রূপা আদুরে গলায় বলে, আমি বিয়ে করবই না।
সারদা এবার কঠোর হয়ে বলেন, না করতে চাইলে জোর করে বিয়ে দেব। তোকে বিদেয় না করে আমি মরেও শান্তি পাব না।
তা হলে আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে যাব, পালাবই। স্থির সিদ্ধান্ত জানায় রূপকুমারী।
জোড়াসাঁকোর বাড়িতে হঠাৎই একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল। সারদাসুন্দরী বেড়াতে গিয়েছিলেন পেনেটির বাগানে, সেখানেই তার হাতের ওপর ভেঙে পড়ল লোহার সিন্দুকের ভারী ডালা। তড়িঘড়ি তাকে বাড়ি আনা হল। হাতে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে শয্যাশায়ী হলেন গৃহলক্ষ্মী। প্রথমে আর্নিকা ও মলম দিয়ে সারানোর চেষ্টা ব্যর্থ হল। তারপর বাড়ির ডাক্তার ডা. নীলমাধব হালদার এবং মেডিকেল কলেজের সার্জারির অধ্যাপক ডা. প্যাট্রিজ তাকে চিকিৎসা করলেও সারাতে পারলেন না। পরপর অনেক ডাক্তার এলেন গেলেন। ভেতরে লোহার টুকরো ঢুকে গিয়েছে। একবার অস্ত্রোপচার করে লোহা বার করার পরেও ব্যথা কমল না।
ঠিক এসময়েই দেবেন ঠাকুর বাড়িতে অনুপস্থিত। রবিকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বেড়াতে গেছেন ডালহৌসি পাহাড়ে। দুমাসের মধ্যেও সারদার রোগ না সারায় তাকে টেলিগ্রাম করা হয়েছে। সংবাদ পেয়ে চিঠিতে, টেলিগ্রামে পরামর্শ দিতে লাগলেন উদ্বিগ্ন মহর্ষি।
শেষে মেডিকেল কলেজের পাঁচজন বিশিষ্ট সাহেব ডাক্তারের বোর্ড বসল সারদাদেবীর রোগ সারাতে। তাদের প্রত্যেকের ভিজিট বত্রিশ টাকা। তাদের পরামর্শ অনুসারে ক্ষতস্থানের মাংস কেটে বাদ দিয়ে ট্রান্সপ্লান্ট করতে হবে। এরকম চিকিৎসার কথা আগে বিশেষ শোনা যায়নি। সাহেবদের মাথা থেকেই এ-সব উদ্ভট চিকিৎসা বেরিয়েছে। কিন্তু কথা হল কার দেহ থেকে মাংস কেটে সারদার অঙ্গে লাগানো হবে, একমাত্র পরিবারের রক্তসম্পর্কের কেউ যদি এগিয়ে আসেন তবেই সারদা রাজি হবেন নয়তো বিনা চিকিৎসায় থাকবেন তাও ভাল।
বাবামশায় বাড়ি নেই। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে এলেন সেজো ছেলে হেমেন। সন্তানের অঙ্গ থেকে নতুন মাসমজ্জা লাগল গর্ভধারিণীর দেহে।
তবুও ব্যথা কমে না। সারদা অধীর হয়ে ওঠেন। অসুখও সারে না, কত্তামশায়ও ফেরেন না। তাকে একবার দেখতে বড় সাধ হচ্ছে। কী জানি আবার দেখা হবে কি না? তার অনুরোধে বাবামশায়কে ফিরে আসার জন্য চিঠি পাঠান হেমেন।
মহর্ষি তখন রবিকে নিয়ে ডালহৌসি পাহাড় থেকে সমতলে নেমেছেন, তাঁর ইচ্ছা এবার অমৃতসরে কিছুদিন বসবাস করে আস্তে আস্তে কলকাতার দিকে পা বাড়াবেন।
