সারদা তার তেতলার ঘরে রবিকে ডেকে পাঠিয়ে জানতে চান, হ্যাঁ রে রবি, তোরা যে এত পাহাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলি, তোর বাবামশায় ঠিকঠাক খাওয়াদাওয়া করতেন তো?
রবির একটু অভিমান হয়, মা কি শুধু বাবামশায়ের কথাই জানতে চান, আমার খাওয়াদাওয়ার খোঁজ নেবেন না? কিন্তু মা তো এরকমই। তবু তিনি যে ডেকে পাঠিয়ে এত কথা শুনছেন তাতেই আনন্দে বুক ভরে ওঠে রবির।
তিনি সোৎসাহে বলেন, মা রোজ সকালে বেরোনোর আগে আমরা পেট ভরে দুধরুটি খেয়ে নিতাম। তারপর ঘোড়ায় চড়ে পাহাড়ে বেরিয়ে পড়া। উফ! সে যে কী অপূর্ব সুন্দর, না দেখলে বোঝানো যাবে না। আমি বড় হয়ে তোমাকে নিয়ে যাব মা।
হায় রে রবি, তুই যখন বড় হবি আমি কি তখন থাকব রে? সারদা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
রবি আকুল হয়ে মাকে জড়িয়ে ধরেন, তুমি কোথায় যাবে মা, কোথাও যেতে দেব না। আমি শিগগির বড় হয়ে যাব।
আমার যে অসুখ করেছে রবি। আর বোধহয় বেশিদিন তোদের কাছে থাকতে পারব না। সারদা রবির মাথায় হাত রেখে বলেন, তুই এইরকম তোর বাবামশায়ের সঙ্গে সঙ্গে থাকিস, তা হলেই তোর ভাল হবে। পাহাড়ের মতো বড় হবি তুই।
রবি মায়ের রুগ্ণ দেহের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আঁকড়ে ধরে বলেন, না মা, তুমি থাকবে। ছোটবেলায় তোমার কাছে আসতে পারতাম না। এখন তুমি আমাকে ডেকে নিয়েছ, আর কোথাও যাবে না। আমি তোমাকে পালকি করে তেপান্তরের মাঠে নিয়ে যাব একদিন।
সারদা হাসেন, এই ছেলেটা এখনও ছেলেমানুষ। তুই একা একা আমাকে নিয়ে কোথায় যাবি? যদি ডাকাত ধরে?
ডাকাত? আসুক না, আমি যুদ্ধ করে তাড়িয়ে দেব। রবি একটা লাঠি হাতে নিয়ে তলোয়ারের মতো ঘোরাতে ঘোরাতে বলে, দেখো মা, আমি বীরপুরুষ! ডাকাতের সঙ্গে লড়াই করতে যাচ্ছি।
সারদা মজা করে বলেন, যাস নে খোকা ওরে! আমি যে ভয় পাচ্ছি! এত লোকের সঙ্গে লড়াই কী করে করবি?
রবি অনেকক্ষণ লড়াইয়ের ভঙ্গিতে তলোয়ার ঘোরায়। ছেলের খেলার যুদ্ধ দেখতে মজা পান সারদা, নিজেও যেন তার সঙ্গী হয়ে গেছেন। ব্যথার কথাও সাময়িকভাবে ভুলে গেছেন তিনি।
রবি অনেক যুদ্ধের পর ক্লান্ত হয়ে ঘাম মুছতে মুছতে মায়ের সামনে এসে বলেন, দেখো, লড়াই গেছে থেমে। আমিই জিতেছি। আর তোমার ভয় নেই।
সারদা কষ্ট করে উঠে বসেন। রবিকে বহুদিন পরে কোলে টেনে নিয়ে চুমু খেয়ে বলেন, ভাগ্যে খোকা সঙ্গে ছিল, কী দুর্দশাই হত তা না হলে!
