বঁটিতে ঝিঙের শিরা ছাড়াতে গিয়ে নীপময়ীর আঙুলগুলো তখন তরকারির রসে মাখামাখি। আঁচলে আঙুল মুছে তিনি বললেন, আমার তো কোনও অসুবিধে হয় না ঢপ খেউড় শুনতে, ওর মধ্যেও মানুষের প্রাণের ভাষা আছে, লোকায়ত জীবনের রস আছে।
গায়ে সর-ময়দা মাখছিলেন শরৎকুমারী, তিনিও মুখ খোলেন, আমারও কিন্তু খারাপ লাগে না মেজোবউঠান, মালিনীর কাছে এ-সব গান শুনে গ্রামের সহজ জগৎটাকে দেখতে পাই।
মালিনীর গোমড়া মুখ অবশ্য সহজ হয় না, সে বলে, জানো মেজোবউঠান, তোমাদের এই গুমরের জন্য এখন শহরে ইতর-ভদ্র ভাগ হয়ে যাচ্ছে।
হোক না ভাগ, যা রুচিহীন তাকে তো জাতে তোলা যায় না, যতই তোমরা ওই সস্তা খেউড়ে তাল দাও, ও-সব গান বাড়ির পরিবেশ নষ্ট করছে। জ্ঞানদা বললেন, যার শুনতে হয় নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে শোনো না!
নীপময়ী স্পষ্টতই বিরক্ত হন জ্ঞানদার কথায়, সবসময় এত গুরুগিরি ফলানো ভাল লাগে না বাপু। টিপটপ বিবি সেজে বসে থাকো সারাক্ষণ আর গবর্নরের পার্টি টার্টিতে যাও বলে কি আমাদের সকলের মাথা কিনে নিয়েছ মেজদি? বাইরে মেলামেশা করি না বলে কি বাড়ির ভেতর আমাদের কোনও মতামত থাকবে না? এখানে তোমার যত দাবি আমারও ততটাই।
তোমার সঙ্গে আমার মতে মিলবে না সেজো, জ্ঞানদা বলেন, কিন্তু তাই বলে ইতর রসে আমার আপত্তি তো আমি গিলে ফেলতে পারি না। তার নাকে হিরের ফুল রাগে ঝলকিয়ে ওঠে।
বই-মালিনীর রুপোর পাঁয়জোরও রাগ করে ঝমকায়, সে বলে, দেখো মেজোবউঠান, তোমাদের এ-সব গানবাজনা, সাহিত্যচর্চা, পোশাক, স্ত্রীশিক্ষা ও স্বাধীনতার হাওয়াকে ওরা ঠাট্টা করছে আবার ওদের চিরকেলে ছড়া, গান, খেউড়, যাত্রাপালার ভাষাকে তোমরা এক ফুয়ে উড়িয়ে দিতে চাইছ। দেশের দুর্দিনে কোথায় ইংরেজের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে লড়বে তা না নিজেরা লড়ে মরছ। এটা কি ভাল হচ্ছে স্বর্ণদিদি?
কথাটা ঠিক। ইদানীং শহরে ভদ্র ও ইতর সংস্কৃতির শ্রেণির লড়াই বেশ জমে উঠেছে। গ্রাম থেকে আসা মানুষদের সঙ্গে শহরে ঢুকে পড়েছে গ্রাম্যরসের যাত্রা, কথকতা, পাঁচালি, ঢপ, খেউড়। শহরের ধনীঘরের বারবাড়িতে আর অন্তঃপুরে একসময় আমোদের খোঁজে এদের ডেকে আনা হত। কিন্তু এখন সেই ঝাঝালো বাংলাকে হঠিয়ে জায়গা নিচ্ছে সংস্কৃতঘেঁষা উচ্চবর্গের বাংলা। এই লড়াইয়ে কেউ কাউকে সইতে পারছে না। মালিনী স্বর্ণকে সাক্ষী মানতে চায় কিন্তু তিনি কোনও সাড়া দেন না।
বরং জ্ঞানদা আবার বলেন, ওই যে তোমাদের কাড়াদাস না কে একজন আমাদের নিয়ে ঠেস দিয়ে গান বেঁধেছে, কী অসভ্য সব কথা! ইতর লোকে তা নিয়ে ধেই ধেই নৃত্য করছে। এগুলোকে সংস্কৃতি বলছ মালিনী? ছিঃ!!
