জ্যোতির কথা শুনে কাদম্বরী অবাক হয়ে বলেন, ওমা কী মিথ্যে কথা, আমি তো তোমাকে যেতে বললাম, তুমিই অন্য কথা বলছিলে তাই
জ্ঞানদা বিরক্ত হন, ওমা এইটুকু মেয়ের পেটে পেটে এত? ঠাকুরপো তোমাকে এত ভালবাসে তাও এমন ভয় দেখাচ্ছ? দেওরের কাছ ঘেঁসে রহস্য করে আবার বলেন, তুমি কি ওকে আমার সঙ্গেও মিশতে দেবে না নতুনবউ?
জ্যোতি তাড়াতাড়ি বলে ওঠেন, সেকী কথা মেজোবউঠান, তুমি আমার প্রথম প্রেরণা, বউ তো অনেক পরে এসেছে।
এবার কাদম্বরীর একটু অভিমান হয়, জ্ঞানদাকে বলেন, তোমার সঙ্গে মিশতে বারণ করব এমন সাহস আমার নেই মেজদি। আর সে-কথা বলবই বা কেন, উনি কার সঙ্গে মিশবেন, কীভাবে মিশবেন, সেটা ওঁর ব্যাপার। আমি ওঁর শ্রীচরণে স্থান পেয়েছি এই আমার ভাগ্য!
ওবাবা, মেয়ের তো বোল ফুটেছে। না জ্যোতি এখন আর ওকে এড়িয়ে তোমার সঙ্গে মেশা যাবে না। আমাদের সাহিত্যবাসরে ওকেও ডেকে নিয়ো এরপর, জ্ঞানদার গলায় ঈষৎ শ্লেষ। বউয়ের অধিকার ফলাতে গিয়ে সাহিত্যবাসরে এসে বসলে নতুনবউয়ের সব জারিজুরি বেরিয়ে যাবে, জ্যোতিও নিজের ভুল বুঝবে। সাহিত্যিক হতে চাইলে ওর উচিত ছিল জ্ঞানদার কথামতো শিক্ষিত মেয়ে বিয়ে করা। শুধু রূপসি বলেই স্বামীর কাব্যের প্রেরণা হতে পারবে কি এই পুঁচকে বালিকা।
কিন্তু জ্যোতি বউকে বলেন অন্য কথা, নিজেকে কোনওদিন কারও শ্রীচরণে নামাবে না, এমনকী স্বামীর পায়েও না। নতুনবউ, কখনও ভুলো না, তোমার স্থান আমার হৃদয়ে।
আর আমাকে কোথায় রেখেছ ঠাকুরপো? জ্ঞানদা কৌতুক করে জানতে চাইলেন।
তোমাকে মাথায় করে রেখেছি বুঝতে পার না মেজোবউঠান? জ্ঞানদার মুখের দিকে তাকিয়ে জ্যোতির হঠাৎ মনে হল কাদম্বরীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতায় মেজোবউঠান কি কোনওরকম কষ্ট পাচ্ছেন! কিন্তু তা কেন হবে? বউঠান কি আশঙ্কা করছেন যে দেওর-বউঠানের মধুর সম্পর্কে কাদম্বরী বাধা দেবে? সেরকম ভাবলে তাঁর ভুল ভাঙানো দরকার।
জ্যোতি বলেন, এখন যে কদিন জোড়াসাঁকোয় থাকবে তোমরা মেজোবউঠান, সে কদিন তোমার সাহচর্যের জাদুতেই গুটিপোকা থেকে প্রজাপতি হয়ে উঠতে পারে নতুনবউ।
জ্ঞানদা কথাটায় যেন খুশি হলেন না, বললেন, সে ভার তো বাবামশায়। নীপময়ীকেই দিয়েছেন, নতুনবউ তো দিব্যি কথা বলছে। বাবামশায় যখন আমার ওপর আস্থা রাখেননি, এর মধ্যে আবার আমাকে টানছ কেন নতুনঠাকুরপো? বরং তোমার নতুন লেখা পড়ে শোনাও, আমি তো সকাল সকাল কাজ সেরে তোমার শকুন্তলা কাব্য শুনব ভেবেই এসেছি।
দেওর আর বউঠান কাব্যপাঠে মজে যান। কাদম্বরীর সঙ্গে আর-একটি উৎসুক শ্রোতাও তৃষ্ণার্তের মতো সেই কাব্যসুরা পান করতে থাকেন তাঁদের অলক্ষ্যে, সে জানলার বাইরে থাকা রূপকুমারী।
.
