ষোলো বছরের রবির মাঝে মাঝে নতুনবউঠানের ওপর খুব অভিমান হয়, ষোলো বছর বয়স কি এতই ফেলনা! সংস্কৃতশাস্ত্রে ষোলো বছরের ছেলেকে প্রাপ্তবয়স্ক ধরা হয়। এখনও তো এ বয়সের কত যুবক বিয়ে করে বাচ্চার বাবা হয়ে যায়। এই তো সেদিন রবির ভাগনে সত্যর বিয়ে হয়ে গেল।
রবি বুঝতে পারেন না, বউঠান কেন শুধু তার সঙ্গেই এমন কৌতুক করেন! একে তো তিনি এখনও প্রতিশ্রুতি মতো পুরস্কার দেওয়ার নাম উচ্চারণ করছেন না, তার ওপর জ্যোতিদাদাকে তিনি যত মনোযোগ দেন, ইদানীং তার অর্ধেকও যেন রবিকে দিতে চাইছেন না। অথচ কেন যে তার একটু প্রশংসার জন্য রবির কবিমন কাঙাল হয়ে থাকে। নিজের ওপরেই রাগ হয় তার। জ্যোতি ও অক্ষয় এলে কবিতা পড়া শুরু হয়।
একসময় তেতলার ছাদের সান্ধ্যবাসর শেষ হয়ে সবাই ঘরে ফেরেন, জ্যোতি ও কাদম্বরী নিজেদের শোবার ঘরে চলে যান, তারপরেও অনেকক্ষণ একা একা ছাদে ঘুরে বেড়ান অস্থির রবি। কত কী আকাশ পাতাল ভাবনা মাথায় আসে। চাঁদনি রাতে ছাদের ওপর সারি সারি পামগাছের ছায়া যেন মায়াবী আঁকিবুকি। রাত একটা বাজে, দুটো। সামনের বড় রাস্তায় ধ্বনি ওঠে বল হরি, হরি বোল।
সেদিন এমন গভীর রাতে ছাদে পায়চারি করতে করতে জ্যোতিদের ঘরের জানলায় চোখ পড়তে চন্দ্রাহত হয়ে তাকিয়ে থাকলেন রবি। জানলার পরদা উড়ে গেছে হাওয়ায়, আর জ্যোৎস্না গিয়ে পড়েছে ঘরের নিভৃত একটি দৃশ্যে। চাঁদের আলোয় শঙ্খলাগা দুটি নারী ও পুরুষের অপরূপ দৃশ্য। রবির মাথা ঝিমঝিম করে।
সেই একঝলক দেখা দৃশ্যই কৈশোরের ঘোরলাগা সরলতার গণ্ডি পেরিয়ে হঠাৎ যেন প্রাপ্তবয়স্ক করে দিল তাকে। নিষিদ্ধ আপেল দেখে ফেলা রবির মাথায় নৃত্য করতে থাকে এক জ্যোস্নাময়ী। সারারাত ঘুমোতে পারেন না তিনি, শেষ রাতে ধুম জ্বর আসে৷
.
