স্টেজে সত্যি আগুন জ্বালানো হত। মেয়েরা গান গাইতে গাইতে ঝুপ করে আগুনে ঝাঁপ দিচ্ছে আর পিচকিরি করে কেরোসিন ছিটিয়ে আগুন দাউ দাউ জ্বলে উঠছে। অভিনেত্রীদের গায়ে আঁচ লাগছে, চুল পুড়ে যাচ্ছে, কারও কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই, দেশপ্রেমের উত্তেজনায় তারাও শরিক।
এই নাটকে সরোজিনীর নামভূমিকায় বিনোদিনী সবাইকে মুগ্ধ করে দিচ্ছেন। নাট্যকার স্বয়ং মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকেন বিনোদিনীর দিকে। তাঁর হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, বুক ধুক ধুক করে।
রবি বউঠানকে কটাক্ষ হেনে বলেন, কী বোঠান, একেবারে হেলাফেলা করার মতো নয়, কী বলে?
মন্দ নয়! কাদম্বরী হেসে তার পিঠ চাপড়ে দিলেন। তোমার একটা পুরস্কার পাওনা হল।
.
কী পুরস্কার দেবেন বউঠান, রবি কৌতূহলে ছটফট করতে থাকেন কয়েকদিন ধরে। তাঁর ঘুর ঘুর করা দেখে মজা পান কাদম্বরী, কিন্তু রহস্য ভাঙেন না।
ইতিমধ্যে একবার জ্যোতি শিলাইদহে যাওয়ার সময় রবিকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন। সরোজিনী নাটকের গানটি লিখে রবি তাকে চমৎকৃত করেছেন, জ্যোতি ঠিক করলেন এখন থেকে রবিকে তার সব কাজের সঙ্গী করে নেবেন। কবিতা লেখাই তো শুধু কাজ নয়, জ্যোতি ঘোড়ায় চড়া আর পাখি শিকারেও রবিকে সমকক্ষের মর্যাদা দিচ্ছেন। কাদম্বরী জ্যোতিকে চিঠি লেখেন, রবিকেও। সেই চিঠির বড় বড় উত্তর লেখাও রবির একটি কাজ।
শিলাইদহ রবিকে বাধাবন্ধন হীন স্বাধীনতার স্বাদ এনে দিল, যেন প্রখর গ্রীষ্মের পর একপশলা বৃষ্টি। এখানে এসে জ্যোতি নিজেও যেন হৃদয় খোলা খেপামিতে মেতে ওঠেন। এই খেপামি কলকাতায় ফিরেও থামল না। তিনি মেতে উঠলেন সঞ্জীবনী সভা নিয়ে।
তখন কলকাতার যুবকমহলে ইতালির মাৎসিনির স্বাধীনতা যুদ্ধের কাহিনি প্রচার করে সাড়া ফেলেছেন সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে। স্বাধীনতার আন্দোলনে গুপ্তসমিতি তৈরি করে তিনি যে স্বাদেশিকতার আগুন জ্বালিয়েছেন, সে-সব শুনতে শুনতে অনুপ্রাণিত বাঙালি যুবকেরা বেশ কিছু গুপ্তসমিতি তৈরি করছিলেন, সেরকমই একটি সঞ্জীবনী সভা। উদ্দেশ্য লোকহিত এবং জাতীয়তাবাদের চর্চা।
জ্যোতি ও রবি তার সদস্য হলেন। গুপ্ত সমিতি, তাই সভা বসত গোপনে, ঠনঠনের একটি পোডড়াবাড়িতে। দীক্ষাগ্রহণের দিন সভার অধ্যক্ষ রাজনারায়ণ বসু মশায় এলেন লাল পট্টবস্ত্র পরে। আদি ব্রাহ্মসমাজ থেকে আনা লাল কাপড়ে জড়ানো একটি বেদ পুঁথি টেবিলে রাখা হল। বেদগান দিয়ে সভার শুরু। তারপর টেবিলের দুপাশে দুটি মড়ার খুলি রেখে তাদের চোখে মোমবাতি জ্বালিয়ে দিলেন কেউ। মড়ার মাথা মরা ভারতের প্রতীক, মোম জ্বালিয়ে মৃতদেহে প্রাণসঞ্চারের ও জ্ঞানচোখ উন্মোচনের শপথ নিলেন দুই ভাই।
