খবর পেয়ে বিষণ্ণ হয়ে পড়েন দেবেন্দ্রনাথ। সারদাকে কি আর ধরে রাখা যাবে না সত্যিই? গিন্নি না থাকলে বাড়ির প্রতি টানটুকু ধরে রাখাই মুশকিল হয়ে যাবে এরপর।
বাড়িতে কান্নাকাটি শুরু হয়ে গেছে। সবাই ভাবছেন কর্তামশায় শিলাইদহ থেকে ফিরে এসে দেখতে পাবেন তো কর্তামাকে?
সারদা কিন্তু নাড়ি ছেড়ে যায় যায় অবস্থাতেও বললেন, তোরা ভাবিস না, কত্তার পায়ের ধুলো না নিয়ে আমি মরব না।
ঠিক তাই হল। দেবেন ফিরে এলেন জোড়াসাঁকোয়। সোজা চলে এলেন স্ত্রীর তেতলার ঘরে। সারদা অতি কষ্টে হাত বাড়িয়ে কর্তার পা ছুঁয়ে বললেন, আমি তবে চললাম। আর জন্মে আবার দেখা হবে।
ঘরভরা ছেলেমেয়ে বউ নাতিনাতনি, দাসদাসীর সামনে স্বামীর আশীর্বাদ নিয়ে চোখ বুজলেন সারদাসুন্দরী। ব্রাহ্মঘরের কোনও এক বউ মরদেহকে প্রণাম করে যেন গোঁড়া হিন্দুদের মতো বলে উঠলেন, আহা, শাখা সিন্দুর নিয়ে চলে গেলেন সৌভাগ্যবতী।
চুপচাপ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ছাদে চলে গেলেন দেবেন্দ্রনাথ।
শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার সময় আবার নেমে এলেন। চিরসঙ্গিনীর দেহে নিজের হাতে ফুল চন্দন ছিটিয়ে স্বগতোক্তি করেন, ছয় বৎসরের সময় এনেছিলেম, আজ বিদায় দিলেম।
সত্যেন মাকে শেষদেখা দেখতে পাননি। খবর পেয়ে সাতদিনের মাথায় জ্ঞানদাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলেন। জীবিত সব পুত্রকন্যাবধূর উপস্থিতিতে ব্রাহ্মমতে মহাসমারোহে তার শেষ কাজ হয়ে গেল। সারদার মৃত্যুতে ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে একটি যুগের অবসান ঘটল।
.
বারবাড়িতে শুরু হল নতুন একটি যুগ। মাসখানেক পরে শোক কাটিয়ে উঠে সারদার ছেলেরা বাড়িতে বিদ্বজ্জনসমাগম ঘটিয়ে ফেললেন। সত্যেন এখানে থাকায় সভার আয়োজন হল সর্বাঙ্গসুন্দর। রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, বাবু রাজেন্দ্রলাল মিত্র, বাবু রাজনারায়ণ বসু, বাবু প্যারীচরণ সরকার ইত্যাদি বহু লেখক সম্পাদক গুণীজনে গমগমে সেই সভায় দ্বিজেন তার স্বপ্নপ্রয়াণ কাব্য পাঠ করলেন আর জ্যোতি পড়লেন নিজের নাটকের একটি অঙ্ক। কিন্তু গোলমাল বাধল প্যারীমোহন কবিরত্ন যখন ইংলন্ডেশ্বরীর প্রতি নিবেদিত একটি গানে স্বদেশির সঙ্গে বিলিতি দ্রব্যের বিনিময়ে ভারতের সর্বনাশের কথা বললেন। অনেকে তার সঙ্গে একমত না হওয়ায় তর্ক শুরু হয়ে গেল। সেখানে প্রায় শখানেক বাঙালি বুদ্ধিজীবী জড়ো হয়েছেন, সবাই তো কোনও বিষয়েই একমত হবেন না।
শেষে সত্যেন সংগীত শুরু করিয়ে দিতে হট্টগোল থামল। ঠাকুরবাড়ির বালক কিশোরেরা অনেকদিন ধরে মহড়া দিয়ে প্রস্তুত হয়েছে। তর্কের অবসানে গানের চেয়ে ভাল আর কী হতে পারে!