কোন গানটা বলছ মেজোবউঠান? মালিনী অবশ্য জানে উচ্চবর্গের মেয়েদের আচার আচরণকে শ্লেষ করে লেখা কড়াদাসের একটি গান খুব জনপ্রিয় হয়েছে সম্প্রতি। ওই যে ওই গানটা? জ্ঞানদাকে খেপাতেই যেন সে গেয়ে ওঠে,
হদ্দমজা কলিকালে কল্পে কলকেতায়।/ মাগীতে চড়লো গাড়ী ফেটিং জুড়ি।
হাতে ছড়ি হ্যাট মাথায়/ ষষ্ঠী মাকাল আর মানেনা,
সেঁজুতির ঘর আর মানেনা,/ আরসিতে মুখ আর দেখেনা।
এখন কেবল ফটোগ্রাফ চায়।/ এখন গাউন পরে ঘোড়ায় চড়ে,
গঙ্গাস্নান তো দেছে ছেড়ে,/ গোসলখানায় খানসামাতে টাউয়েল দিয়ে গা মোছায়।
খবরদার ওই গান গাইবে না মালিনী, স্বর্ণও রেগে ওঠেন, ছিঃ, খানসামা এসে গৃহিণীর গা মুছিয়ে দিচ্ছে, এ-সব কী কেচ্ছা? ইচ্ছে করে ভদ্রঘরের মেয়ে-বউদের টেনে নামাতে চাইছে। আর এত ভুলভাল ছন্দমিল আমার কানে সয় না।
সে তো বুঝতেই পারছ দিদি, মালিনী বলে, গ্রাম্য কবিয়াল শহুরে ভদ্রমেয়েদের আচার আচরণ তো নিজের চোখে দেখেননি, কিছুটা শুনেছেন, বাকিটা কল্পনা করেছেন। একটু নির্মল ঠাট্টা করতে চেয়েছেন বই তো নয়। পুরুষের রচনায় মেয়েদের মুখ চিরদিনই কল্পনার ঘোমটায় ঢাকা থাকে, এও সেরকম। খানসামা যে মুসলমান বাড়িতে রান্না করে তা না জেনেই বোধহয় কবি তাকে দিয়েছেন চানঘরে হিন্দু বা ব্রাহ্ম গৃহলক্ষ্মীর গা মোছানোর ভার।
তুমি আর ওদের হয়ে সালিশি কোরো না মালিনী, এ-সব শুনে জ্ঞানদা স্বাভাবিকভাবেই রেগে যান। বরং তোমার ঝাপিতে পত্রপত্রিকা কী আছে বের করো, নতুন কোনও মহিলা লেখিকার খোঁজ পেলে কি না বলো।
আজ তোমরা মনটা খারাপ করে দিলে গো মেজোবোঠান। যদি মেয়েদের লেখার কথাই বললো তো বলি, তোমাদের ঘরের শিক্ষিত মেয়েদের অনেক আগে থেকেই কিন্তু এ-সব হাটঘাটের মেয়েরা ছেলেদের সঙ্গে সমান তালে তাল মিলিয়ে ছড়া লিখছে, ঢপ-খেউড়-ঝুমুর গাইছে, কবির লড়াই করছে। একসময় হরু ঠাকুরের সঙ্গে যজ্ঞেশ্বরীর কবিগানের তরজা কত লোক টেনেছে। বছর কুড়ি আগে বিখ্যাত জগন্মোহিনী তো এই ঠাকুরবাড়িতেও ঢপকীর্তন গেয়ে গেছেন। তোমাদের মা দিদিমায়ের আমলে এ-সব জাতবিচার ছিল না।
স্বর্ণর একটু গায়ে লাগে, তিনি এখনকার মহিলা লেখকদের মধ্যে অগ্রণী হয়েও যেন মালিনীর কাছে ঠিকঠাক স্বীকৃতি পাচ্ছেন না, বললেন, মালিনী তুমি যে-সব মেয়েদের লেখার কথা বলছ, তাদের একটাও স্মৃতিধার্য পঙক্তি বলতে পার?
মালিনী তৎক্ষণাৎ জবাব দেয়, নিশ্চয়ই পারি, রামী ধোপানির কবিতা শোনো, তিনিই বোধহয় বাংলার পয়লা মেয়ে কবি,
