বাড়ির মেয়েরা কেউ কেউ অবশ্য সেরেস্তার সামান্য কমর্চারীর মেয়ে বলে এখনও তাঁকে অবজ্ঞা করেন কিন্তু কাদম্বরী আর গ্রাহ্য করেন না। প্রেমিক স্বামী ও লক্ষ্মণ দেওর নিয়েই তার দিন বেশ ভরপুর হয়ে ওঠে।
মাঝে মাঝে শিলাইদহের জমিদারি দেখতে চলে যান জ্যোতি, কখনও কখনও নিজের লেখা নাটকের রিহারসালে আটকে গিয়ে বাড়ি ফেরা হয় না, তখন কাদম্বরীর বড় একলা লাগে আর সেই বিরহিণী বউঠানের মনোরঞ্জনের আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকেন রবি।
.
পরদা উঠে গিয়ে আজকাল ছাদের আড্ডায় জ্যোতির সঙ্গে প্রায়ই চলে আসেন কবি অক্ষয় চৌধুরী। কিছুদিন আগেও ঠাকুরবাড়ির অন্দরে নারীপুরুষের এমন খোলামেলা আসরের কথা ভাবা যেত না। অক্ষয় আবার কাদম্বরীকে মুগ্ধ করার জন্য গাইয়ে হওয়ার চেষ্টাও করছেন, যদিও তার গলায় একফোঁটা সুর নেই। তিনি হাতের কাছে একটা মোটা বাঁধানো বই পেয়ে সেটাকেই তবলায় রূপান্তরিত করলেন। গান শুরু হতেই জ্যোতি আর কাদম্বরী চোখে চোখে হাসেন।
জ্যোতি বললেন, অক্ষয়, গান থাক না, আজ একটা কবিতা পড়ে শোনাও। কাদম্বরী কতদিন তোমার কবিতা শোনেনি।
অক্ষয় বিগলিত নয়নে কাদম্বরীর দিকে তাকিয়ে বলেন, সত্যি শুনবেন। বউঠান? আমি কদিন ধরে নতুন বর্ষা-কবিতাগুচ্ছ লিখেছি, আপনাকে না শোনালে সেই বর্ষাজলধারা ঠিক প্রাণ পাচ্ছে না।
নিজের লেখা ছাড়াও অক্ষয়চন্দ্র আইরিশ মেলোডি কাব্যগ্রন্থ থেকে উদাত্ত স্বরে আবৃত্তি করে মুগ্ধ করে দিতেন রবিকে। পড়ার বইয়ের শুকনো পাতায় যা পাওয়া যেত না, সেই নিত্যনতুন কাব্যরসের সন্ধান মিলত তার উৎসাহে। রবি এ-সব কবিতাগুলি বাংলায় অনুবাদ করে কখনও জ্যোতি কখনও অক্ষয়কে শোনাতে শুরু করলেন। এভাবেই ভরে উঠছিল তার মালতীপুঁথির পৃষ্ঠাগুলি। দাদাদের কাছে কিশোরকবি যতটা গুরুত্ব পাচ্ছিলেন কাদম্বরী অবশ্য সমবয়সি দেওরকে তা দিতে রাজি নন।
রবির সঙ্গে কাদম্বরীর একদিন তর্ক বেধে যায় পাখি পোষা নিয়ে। ধনীঘরের বউ-মেয়েরা আজকাল বারান্দায় খাঁচায় পাখি ঝুলিয়ে রাখেন। খাঁচার কোকিলের ডাক শুনলে রবির অসহ্য লাগে। কোথা থেকে একটা চিন দেশের শ্যামাপাখি এনে পুষতে শুরু করেছেন কাদম্বরী।
রবি ঝগড়া বাধিয়ে দিলেন তার সঙ্গে, খাঁচার পাখির কষ্টে তোমার মনখারাপ হয় না? ওকে ধরে রেখেছ কেন, ছেড়ে দাও।
কাদম্বরী জবাব না দিয়ে পাখিকে দানা দিতে থাকেন। রোজ সকালে এক পোকাওয়ালা আসে পাখির জন্য ফড়িং, পোকামাকড় জোগাতে। পোকাওয়ালার সঙ্গে কথায় ব্যস্ত হয়ে যান তিনি আর রবির রাগ বাড়তে থাকে।
রবি বললেন, উত্তর দিচ্ছ না কেন। জ্যোতিদাদা কিন্তু আমার সব প্রশ্নের জবাব দেন।
কীসের জবাব শুনি? সব কাজের কৈফিয়ত দিতে হবে নাকি তোমাকে? ঝাঁঝিয়ে ওঠেন কাদম্বরী। আমার অত সময় নেই, দেখছ না কাজ করছি?