এই অনুষ্ঠানটি রবির পক্ষে খুবই আনন্দের। যাদের লেখা পড়তে শুরু করেছেন, যাঁদের কথা বারে বারে শুনেছেন, তাঁরাই সশরীরে একেবারে ঘরের মধ্যে উপস্থিত! তাদের উৎসাহ পেয়ে মনে তার খুশির বাধ ভাঙল যেন।
এই সভায় মেয়েদের নিমন্ত্রণ জানানো হয়নি। কিন্তু সকলকে অবাক করে দিয়ে হঠাৎই কালো চাদরে মুখ ঢাকা দুজন নারী আসরে এসে বসলেন। সৌজন্যবশত পুরুষেরা কেউ তাদের পরিচয় জিজ্ঞেস করতে পারছেন না। অথচ কৌতূহল হচ্ছে।
কেউ জানতে চান, মেয়েদুটি সত্যি মেয়ে তো?
আবার আর-একজন ফিসফিস করে বলেন, মুসলমানি মেয়েরা তো, এভাবে বেরতেই পারে না? মেয়ে না কি হিজড়ে?
জ্যোতির কাছে সবাই জানতে চান। তার অবশ্য সন্দেহ হয় স্বর্ণ দুষ্টুমি করছে না তো কাউকে জুটিয়ে নিয়ে? সে আসতে চেয়েছিল কিন্তু অনুমতি দেওয়া হয়নি দু-চারজন রক্ষণশীল আপত্তি জানানোয়। নিজেদের বাড়িতে প্রথমবার সমাগম করতে গিয়ে কোনও বাধা আসুক তা জ্যোতি চাইছিলেন না। পরের বার নিশ্চয় মেয়েরাও আসবে। কিন্তু মেয়েদুটি কারা?
ঘোমটার নীচে মেয়েদুটি হাসিগল্পে মশগুল। জ্যোতিরিন্দ্র কায়দা করে ওঁদের পরিচয় জানার জন্য রবিকে পাঠালেন।
রবি ওঁদের সামনে গিয়ে জ্যোতিদাদার শেখানো কথাটাই বললেন, আপনারা যদি নিজেদের পরিচয় দিয়ে কোনও আলোচনায় অংশ নেন, আমরা খুব খুশি হব।
মেয়েরা রবিকে পাত্তা দেয় না। হাত নেড়ে চলে যেতে বলে, কিন্তু রবি নাছোড়বান্দা তাঁকে একটা গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তিনি বারবার নানাভাবে ওদের নাম জানতে চান।
রবির জ্বালাতনে অতিষ্ঠ হয়ে একটি মেয়ে বলে ওঠে, জ্যোতিদাদাকে বল আমরা সখীসমিতি।
রবি জানতে চান, দুজনেরই এই নাম?
মেয়েটি বলে, দুজনে মিলে এই নাম। বুঝলি গবেট! যা জ্যোতিদাদাকে বল আর আমাদের নিস্তার দে। সবাই হাঁ করে দেখছে।
রবির এবার চেনা চেনা লাগে গলাটা, তিনি উত্তেজিত হয়ে বলেন, বুঝেছি, তুমি তো স্বর্ণদিদি। স্বর্ণ তাড়াতাড়ি রবির মুখে হাত চাপা দিয়ে বলেন, চুপ চুপ।
তা হলে বলল, তোমার সঙ্গে উনি কে? রবি ছাড়ার পাত্র নয়। না বললে চিৎকার করব। সবাইকে বলে দেব তোমরা লুকিয়ে লুকিয়ে এসেছ।
আরে আমি রূপা। এবার চুপ করো রবিদাদা। আমরা লুকোচুরি খেলছি বিদ্বজ্জনের সঙ্গে।
সখীসমিতিকে ঘোমটার মধ্যে হেসে গড়াগড়ি খেতে দেখে এবার রবিও হাসতে থাকেন। তিনিও যেন ওদের লুকোচুরি খেলার সঙ্গী হয়ে যান।
উৎসুক দু-একজন প্রশ্ন করলে রবি বলেন, সে একটা গুহ্যকথা, সবাইকে বলা বারণ। শুধু জ্যোতিদাদাকে বলা যাবে।
