কাদম্বরীও মুগ্ধ, সত্যি রবিঠাকুরপো, এমন দুঃসাহসী স্বামীর জন্য আমার গর্ব হয়। তাই তো আর কাউকে আমার মনে ধরে না।
আর কাউকে মনে ধরার দরকার কী ঠাকরুন, রবি তাকান কাদম্বরীর দিকে, তুমি তো সকলের মাথা ঘুরিয়ে দাও।
পরের দিন অবশ্য জ্যোতিই সবার মাথা ঘুরিয়ে দিলেন আরেকটি নতুন উদ্ভাবনে। সেদিন সকালেই তেতলার ঘরে জড়ো হয়েছেন অক্ষয় আর রবি। দুজনে পাল্লা দিয়ে কবিতা পড়ছেন আর কাদম্বরী লুচি তরকারি জোগান দিয়ে যাচ্ছেন।
জ্যোতির হঠাৎ মনে হল এই দুই কবি-বিহঙ্গের গান শুধু আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে, ওদের জন্য একটা স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে। কাব্যপাঠ থামিয়ে দিয়ে বললেন, আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে।
কাদম্বরী কৌতুক করে বলেন, তোমার মাথায় তো সবসময়েই আইডিয়া গিজগিজ করছে। এ আর নতুন কী?
না না, এ একেবারে নতুন, শুনলে চমকে উঠবে। রবি ও অক্ষয়ের অগাধ আস্থা তার ওপর, তারা উৎসুক হয়ে ওঠেন।
জ্যোতি বললেন, আইডিয়া একটা পত্রিকার। এই ঘর থেকেই বেরবে একটি চমকে দেওয়ার মতো সাহিত্য পত্রিকা। তোমাদের আর যাযাবরের মতো ওড়াওড়ি করতে হবে না, যা লিখবে সব ধরা থাকবে পত্রিকার পাতায়।
রবি উত্তেজিত হয়ে ওঠেন, ওঃ জ্যোতিদাদা, তোমার এই আইডিয়াটা একেবারে তুরুপের তাস। বাবামশায়কে রাজি করাতে পারবে তো?
আগে চল দোতলায় বড়দাদার ঘরে যাই। প্রবীণ বিহঙ্গরাজ মত দিলে বাবামশায় আপত্তি করবেন না।
চারজনে দল বেঁধে নেমে আসা হল দ্বিজেন্দ্রনাথের কাছে, তিনি কাব্যসাহিত্যের চেয়ে জ্ঞানচর্চায় বেশি ব্যস্ত থাকেন। কনিষ্ঠদের উৎসাহে তিনিও মদত জোগালেন, আইডিয়া তো খুব ভাল, কিন্তু জ্যোতি, নতুন পত্রিকার কী দরকার, আবার সবাই মিলে তত্ত্ববোধিনীকেই জাগিয়ে তুলি না কেন?
জ্যোতি দ্বিধা করেন, বড়দা, তত্ত্ববোধিনীর গায়ে বড্ড রাশভারী গন্ধ। সাহিত্যের পত্রিকা হবে বঙ্গদর্শনের মতো স্বাদু অথচ এক্সপেরিমেন্টাল। পাঠকের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে পারি এমন পত্রিকা চাই, যাতে পাঠকের রুচি উন্নত করা যায়।
ভাল পত্রিকা হলে মানুষ তো পড়বেনই, ও নিয়ে চিন্তা করিস না, দ্বিজেন আশ্বস্ত করতে চান।
কিন্তু অক্ষয় অন্য কথা বললেন, বড়দাদা, আপনি দেখছেন তো কতশত বাঙালি পাঠকের রুচি এখনও বটতলায় আটকে আছে।
জ্যোতি তাঁর কথা লুফে নিয়ে বলেন, সেই নিম্নরুচি পাঠকদের শিক্ষিত করার দায় নেব আমরা, সাহিত্যরুচি উন্নত না হলে জাতির প্রগতি হয় না। তত্ত্ববোধিনী সাধারণ লোকের কাছে পৌঁছতে পারে না, আমাদের সম্পূর্ণ নতুন করে শুরু করতে হবে।
দ্বিজেন জানতে চান, তা হলে কী নাম দেবে ভাবছ পত্রিকার?
