উৎসবের শেষে খাওয়াদাওয়াটি অতি চমৎকার হলেও সবাই মনে একটা প্রশ্ন নিয়ে ফিরে গেলেন। রহস্যটা জানা হল না, কিন্তু জানতেই হবে মেয়েদুটি কে?
সভা যখন ভঙ্গ হল দেবেন্দ্রনাথ তখন অনেক দূরের এক পাহাড়চূড়ায় সূর্যাস্ত দেখছেন।
০৭. হেকেটি ঠাকরুন
১৮৭৬-এ ইংলন্ডের রানি ভিক্টোরিয়া, ভারতসম্রাজ্ঞী উপাধি নিয়ে সাড়ম্বরে সে-কথা ঘোষণা করলেন কলকাতায়। এদিকে ঠাকুরবাড়িতে সারদার মৃত্যুর পর বিরাট সংসারের ভার কাঁধে তুলে নিলেন তার বড় মেয়ে সৌদামিনী আর অন্যদিকে মাতৃহারা রবিকে খাইয়ে পড়িয়ে, কাছে টেনে নিলেন কাদম্বরী। নতুনবউঠানের এই আন্তরিক চেষ্টার মধ্য দিয়েই নারীর কোমলতার প্রথম স্বাদ পাচ্ছেন রবি।
মেজোবউঠান বোম্বাই থাকায় জ্যোতিও এখন স্ত্রীর প্রতি পুরোপুরি মনোযোগী ও নির্ভরশীল। দুই তেজি নারীর অনুপস্থিতিতে ঠাকুরবাড়ির অন্দরে নতুন তারকার মতো ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠছেন কাদম্বরী। তেতলার ছাদের ওপর তার ঘর ও বাগান হয়ে উঠল জ্যোতির গান ও কবিতার কর্মশিবির। আর রবি সেই ঘরে সর্বক্ষণের অতিথি। জ্যোতি আর কাদম্বরীর উৎসাহে এখন বাড়িতে অন্দরমহলের পরদা যেন উঠে গেছে। জীবনের প্রথম দশবছর বাড়ির রূপরসগন্ধ আনন্দ-বেদনার মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন রবি বুভুক্ষের মতো গৃহসুখ আকণ্ঠ পান করতে লাগলেন।
নতুনবউঠানের পুতুলের বিয়েতে প্রধান নিমন্ত্রিত রবি। কাদম্বরীর হাতে চিংড়িমাছের চচ্চড়ির সঙ্গে লঙ্কামাখা পান্তাভাতের আয়োজনই হয়ে ওঠে অসাধারণ।
পরের দিন ঘরের সামনে বউঠানের চটিজোড়া দেখতে না পেয়ে মুখ গোমড়া হয়ে যায় রবির, নিশ্চয় তাকে না বলে কোথাও নেমন্তন্ন রাখতে গেছেন!ফিরে আসতেই পুতুলের গয়না লুকিয়ে সেই ছুতোয় ঝগড়া শুরু করেন রবি, আমি কি তোমার চৌকিদার, তুমি না থাকলে তোমার ঘর কে সামলাবে?
কাদম্বরী হেসে বলেন, তোমাকে সামলাতে হবে না রবি, তুমি নিজের হাত সামলাও।
কখনও ছাদের ওপর ডাল বেটে বড়ি দেওয়া হয়েছে, আমসত্ত্ব শুকোচ্ছে। শীতের দুপুরে মাদুরে চুল এলিয়ে আলস্য করে পাহারা দিচ্ছেন বউঠান, সঙ্গে রবি।
ছাদের ঘরে যেদিন পিয়ানো এনে বসিয়ে দিলেন জ্যোতি, সেদিন যেন উৎসব। পিয়ানো বাজাচ্ছেন জ্যোতি আর সুরে কথা বসিয়ে গান গেয়ে উঠছেন রবি। বারো বছরের ছোট ভাইকে সব বিষয়েই প্রশ্রয় দেন জ্যোতিরিন্দ্র, রবির মধ্যে তিনি প্রতিভার ছটা দেখেছেন।
কিন্তু কাদম্বরী তা মানতে নারাজ। রবির সঙ্গে খুনসুটি করে প্রায়ই বলেন, তোমার মধ্যে বিশেষত্ব তো কিছুই দেখছি না রবি। না রূপে না গুণে।
রবি বলেন, আমার গুণ না হয় তুমি চিনতে পারছ না বোঠান, চেহারাটাও কি তোমার চোখের বালি?
