কি কহিব বঁধু হে বলিতে না জুয়ায়/ কাঁদিয়া কহিতে পোড়ামুখে হাসি পায়
অনামুখো মিনসেগুলোর কি বা বুকের পাটা/ দেবীপূজা বন্ধ করে কুলে দিয়ে বাটা…
অবিচারপুরী দেশে আর না রহিব । যে দেশে পাষণ্ড নাই সেই দেশে যাব।”
মালিনী বলে, দেখছ কী ঝাঝাল ভাষা, কী সাহসী! মিনসে-তন্ত্রের দাপটের কাছে মাথা না নুইয়ে কেমন পালটা কথা বলতে পেরেছে।
হেটো মেয়েরা পুরুষের অবিসংবাদিত কর্তাতির প্রতি যে উদ্ধত উপহাস ছুঁড়ে দিতে পেরেছে শিক্ষিত স্বাধীন মেয়েদের সে সাধ্য বা সাহস হয়নি। সেটার স্বীকৃতি দিতেও নারাজ তারা।
স্বর্ণ বলেন, সাহস আছে তো কী হল, কাব্যগুণ কম।
বেগুনি পাড় সবুজ ধনেখালির শাড়ি গাছকোমর করে পরা মালিনী যেন সেই প্রান্তিক রামী, যজ্ঞেশ্বরী, জগন্মোহিনীদের প্রতিনিধি, তাদের হয়ে অভিমান করে সে বলে, আজ আর ভাল লাগছে না গো দিদিরা বোঠানরা। আজ আমি চললাম।
সবার অলক্ষ্যে ঔদ্ধত্যের এই নতুন রসের খোঁজে উৎসুক হয়ে ওঠে ঠাকুরগৃহপালিত রূপকুমারী। সে ভেতরের আঙিনা ছেড়ে মালিনীর পিছুপিছু চলতে থাকে। মালিনীর অন্যরকম কথা, অন্যরকম কাপড়চোপড়, গয়নাগাটি, অন্য জগতের হাতছানি তাকে তীব্রভাবে আকর্ষণ করে। হেটো মেয়েদের এই স্বাধীন ভাষায় ও আচরণে ভদ্রমেয়েরা প্রভাবিত হয়ে পড়বে বলে বাবুদের যে আশঙ্কা ছিল, তা যেন সত্য হয়ে উঠছে রূপার আচরণে।
ইংরেজ এবং বাঙালি হিন্দুবাবুরা একজোট হয়ে ঝুমুরওলি, ঢপওলি, কীর্তনিয়াদের উচ্ছেদ করার জন্য উঠেপড়ে লাগলেন। সোমপ্রকাশ সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে, কৃষ্ণলীলা বর্ণনাবসরে রাস ও বস্তুহরণাদি বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া অশিক্ষিত যুবতীর চিত্ত অবিচলিত থাকা সম্ভাবিত নয়… যাহারা কুলকামিনীদিগকে কথকতার স্থলে গমণের অনুমতি দিয়া থাকেন, তাহাদিগের সতর্ক হওয়া উচিৎ।
যেন চিত্তবিচলিত হওয়ার অধিকার একমাত্র পুরুষের, তারা বাইজির ঘরে পড়ে থাকবে, আদিরসের গান শুনবে, কৃষ্ণলীলা রচনা করবে, কিন্তু মেয়েরা দেখলে, শুনলে, করলেই গেল গেল রব ওঠে। পুরুষ যেন জন্মেছে নারীর ওপর খবরদারি করতেই, আর নারীরা তাদের খেলার পুতুল!
রূপার গা জ্বলে যায় এ-সব দেখলে-শুনলে। কেন রে তোরা আমার ওপর খবরদারি করবি? আমি কম কীসে?