ইতিমধ্যে শিকারপুরে ডিস্ট্রিক্ট জাজের কাজ করার সময় সত্যেনের একটি ছেলে হয়েছে, নাম কবীন্দ্র। কলকাতায় স্বর্ণকুমারীর ছোটমেয়ে ঊর্মিলাও সদ্য জন্মেছে।
সত্যেন ও জ্ঞানদা ছেলেমেয়েদের নিয়ে কলকাতায় এলেন বিলেত যাওয়ার তোড়জোড় করতে। সত্যেনের ইচ্ছে রবিকে সঙ্গে নিয়ে যাবেন, লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়াবেন।
ওঁরা এসে পড়ায় তেতলার ছাদের সাহিত্যবাসরে নতুন জোয়ার এল। রোজ সন্ধ্যায় জ্যোতি, রবি, কাদম্বরীর সঙ্গে যোগ দেন সত্যেন ও জ্ঞানদা। স্বর্ণকুমারী তো আসেনই, এখন কাদম্বরীর প্রিয় কবি বিহারীলালও মাঝে মাঝে এসে কবিতা শোনান। ছাদের ওপর যেন চাঁদের হাট নেমে এসেছে। রবি অবশ্য কয়েকদিন নতুনবউঠানের থেকে একটু দূরে দূরে থাকছেন।
সেদিন সবাই জড়ো হলেন বিহারীলালের কবিতা শুনতে। এত নামী কবি, এত লালিত্যময় কবিতা, সত্যেন আর জ্ঞানদার উৎসাহ সবচেয়ে বেশি। তাঁরা প্রবাসে অনেকদিন উপোসি থাকার পর কবিকণ্ঠে কবিতা শোনার এমন সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু জ্ঞানদা লক্ষ করছেন কবি বিহারীলাল যেন নির্দিষ্ট একজনের উদ্দেশেই সব কবিতা পড়ছেন, পড়তে পড়তে বারে বারে শুধু কাদম্বরীর মনোযোগ চাইছেন। আর কাদম্বরীও মুগ্ধ বিস্ময়ে তার কবিতা শুনছেন।
আর এইসব বাইরের পুরুষদের সামনে নতুনবউ কত অনায়াস! জ্ঞানদা কিছুদিন ছিলেন না, তার মধ্যে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। অন্তঃপুরের পরদা উঠে গেছে। কাদম্বরী ঘোমটা খুলে ফেলে হয়ে উঠেছে সাহিত্যবাসরের মক্ষীরানি। এতে জ্ঞানদার খুশিই হওয়ার কথা কিন্তু তার মন খচখচ করছে। এসব পরিবর্তন তো তিনিই শুরু করেছিলেন, তখন কত বিরোধিতা, বাবামশায় আর শাশুড়ির গোমড়া মুখ, দাসী চাকরের কান্নাকাটি, রাস্তার লোকের টিটকিরি! কত সহ্য করেছেন জ্ঞানদা আর এখন সেই তৈরি করা বেদিতে বসে হাততালি কুড়োচ্ছে কিনা শ্যাম গাঙ্গুলির মেয়ে? কী এমন তালেবর হয়ে উঠল যে বিহারীলাল তার প্রশংসার কাঙাল, অক্ষয়চন্দ্র মুগ্ধচোখে তাকিয়ে থাকেন, রবিকে এমন গুণ করেছে যে সে নতুনবউঠান বলতে অজ্ঞান। আর জ্যোতি তো মাথা কেটে বউয়ের পায়ের তলায় রেখে দিয়েছে।
এই পরিবেশে তাঁর দম বন্ধ হয়ে আসে, এরা কি সব পাগল হয়ে গেল, জ্ঞানদা সামনে থাকতেও কাদম্বরীর জাদুতে বশীভূত! স্বর্ণকে জ্ঞানদা বললেন, চলো ঠাকুরঝি, তুমি আমি একটু নিভৃতে গল্প করি।
স্বর্ণ সাহিত্যের আড্ডা ছেড়ে যেতে চান না, একটু পরেই তিনি কবিতা শোনাবেন বিহারীলালকে, তিনি বলেন, দাঁড়াও না মেজোবউঠান, এখন কবিতা শুনি তারপর রাতে গল্পগুজব হবে।
বিহারীলাল এবার জ্ঞানদার দিকে ফেরেন, সে কী বউঠান, আমার কবিতা কি এতই খারাপ, আপনি চলে যেতে চাইছেন?
জ্ঞানদা হেসে বললেন, আপনার অনেক মুগ্ধ পাঠক-পাঠিকা আছেন এখানে, আমার না থাকলেও চলবে।
বোসো না মেজোবউঠান, জ্যোতি অনুরোধ করলেন এবার, তুমি চলে গেলে আসর জমবে না।
জ্ঞানদা গম্ভীর মুখে বলেন, তোমরা আসর জমাও, আমি জলখাবার পাঠানোর ব্যবস্থা করতে যাচ্ছি।
এবার কবিতার ঘোর ভেঙে কাদম্বরী বলে ওঠেন, ও নিয়ে তোমাকে ব্যস্ত হতে হবে না মেজদি, জলখাবার এসে পড়বে এক্ষুনি, সব বলা আছে।
বলতে বলতেই দুটি দাসী থরে থরে সাজানো রেকাবি নিয়ে আসে। উৎফুল্ল হয়ে অক্ষয়চন্দ্র বলে ওঠেন, ওই দেখা যায় থালাভরা ফিশ কাটলেট, মাটন চপ।
কাদম্বরী হেসে বলেন, না মশায়, আজ মাটন চপ নেই, আজ অন্য মেনু।
