অক্ষয় দুঃখী মুখ করে বললেন, সেকী কাদম্বরী বউঠান, এখানে আসার প্রথম অ্যাট্রাকশন আপনি স্বয়ং আর দুনম্বরটা আপনার হাতের স্পেশাল মাটন চপ। সেটাই নেই!
সবাই হেসে উঠে ধোঁয়া-ওঠা শিক কাবাবের দিকে হাত বাড়ালেন। শুধু জ্ঞানদার মনে হয়, গৃহিণীপনাতেও কি তাকে হারিয়ে দিচ্ছে নতুনবউ? জোড়াসাঁকোর বাড়িতে তিনি যেন একটু অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাচ্ছেন, আর তার অনুপস্থিতির সুযোগে জাঁকিয়ে বসেছে কাদম্বরী।
কাদম্বরী বুঝতে পারেন মেজোজা প্রখর দৃষ্টিতে তাকে লক্ষ করছেন। মনে মনে মজা পান তিনি। এই মেজোবউ একদিন কী অবহেলাই না করেছেন তাঁকে। আজ তিনি দেখুন। আমার ছাদের বাগানে এত গুণীজন আমাকে ঘিরে কবিতা শোনায়। গান করে। আমাকে খুশি করতে পারলে আর কিছু চায় না। দেখো মেজদি যাকে কাঁচ বলে ফেলে দিতে চেয়েছিলে সেই এখন জ্যোতি ঠাকুরের কণ্ঠের হারে।
জ্ঞানদা আর কাদম্বরীর মধ্যে সবার অলক্ষে ঠান্ডা লড়াইয়ের বাতাস বইতে থাকে। জ্ঞানদা ভাবেন, দাঁড়াও নতুনবউ, দুটো কাব্য পড়তে শিখেছ বলে মুড়ি মিছরি এক করে পাল্লা দিতে চাইছ আমার সঙ্গে।
সাহিত্যের নির্মল বাতাসের পেছনে ঘনিয়ে ওঠে ঘনঘোর দুর্যোগ।
০৮. বটতলা বনাম ভারতী পত্রিকা
সেদিন বই-মালিনী ঠাকুরবাড়ির উঠোনে পা দিতেই কয়েকজন মেয়ে-বউ খিলান পেরিয়ে তাকে টেনে নিয়ে আসে মার্বেলের বারান্দায় মহিলা আসরের মাঝখানে। তার কাছে ঢপ, খেউড়, ঝুমুরগান শুনতে আবদার ধরে তারা। মালিনীর মুখ তখন পানের রসে টইটম্বুর, পিক ফেলে মুখ ধুয়ে এসে মাদুরের। ওপর জমিয়ে বসে সে একটি ঝুমুর গেয়ে ওঠে, গানটি চিরাচরিত বৈষ্ণব পদাবলির একটি লোকায়ত প্যারডি, ভবানী বা ভবরানির প্রচলিত ঝুমুরগান,
চল সই বাঁধা ঘাটে যাই অ-ঘাটের জলের মুখে ছাই
ঘোলাজল পড়লে পেটে গাটা অমনি গুলিয়ে ওঠে
পেট ফেঁপে আর ঢেকুর উঠে হেউ হেউ হেউ..
একসময় ভবানী বা ভবরানি নামে এক মহিলার ঝুমুরগানের দল খুব বিখ্যাত হয়েছিল কলকাতায়। তার গান এখনও শুনতে চায় আধুনিক শিক্ষার ছোঁয়া-না-লাগা অন্তঃপুরের মেয়েরা। সেসময় বিয়েতে ঝুমুরওলির নাচগান খুব চলত, এমনকী গ্রামের বিয়েতে গোরুর গাড়ির ওপরে ঝুমুর দলের নাচ হত।
গান শুনে নিস্তরঙ্গ অন্তঃপুরে একটু ঢেউ ওঠে। আরেকটা শোনাও, বলে মালিনীর গলা ধরে ঝুলে পড়ে রূপা।
ঝুমুরের পর মালিনী বলে, এবার তা হলে একটা খেউড় শোনো, রূপারানি। স্ত্রী-পুরুষের প্রেমালাপ। শোনো, স্ত্রী বললে, মালিনী সুর টেনে বলে: ওরে আমার কালভ্রমর, মধু লুটবি যদি আয়।
মেয়েরা ছেঁকে ধরে, তখন পুরুষ কী বললে?