মালিনী হেসে বলে, ওই যে কথায় বলে না, দরবারে না মুখ পেয়ে ঘরে এসে মাগ ঠেঙায়। পুরুষগুলো সব ওরকম। ওই বাবুদের দেখ না, ইংরেজের কাছে মান পায় না, ঘরের বউয়ের ওপর কর্তারি ফলাচ্ছেন।
কথাটা নেহাত মিথ্যে নয়। বাঙালি হিন্দুবাবুরা ঘরের মেয়েদের অশিক্ষিত করে ঘরে আটকে রেখেছে তাই ইংরেজরা তাদের অনগ্রসর বলে উপহাস করে, আর বাবুদের তত রোখ চেপে যায়। নিজেদের উদারতা প্রমাণ করতেই এক-এক করে স্ত্রীশিক্ষার অনুমতি দিচ্ছিলেন তারা। তবে শিক্ষা দিলেও স্বাধীনতা দিতে প্রস্তুত নন বেশিরভাগ ভদ্রজন। পাছে নিম্নবর্গের স্বাধীন মহিলাদের দেখে ভদ্রমহিলারাও গৃহবিপ্লব করে বসেন, সেই দুশ্চিন্তায় তারা খুব কাতর। তাই তো অন্তঃপুরিকাদের সঙ্গে ঢপওয়ালি, খেউড়ওলিদের মেলামেশা বন্ধ করতে চান বাবুরা। জ্ঞানদা স্বর্ণর মতো উচ্চশিক্ষিত মেয়েরাও তাই এই লোকসংস্কৃতির ছোঁয়া বাঁচিয়ে চলতে শিখেছেন।
সৌদামিনী ব্যস্ত হয়ে ওঠেন, রূপা মেয়েটা কোথায় গেল রে? মালিনীর পিছু পিছু বেরিয়ে গেল নাকি? আমার হয়েছে জ্বালা, মা এই আপদটাকে ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে গেলেন। আঁচলটা গাছকোমর করে বেঁধে আবার বললেন, নে মানদা, অনেক তরকারি হয়েছে, এইবেলা পাকঘরে পাঠিয়ে দে।
তোমরা ওকে ঠিকমতো শাসন করতে পারছ না, জ্ঞানদা ঘোষণা করেন, এ-বাড়ির সংস্কৃতির কোনও ছাপই পড়ছে না ওর ওপর। পশ্চিমের মিহি তাঁতের শাড়ি পরা, খোঁপায় ফুল লাগানো জ্ঞানদার দিকে অপাঙ্গে তাকিয়ে সৌদামিনী মনে মনে বলেন, হু, ফুলবিবি আবার মাস্টারনিগিরি শুরু করলেন।
ঝুড়িতে স্থূপাকৃতি তরকারি গোছাতে গোছাতে মানদা বলে ওঠে, এক গাছের শেকড় কি অন্য গাছে লাগে গো বোঠান? য্যাতই শেখাও, ও শিখবে না।
সেটা কোনও কথায় মানদা, এবার স্বর্ণ বললেন, আমাদের দাদামশায়কেই তো বড়দাদামশায় দত্তক নিয়েছিলেন, তবে হ্যাঁ, দ্বারকানাথ এই বংশেরই অন্য শাখার সন্তান। রূপাকে শাসন করা দরকার।
সৌদামিনী মুখ ভার করে জানান, ওকে শাসন করা খুব শক্ত, বকাঝকা করলে আগে মায়ের আঁচলের তলায় লুকোত আর এখন নতুনবউয়ের ঘরে পালায়। ছেলেপিলে হয়নি বলে নতুনবউ ওকে আগলে রাখে।
নতুন বোঠানের সব ভাল, কিন্তু এ বয়সে একটাও বাচ্চা এলনি। মানদার মুখ থেকে কথা খসতেই শরৎকুমারী বললেন, সে যদি বলো, কাদম্বরীর জন্য আমার মায়াই হয়, অমন লক্ষ্মীমন্ত রূপ, মেয়েটার এত গুণ, কিন্তু বাঁজা।
জ্ঞানদা সুপুরি কাটা থামিয়ে বলেন, তোমার ওর জন্য মায়া হচ্ছে সেজদি, আমি ভাবছি নতুনঠাকুরপোর কথা, আট বছর হয়ে গেল বিয়ের, তার বোধহয় আর সন্তানের মুখ দেখা হল না। শুষ্ক জীবনটাকে সাহিত্য দিয়ে, ব্যাবসা দিয়ে ভরিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।
জ্ঞানদার খোঁপায় রুপোর কাঁটা লাগাচ্ছিলেন স্বর্ণকুমারী, তিনি কিন্তু অন্যসুরে বলেন, কী করবে বেচারি নতুনবউঠান, হয়তো বন্ধ্যানারী, অথচ ওর মনটা কত স্নেহময়। আমি আমার লেখার কাজ নিয়ে থাকি বলে বাচ্চাদের কোলে নেওয়ারও সময় পাই না কিন্তু নতুনবউঠান সবকাজের মধ্যেও আমার ছোট মেয়েটাকে নিয়ে কত আদর যত্ন করে, রূপাকে কত আগলে রাখে আর রবি তো বলতে গেলে ওর কাছেই মানুষ।