আরও বেশ কিছুদিন ক্ষুদ্র ভ্রমণকারীটি মায়ের কাছে এবং অন্দরের ঘরে ঘরে হিমালয় বেড়ানোর গল্প বলে আদর কাড়তে লাগল। স্বাধীনতার মাত্রাও বেড়ে গেল। চাকরদের শাসন এবং ইস্কুলের বন্ধন শিথিল হয়ে এল। বাড়ির দাদা দিদিদের সঙ্গে গান ও সাহিত্যের মজলিশে ঢুকে পড়তে লাগলেন কিশোর রবীন্দ্রনাথ। জ্যোতির আর কাদম্বরীর প্রেমঘন কাব্যসভায় নতুন কবিদের চর্চা হয়। নতুনবউ তখন বিহারীলালের কবিতার ভক্ত হয়ে উঠেছেন, প্রায়ই কবির সারদামঙ্গল কাব্য মুখস্থ বলছেন, আর সেই অমৃতসুধা পানের আশায় তার পিছু পিছু ঘুরতে থাকেন রবি। সমবয়সি দেওর ও বউঠানের মধ্যে খেলার সঙ্গীর মতো খুনসুটি চলতে থাকে। জ্যোতির কাছে যা যা শেখেন কাদম্বরী, তাই আবার রবিকে শেখাতে চান। জ্যোতির প্রিয়শিষ্যা তিনি আর রবি তার ছায়াশিষ্য।
ঠাকুরবাড়ির ঘরে ঘরে তখন সাহিত্যের নবজোয়ার। দ্বিজেনের স্বপ্নপ্রয়াণ কবিতাটি সকলের প্রশংসা পেয়েছে। সত্যেন ও জ্ঞানদা এলে তাঁদের ঘরেই আজকাল শহরের বিশিষ্ট কয়েকজন সাহিত্যিক আসর বসান। জ্যোতি ইতিমধ্যেই একজন প্রতিষ্ঠিত কবি ও নাট্যকার। অন্ধকারে চাঁদের উদয়ের মতো স্বর্ণকুমারীর জ্যোৎস্না ছড়িয়ে পড়ছে। এইসব উদ্ভাসে পাগল পাগল লাগে কিশোর রবির, তিনি কবিতারসে মাতাল হতে থাকেন ক্রমশ।
জ্যোতি ও দ্বিজেন ঠিক করে ফেললেন সামনের বসন্তে ঠাকুরবাড়িতে একটি বিদ্বজ্জন সমাবেশ করা হবে। দেশের সন্ধিক্ষণে ঠাকুরবাড়িকেই নিতে হবে অগ্রণী ভূমিকা। সবাই মেতে উঠলেন তার প্রস্তুতিতে।
সারদার শরীর কিছুটা ভাল থাকায় দেবেন ঠাকুরও নিশ্চিন্ত হয়ে পৌষের এক সন্ধ্যায় সদলবলে ব্রাহ্মসমাজে এলেন। ছেলেদের মধ্যে দ্বিজেন ও জ্যোতি এবং জামাই বন্ধু আত্মীয়স্বজন মিলে বেশ বড় দল। তাদের যোগদানে সেদিন ব্ৰহ্মসংগীত বেশ জমে উঠল। জ্যোতি ও দ্বিজেনের উদাত্ত গলার গানে যেন নতুন জোয়ার এল ব্রাহ্মদের দলটিতে। উপাসনার সময় দেবেন আজ শুধু স্ত্রীর আরোগ্য কামনা করলেন। সারদা অসুস্থ থাকলে ঘরে মন বসে না তাঁর। গৃহকে গৃহ মনে হয় না।
কিছুদিনের মধ্যেই উচাটন কাটাতে শিলাইদহে জমিদারি দেখতে গেলেন তিনি। সারদাও ঘরবন্দি না থেকে গঙ্গাবক্ষের মনোরম বাতাসে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু স্বামীর অনুপস্থিতিতে আবার তার শরীর খারাপ হতে শুরু করল। এবার শুরু হল তুকতাক। এক হাতুড়ে আচার্যিনীর পরামর্শে তেঁতুলপোড়া বেটে ক্ষতের চারপাশে লাগানোয় ক্ষত বিষাক্ত হয়ে পেকে উঠল। এবার বোধহয় আর বাঁচবেন না। সারদা ভাবলেন, শেষ কটাদিন বাড়িতে কাটানোই ভাল।
রবির আবদারে বাড়িতে কয়েকদিন বালকদের ঘরের একপাশে বিছানা করে থাকছিলেন সারদা। অসুখ বেড়ে যেতে তেতলার ঘরে নিয়ে যাওয়া হল। ক্রমশ বিছানা থেকে ওঠার শক্তি হারালেন। বেডসোর থেকে বাঁচানোর জন্য উইলসন হোটেলের দোকান থেকে হাওয়া-বালিশ আনা হয়েছে। রোজ সেই বাতাসের বিছানা-বালিশে হাওয়া ভরার জন্য গাড়ি করে একজন লোক পাঠাতে হয়।