রবি মনে মনে রেগে যান কিন্তু বউঠানের কাছে নতিস্বীকার করা চলবে না। তিনিও ঝঝিয়ে উত্তর দেন, কাজ না অকাজ? অসহায় প্রাণীগুলোকে খাঁচায় বেঁধে রেখে আবার কাজ দেখানো হচ্ছে?
পাখি পোষা খারাপ কাজ? দেখছ না কত আদর যত্ন করছি? কাদম্বরী একটু আপসের সুরে বললেন।
রবি ছাড়ার পাত্র নন, আজ তিনি হেস্তনেস্ত করেই ছাড়বেন। শুধু পাখি? তুমি যে কাঠবেড়ালিদুটোকে পুষ্যি নেবার নাম করে খাঁচায় পুরেছ, বনের প্রাণীকে বন্দি করা তোমার ভারী অন্যায়।
কাদম্বরী চোখ পাকিয়ে দেবরটিকে বললেন, তোমাকে আর গুরুমশায়গিরি করতে হবে না, আমার ন্যায় অন্যায় আমি বুঝব।
একে তো ঠিক জবাব বলা যায় না, বড় হওয়ার সুযোগে বউঠান তাঁর সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন। কিন্তু রবির মন মানে না, এটা যে অন্যায় সেটা বউঠান বুঝবেন না কেন? জ্যোতিদাদাকে বলেও কোনও লাভ হবে না, তিনি তো আবার হরিণ পুষেছেন। হয়তো তর্ক এড়াতে বউঠানের মতেই মত দেবেন।
রবি তখনকার মতো চুপ করে গেলেন। কিন্তু একাকে চুপি চুপি খাঁচা খুলে ছেড়ে দিলেন বনের প্রাণীদের। তারপর দেওর বউঠানের ঝগড়া থামাতে অবশ্য জ্যোতিকে আসরে নামতে হয়েছিল।
জ্যোতিরিন্দ্রের নতুন নাটক সরোজিনী বা চিতোর আক্রমণ প্রকাশিত হয়েই হইচই ফেলে দিয়েছে। নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে, প্রধান ভূমিকায় নটী বিনোদিনী। এই নাটকের একটি গান রবির লেখা। ভাইয়ের প্রতি অনুরাগবশত জ্যোতি তাকে গান লেখার দায়িত্ব দিয়েছেন, আর রবি এই অভাবিত সুযোগ পেয়ে নিজের সৃজনীশক্তি নিংড়ে গানটি রচনা করেছেন।
যদিও রবির গান লেখা নিয়ে কাদম্বরীর আপত্তি ছিল। তার মতে এই নাটকটি জ্যোতির সেরা রচনা। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি নাটকে নটী বিনোদিনীর কণ্ঠে যে গান গাওয়া হবে সেটা রবিকে লিখতে দিয়ে অবিবেচনার কাজ করছেন জ্যোতি। গানটা তার নিজেরই লেখা উচিত।
নাটক এবং নাটকের ওই বিশেষ গানটি কিন্তু দর্শকদের মাতিয়ে দিল। যে দৃশ্যে চারদিকে ধু ধু চিতা জ্বলছে, আর রাজপুত মেয়েরা কেউ লাল শাড়ি পরে, কেউ বা ফুলের গয়নায় সেজে গান গাইতে গাইতে চিতারোহণ করছেন, সেই গানটিই রবির লেখা,
জ্বল জ্বল চিতা দ্বিগুণ দ্বিগুণ।
পরাণ সঁপিবে বিধবা বালা।
জ্বলুক জ্বলুক চিতার আগুন
জুড়াবে এখনি প্রাণের জ্বালা ॥
দেখ রে যবন দেখ রে তোরা
যে জ্বালা হৃদয়ে জ্বালালি সবে।
সাক্ষী রহিলেন দেবতা তার
এর প্রতিফল ভুগতে হবে।