কাদম্বরী রহস্য করেন, না রবি ঠাকুরপো, তোমার দাদাদিদিদের তুলনায় তোমার নাকটা বেশ বোঁচা।
না হয় নাক বোঁচাই হল, তা বলে আমি কি দেখতে খারাপ? রবিও উসকে দিয়ে নিজের চেহারার কথা শুনতে চান বউঠানের মুখে।
গায়ের রং ময়লা, মা এত রূপটান মাখিয়েও রং ফেরাতে পারেননি। কাদম্বরী চোখ নাচিয়ে বললেন।
পুরুষের আবার রং লাগে নাকি বোঠান? ইংরেজি সাহিত্যে পড়ছ না টল ডার্ক হ্যান্ডসাম নায়কদের গুণগান! রবি এবার টক্কর দিয়েছেন।
কাদম্বরী ঠেস দেন, ইস! খুব নায়ক সাজার শখ না? কীসে নায়ক হবে, কবিতা লিখে? পারবে বিহারীলালের মতো কবিতা লিখতে?
রবি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন, পারতেই হবে, বউঠানের কাছে একদিন না একদিন নিজেকে প্রমাণ করবেন তিনি। কাদম্বরীর ছুঁড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জ থেকেই রবির ছোট নীলখাতাটি ভূরে উঠতে থাকে কবিতায় কবিতায়।
সারাদুপুর কবিতা আর পিয়ানো চর্চার পর দিনের শেষে ছাদের ওপর পাতা হয় মাদুর আর তাকিয়া। রুপোর রেকাবিতে বেলফুলের গোরে মালায় জল ছিটিয়ে রেখে দিলেন কাদম্বরী, পিরিচে বরফ দেওয়া জল আর বাটায় ছাঁচিপান।
গা ধুয়ে, খোঁপায় বেলফুলের মালা জড়িয়ে এক-এক দিন এক-এক রঙের নয়নসুখ বা বেগমবাহার তাঁতের শাড়ি পরে কাদম্বরী এসে যখন মাদুরের ওপর বসেন, রবির মনে হয় যেন স্বয়ং সরস্বতী নেমে এসেছেন। ফরাসি পারফিউমের গন্ধে ম ম করে ওঠে সন্ধ্যার বাতাস।
জ্যোতি আসেন ধুতি বা পাজামার ওপর গায়ে পাতলা একটি উড়নি জড়িয়ে, অল্প আতর মেখে। রবি আসেন গলায় গান নিয়ে, যদিও তার গানকে বিশেষ মূল্য না দিয়ে বউঠান উৎসুক থাকেন জ্যোতির কণ্ঠসুধার জন্য।
ঠাকুরবাড়ির সবচেয়ে রূপবান গুণবান যুবকটিকে স্বামী হিসেবে পেয়ে নিজেকে রূপকথার রাজকন্যে মনে হয় কাদম্বরীর। প্রথম প্রথম তার ভয় ছিল স্বামীর যোগ্য হতে পারবেন কি না। জ্যোতি যদি তাকে উপেক্ষা করতেন, আত্মহত্যা করবেন ভেবে রেখেছিলেন কাদম্বরী। বিশেষত মেজোজা জ্ঞানদানন্দিনী বিয়ের আগে থেকেই অযোগ্য বলে তাকে যেরকম অপছন্দ করতেন তাতে কাদম্বরী ভয় পেয়েছিলেন।
কিন্তু জ্যোতির আদরে সোহাগে তিনি এখন পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী রমণী। পড়াশোনা ও কাব্যপাঠের পাশাপাশি তিনি মন দিয়ে ঘরকন্নাও করেন। অতি সাধারণ পদও তার রান্নার গুণে অসাধারণ হয়ে ওঠে। আবার ছাদের ওপর তাঁর নিজের হাতে সাজানো বাগানটিও দেখার মতো। কিনারায় সারি সারি লম্বা পামগাছ। আশেপাশের টবে চামেলি, গন্ধরাজ, করবী, দোলনচাপা। ছাদের ভোল পালটে গেছে কাদম্বরীর হাতে।