সারদা খবর পেলেন রূপা নাকি জ্যোতির পিছু পিছু গিয়ে বৈঠকখানায় পুরুষদের আসরে বসে থাকছে আর দিব্যি জমিয়ে গল্পগাছাও করছে।
তার কাণ্ড দেখে বর্ণ একদিন এসে বললেন, মা আর তো পারা যাচ্ছে না তোমার পুষ্যিকে নিয়ে! তার জন্য যে আমাদের বাড়ির মেয়েদের সম্মান ধুলোয় লুটোচ্ছে।
কেন, আবার কী করল সে? সারদার হয়েছে জ্বালা, না পারেন গিলতে, না পারেন ফেলতে মেয়েটাকে। অবাধ্য, বেয়াড়া কিন্তু মনটা স্বচ্ছ সরোবরের মতো। ও যা করে সেটা কেন বারণ তাই সে বোঝে না।
তুমি যেন কিছু জানো না!]বর্ণ রাগ করে, তুমি ওকে যেমন মাথায় তুলছ, আমাদের তো কখনও তেমন স্বাধীনতা দাওনি। ওর বয়স তো অনেক হল মা!
সারদার মাঝে মাঝে বিষণ্ণ লাগে, এ কি তাঁরই ব্যর্থতা! আবার মনে হয় তা কেন, এতগুলো হিরের টুকরো ছেলেমেয়ে তার, রূপা যে রক্তসম্পর্কের না তাই বোধহয় শোধরাতে পারলেন না। তিনি বললেন, কেন রে, সাহিত্যের আসরে তো স্বর্ণও যায়, মেজোবউমাও যায়, রূপা গেলেই বা দোষ কী?
এবার সৌদামিনী মাকে বোঝাতে নামলেন, মা স্বর্ণ বা মেজোবউঠানের সঙ্গে কি ওর তুলনা হয়? রূপা সাহিত্যের কী বোঝে? তা ছাড়া ও তো সাহিত্যের টানে যায় না, ওর আকর্ষণ যুবক ছেলেরা। রূপা তাদের সকলের সঙ্গে কীরকম ইয়ারদোস্তের মতো মেশে তা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। আমি পরদার আড়াল থেকে দেখেছি, হ্যারি নামে একটি সাহেবের সঙ্গে সারাক্ষণ ফুসফুস করছে, হেসে গড়িয়ে পড়ছে।
মানদা দাসী কত্তামার জন্য পান সেজে রুপোর পাত্রে রাখছিল। সে আর চুপ করে থাকতে পারে না, বকুনি খাবে জেনেও বলে ওঠে, কী ঢলাঢলি, কী ঢলাঢলি মা গো! দেখলে মনে হবে বাইজিপাড়ার মেয়ে।
ছিঃ, চুপ কর মানদা। কত্তামা ধমকে ওঠেন। সব কথায় কথা বলিস না। পান দে একটা।
কথা শেষ হতে না হতেই রূপকুমারী ছুটে এসে ধুপ করে সারদার পায়ের কাছে বসে পড়ে। তাকে দেখে সবাই চুপ।
সারদা তার চুলের মুঠি ধরে জিজ্ঞেস করেন, মুখপুড়ি, তুই কি আমায় শান্তিতে থাকতে দিবি না? সারাদিন তোর নামে সবাই নালিশ করে কেন? আর সব মেয়েদের মতো লক্ষ্মীমন্ত হতে পারিস না তুই? কাল সকালে উঠে যার মুখ দেখব তার সঙ্গেই তোর বিয়ে দিয়ে দেব।
রূপা হেসে গড়িয়ে পড়ে, মা, তা হলে তো কোনও মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে দিতে হবে, বাইরে না বেরলে তুমি ছেলেদের মুখ দেখবে কোত্থেকে?
ধন্যি মেয়ে বাবা, সৌদামিনী বলেন, আমরা তোকে নিয়ে জেরবার হয়ে যাচ্ছি আর মেয়ের কোনও হুঁশ নেই? না, হাসির কথা নয়, এবার সত্যিই রূপার বর খুঁজতে হবে, বয়স তো তেরো-চোদ্দো হল।
