবিও হেসেই জবাব দেন, তা সত্যি নতুনবউঠান, তুমি নিজেই তো এই অধম কবির ভগ্নহৃদয়ের মূর্তিমতী প্রেরণা। পাতলা সুতির পাজামার ওপরে গেরুয়া ফতুয়া পরে আছেন রবি। যেন এক নগরবাউল উঠে দাঁড়িয়ে কাদম্বরীর দিকে নাচের ভঙ্গিতে হাত ঘুরিয়ে গেয়ে উঠলেন, তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা, হে বউঠান।
বাবা রে, জ্ঞানদা বললেন, কাদম্বরীর প্রশ্রয়ে রবির মুখে যে কাব্যের খই ফুটছে। রবি আর কিশোরটি নেই, রীতিমতো বড়দের ভাষায় কথা বলে।
অক্ষয় কৌতুকে যোগ দেন, আপনি জানেন না মেজোবউঠান, শুধু রবির নয়, উনি আমাদের ত্রিমুণ্ডী হেকেটি। জ্যোতি, রবি আর আমি তিনজনেই সারাক্ষণ ওঁর প্রেরণার জন্য কাড়াকাড়ি করছি।