মালিনী হাসিমুখে বলে, আর পুরুষ বললে, কী বললে বলো তো দিদিরা, বোঠানরা? এবার বেশ সুর করে বলে মালিনী, আর পুরুষ বলে, আমি থাকতে চাকের মধু পাঁচভ্রমরে খেয়ে যায়?
মেয়েরা কেউ কেউ হাসিতে লুটিয়ে পড়ে, বাড়িতে পুরনোপন্থীরা আছেন, কম শিক্ষিতরা আছেন, গরিব আশ্রিতারা আছে, দাসীরা আছে। তারা অনেকেই এধরনের ছড়ায়-খেউড়ে মজা পায়। সৌদামিনী, নীপময়ী, শরৎকুমারীরও মাঝে মাঝে এমন কৌতুকরস ভালই লাগে। রূপকুমারী তো কৌতুকে উচ্ছল হয়ে চকমেলানো বারান্দার উঁচু উঁচু থামের গায়ে গায়ে ছুটে বেড়ায়, মালিনীর গা ঘেঁসে ওর সঙ্গে গাইবারও চেষ্টা করে।
অথচ এ-সব চলতি গ্রাম্য ভাষায় কোনও পরিশীলনের ছোঁয়া নেই বলে জ্ঞানদার কানে তা রীতিমতো অশ্লীল শোনায়। মকরমুখী রুপোর জাতিতে সুপুরি কাটতে কাটতে তিনি বিরক্তিতে ভুরু কোঁচকালেন, কী শোনাও এ-সব মালিনী, না আছে কোনও ছন্দ না শ্রী।
শহরের বুদ্ধিজীবীরা যখন ভাষাসরস্বতাঁকে ইতর অশ্লীল গেঁইয়াপনার হাত থেকে উদ্ধার করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন, তখন এ-সব মেয়েলি খেউড় শুনে স্বর্ণও খুব রাগ করেন, নতুন বঙ্গদর্শনের পাতা থেকে মুখ তুলে তিনি বললেন, এ-সব কী হচ্ছে মালিনী, তুমি কত ভাল ভাল সাহিত্য জানো, কত অশিক্ষিতাকে অক্ষর শেখাও আর সেই তুমি এ-সব লঘু খেউড় শোনাচ্ছ?
শুধু লঘু না, জ্ঞানদা বলেন, রীতিমতো অশ্লীল সব গাঁইয়া ছড়া। এসব এখানে বোলো না মালিনী। রূপা ওখান থেকে উঠে আয়, খবরদার ও-সব গান মুখে আনবি না। আমাদের ঘরের মেয়েরা ও-সব গায় না।
মালিনী ক্ষুব্ধ হয়ে ঝাঁপি গুটোনোর উদ্যোগ করে বলে, তোমরা না চাইলে বলব না স্বর্ণদিদি, কিন্তু এ-সব ঢপ, ছড়া, খেউড় কীর্তন যারা চর্চা করে তোমরা যে তাদের মানুষ মনে কর না সেটা কি ঠিক? যে মাদুরটার ওপর বসেছ, সেটাও তো সেই গাঁয়ের জিনিস।
স্বর্ণ বলেন, আরে ও-সব গাঁইয়া অশুদ্ধ কালচার কি সাহিত্যের শুদ্ধ অঙ্গনে জায়গা পেতে পারে? অনেক পরিশীলনে এই নতুন বাংলাভাষা তৈরি করেছেন বিদ্যাসাগর মধুসূদনের মতো লেখকরা, না হলে তো বাংলা সাহিত্য হুতোম পাচার নকশা আর আলালের ঘরের দুলাল-এই থেমে থাকত।
নীপময়ী শুনছিলেন, এখন বললেন, গানের আবার জাত বেজাত কীসের স্বর্ণঠাকুরঝি? আমার তো সুরে গাইলে সব গানই ভাল লাগে। সেতারে যে সুর বাজে, একতারাতেও সেই সুর।
জ্ঞানদা বিস্মিত হয়ে বললেন, সে কী সেজো? তুমি নিজে এত ভাল উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম নিয়ে এ কথা বলতে পারলে? গানের জাত থাকবে না? সেতার আর একতারা কি এক হল?