শীতের শুরুতে ব্যথা বাড়লে হাওয়া বদলের জন্য গঙ্গায় বোট ভাড়া করে মাকে সেখানেই রাখলেন হেমেন্দ্রনাথ। বাড়ির বন্ধ চার দেওয়ালে চিরদিন বাস করে এখন এই নৌকোয় যেন মুক্তির আনন্দ পাচ্ছেন সারদাসুন্দরী। এই নৌকোটি যেন তার একান্ত নিজের। এখানে তিনি আর ব্রহ্মোপাসনা করেন না, নৌকোঘরের এক কোণে লক্ষ্মীজনার্দনের নাম করে দুটি ঘট স্থাপন করেছেন। মানদা দাসীকে বলা আছে টাটকা ফুল বেল পাতা এনে দিতে, তিনি স্নান করে গঙ্গাজলসহ ওই নৈবেদ্য ঘটে নিবেদন করেন রোজ।
একদিন হেমেন এসে খবর দিলেন, মা, বাবামশায় ফিরে আসছেন শিগগিরই, টেলিগ্রাম করেছেন।
স্বস্তির শ্বাস ফেলে হাত মাথায় ঠেকান সারদা। গৃহদেবতা তার কথা শুনেছেন, কত্তার সঙ্গে দেখা না হলে যে তাঁর মরেও শান্তি নেই।
বাড়ির ডাক্তার দ্বারিকানাথ গুপ্ত রোজ বোটে এসে তাকে পরীক্ষা করেন। মেয়ে বউমারা রোজ দেখা করতে আসেন, কেউ কেউ সঙ্গে থেকেও যান। সবাইকে দেখে আনন্দ পান শুধু প্রফুল্লময়ী এলেই সারদার বড় কষ্ট হয় তার মুখের দিকে তাকিয়ে। ওর জন্য কিছু করে যেতে পারলেন না তিনি। কচি বয়সে ছেলে নিয়ে বিধবা হয়েছে, সারাজীবন নিরানন্দে কাটাতে হবে মেয়েটাকে। বীরেনের মৃত্যুশোক তিনিই কাটিয়ে উঠতে পারেননি, তো ও বেচারার কী অবস্থা!
মাসখানেকের মধ্যেই দেবেন ঠাকুর জোড়াসাঁকো ফিরে এলেন। পথে কিছুদিন অবশ্য রবিকে নিয়ে শান্তিনিকেতনে কাটিয়ে এসেছেন তিনি। যাওয়া-আসার পথে এভাবেই তিনি প্রকৃতি উপভোগের সঙ্গে সঙ্গে জমিদারি পরিদর্শন করে নেন।
মহর্ষি ফিরে এলে সারদা বোট থেকে ঘরে ফিরলেন। তেতলার ঘরে এতদিন পরে স্বামীকে দেখে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।
দেবেন্দ্রনাথ তার মাথায় হাত রাখেন, এই তো আমি এসেছি, ভয় কী সারদা? এখন তোমার কাছেই থাকব।
কত্তার হাত জড়িয়ে ধরে সুখের কান্না কাঁদতে থাকেন সারদা, এবার না এলে আর আপনার দেখা পেতাম না। আর বোধহয় বাঁচব না আমি।
দেবেন সান্ত্বনা দিলেন, কে বলেছে বাঁচবে না? তোমার এখনও পঞ্চাশ হয়নি গিন্নি, এখন কোথায় যাবে? আমি নিজে দাঁড়িয়ে চিকিৎসা করাব, দেখি অসুখ সারে কি না!
সত্যি যেন প্রাণে নতুন জোয়ার এল সারদার। আগের তুলনায় তিনি এখন অনেক সুস্থ। ব্যথা আছে কিন্তু তার সহ্য করার শক্তি যেন অনেক বেড়েছে। মাঝে মাঝে সকালের রান্নার জোগাড়ের সময় বা বিকেলের চুল বাঁধার আসরেও বসতে শুরু করলেন।
হিমালয় থেকে ফিরে রবি যেন অনেক বড় হয়ে গেছেন। বড়রা তাঁকে সম্মান দিচ্ছেন, মা তাকে ডেকে ডেকে হিমালয়ের গল্প শুনতে চাইছেন প্রায়দিনই। অন্তঃপুরের বন্ধ দরজা খুলে গেছে কী এক আশ্চর্য ফুসমন্তরে। সবাই তার কাছে বেড়ানোর গল্প শুনতে চায়, বিশেষ করে নতুনবউঠান। রবি যেন একটি ভ্রমণকাহিনির খোলা পাতা।