তুমিই ঠিক করে দাও বড়দাদা, রবি এবার বললেন। দ্বিজেন বললেন, সুপ্রভাত কেমন নাম? সবাই একটু চুপ। জ্যোতির ঠিক পছন্দ হয় না, অবশেষে তিনি বলেন, এই নামটার মধ্যে একটু ঔদ্ধত্য আছে। মনে হবে আমরা দাবি করছি যে এতদিনে বাংলা সাহিত্যে সুপ্রভাত আনলাম আমরাই।
একটু ভেবে দ্বিজেন আরেকটা নাম বললেন, তা হলে ভারতী কেমন হবে?
জ্যোতির পছন্দ হল নামটা, বেশ একটা স্বদেশি গন্ধ আছে, আবার ভারতীর একটা অর্থ বাণী, আর-এক অর্থ বিদ্যা।
দ্বিজেন আবার বলেন, যে অর্থে ব্রিটেনের অধিষ্ঠাত্রী ব্রিটানিয়া, আথেন্সের এথেনিয়া, সেই অর্থেই ভারত-সরস্বতীর নাম ভারতী ধরা যায়।
সবার সম্মতিতে ভারতী নামটাই রইল। প্রথম সংখ্যা পাঁচশো কপি। ছাপার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে গেল, আর ভারতাঁকে কেন্দ্র করে ঠাকুরবাড়িতে শুরু হয়ে গেল সাহিত্যের মহাসম্মেলন। প্রতি রোববারে রবি আর জ্যোতি ভারতীর ফাইল নিয়ে চলে আসেন অক্ষয়চন্দ্রের বাড়িতে, সেখানে অক্ষয়ের স্ত্রী শরৎকুমারী লাহোর থেকে সদ্য এসেছেন। তিনিও মহা উৎসাহে জড়িয়ে পড়লেন। কোনও কোনও দিন আবার সবাই মিলে যাওয়া হত বিহারীলালের বাড়িতে। রোববার ছাড়া অন্য দিনগুলোর সন্ধেবেলায় প্রায়ই ভারতীর দপ্তর বসে স্বর্ণ-জানকীর রামবাগানের বাড়িতে। সেখানে কাদম্বরীর সঙ্গে প্রফুল্লময়ীও মাঝে মাঝে চলে আসতেন গান ও কবিতায় বিষণ্ণতা কাটানোর জন্য। স্বর্ণ কোনওদিন ডিনার না করিয়ে ছাড়েন না, ফলে আসর লম্বা হতে থাকে দীর্ঘ রাত্রির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে।
ভারতী পত্রিকায় অনুবাদ করবেন ভেবে তেতলার ছাদে বসে রবি একদিন কাদম্বরীকে ম্যাকবেথ পড়ে শোনাচ্ছিলেন। তিন ডাইনির বর্ণনা শুনে কাদম্বরী উত্তেজিত হয়ে বললেন, এই ডাইনিরা কত স্বাধীনা, নিজের ইচ্ছেয় বাঁচে, ইচ্ছেমতো পুরুষের মুন্ডু চিবিয়ে খায়।
রবি হেসে ফেললেন, বউঠান তুমি ডাইনিদের হিংসে করছ! তুমিই বা কম কীসে, সারাক্ষণ আমার মুন্ডু তো চিবোচ্ছোই, আর বেচারা অক্ষয়বাবুর তো আর মুন্ডুই নেই।
যাঃ, আমাকে ডাইনি বলছ রবি? ভাল হচ্ছে না কিন্তু, কাদম্বরী ঈষৎ অভিমানী হয়ে বললেন। অক্ষয়বাবুর ঘরে শরৎকুমারী আছেন, তাকে ওরকম বদনাম দিয়ো না রবি।
রবি বলেন, হে আমার মাথা চিবিয়ে খাওয়া দেবী, আজ থেকে তোমার নাম দিলেম হেকেটি ঠাকরুন। তুমিই ম্যাকবেথের হেকেটি ডাইনি, তুমিই ত্রিমুণ্ড গ্রিক দেবী হেকেটি। কোন মন্ত্রে আমাকে ভেড়া করে রেখেছ ঠাকরুন, তুমিই জানো।
যাও যাও, তোমাকে ভেড়া করে রাখতে আমার বয়েই গেছে, এখনও নাক টিপলে দুধ বেরোয়, আবার পাকা পাকা কথা!