সভ্যরা তাদের আয়ের এক দশমাংশ সভায় দেন। ঠিক হল যে স্বদেশি দেশলাই, স্বদেশি কাপড়ল ইত্যাদি উদ্যোগে টাকা দেওয়া হবে। প্রথম দেশলাই বেরোনোর পর সবাই উত্তেজিত। জ্যোতি সকালে উঠেই দেখলেন সমাচার চন্দ্রিকায় খবর বেরিয়েছে, একটি শুভ চিহ্ন।/আজ আমরা একটি নূতন দেশলায়ের বাক্স দেখিলাম। বাক্সটীর আকার বিলাতি ব্রায়ান্ট এবং মের সেফটিম্যাচের ছোট বাক্সের ন্যায়। পাতলা দেবদারু কাঠেই সুন্দর রূপে বাক্সটী নির্মিত হইয়াছে। দুই ধারে দেশলাই ঘষিবার মসলা মাখান। কাঠিগুলি দেবদারু কাঠের না হইয়া বাসের করা হইয়াছে, ঘর্ষণ মাত্রেই উত্তম জ্বলিয়া উঠিল, কিন্তু একটু ঠাণ্ডা লাগিলে বাসের কাষ্ঠ যেমন সহজেই শীতল হইয়া জ্বলনশক্তির হ্রাস হয় এগুলিকেও সে দোষ হইতে মুক্ত দেখিলাম না।
তিনি উত্তেজিত হয়ে রবিকে ডেকে পাঠান, দেখ রবি সমাচার চন্দ্রিকা কত প্রশংসা করেছে স্বদেশি দেশলাইয়ের।
রবি কাচুমাচু হয়ে বললেন, কিন্তু বড় খরচ। এ দেশলাই চালানো শক্ত হবে। এরকম এক বাক্স দেশলাই তৈরির খরচে একটি পল্লির সারা বছরের জ্বালানি হয়ে যায়।
জ্যোতি আশঙ্কা উড়িয়ে বললেন, দিশি দেশলাই করা গেল তাই না কত, টাকাপয়সা যা লাগে সবাই মিলে তুলে দেওয়া যাবে। বাজারে নামুক তো আগে।
কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে রবির আশঙ্কাই সত্যি হল। স্বদেশি দেশলাই তৈরি করতে দেনার দায়ে গাঁ উজাড়। অনেক টাকা খরচ করে যে কাপড়ের কল বসানো হল, সেটাও কয়েকটি গামছা উৎপন্ন করে ঋণের ভারে থেমে গেল। কিন্তু স্বদেশি উৎপাদনকে উৎসাহ দেওয়া থামল না। পাথুরিয়াঘাটার বাবু আনন্দচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মুদ্রাযন্ত্র নির্মাণ করলেন, বাবু গিরীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। সুতাকল বসালেন। বাঙালির বিজ্ঞানচর্চার জন্য সত্যপ্রসাদকে কুপার্স হিল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পাঠানো হল। রবিকে উৎসাহিত করা হল বিলেতে গিয়ে সূক্ষ্মশিল্প শিখতে।
জ্যোতির মাথায় এল ভারতীয়দের সর্বজনীন পোশাকের ডিজাইন করতে হবে। অনেক ভাবনাচিন্তার পর একদিন তিনি পায়জামার ওপর একখণ্ড কাপড় দিয়ে মালকেঁচা করে পরলেন, মাথায় লাগালেন পাগড়ি ও টুপির মাঝামাঝি একটা বস্তু। প্রখর দিনের আলোয় সেই অদ্ভুত পোশাক পরে দেশোদ্ধারে চললেন জ্যোতি ঠাকুর। এই বিচিত্র দৃশ্য দেখতে রাস্তায় নোক জমে গেল।
মুগ্ধ ভাই রবি সেদিকে তাকিয়ে নতুনবউঠানকে বললেন, ধন্য তোমার স্বামী। দেশের জন্য অকাতরে প্রাণ দিতে পারে এমন বীরপুরুষ অনেক থাকতে পারে, কিন্তু দেশের মঙ্গলের জন্য সর্বজনীন পোশাক পরে গাড়ি করে কলকাতার রাস্তা দিয়ে যেতে পারার মতো লোক নিশ্চয় বিরল।
