কেউ বলছে, ঘোড়ার ওপর ডবকা মাগীর খেল দেখে যা আয়। আবার কেউ বলছে দেবীর কি এবার অশ্বে আগমন? ইনি দেবী না মানবী? গায়ে তো গয়নাগাটিও বেশ।
ভদ্দরলোকের বেটি তো খোলামেলা রাস্তায় নামবে না, এ নিশ্চয় কোনও বেশ্যামাগীর বাবু ধরার ছলাকলা।
একে ঘোড়া থামে না তারপর এ-সব নোংরা নোংরা কথা। বাইরের জগৎটা এত খারাপ, লোকেরা এত ইতর হতে পারে জানত না রূপা। এসব শোনার জন্যই সে বাইরে বেরতে চেয়েছিল, হায় রে! ক্ষোভে, ভয়ে তার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসে।
কোনওক্রমে রাস্তার লোকেরা ও বাড়ির দারোয়ান বেহারারা মিলে ঘোড়ার দড়ি ধরে থামায় শেষপর্যন্ত। ঘোড়া থামামাত্র উৎসাহী কিছু বদমাশ লোক রূপার গায়ে হাত দেওয়ার চেষ্টা করে। একটি বিচ্ছিরি ঢ্যাঙা লোক রূপার বাহু ধরে টানতেই রূপা তাকে ঠাসিয়ে চড় কষায়। বেহারারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই এতসব ঘটে গেল কিন্তু এবার কী হবে?
চোয়াড়েমার্কা কয়েকটি লোক রূপাকে জাপটে ধরার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু করল, এ মাগীটা তো বেশ সরেস মাল, আবার গায়ে হাত তোলে। দেখি এবার কে তোকে বাঁচায়!
ঘটনা আরও খারাপ দিকে যেতে পারত, কিন্তু ঠিক সময়ে জ্যোতিরিন্দ্র পালকি চেপে এসে উপস্থিত হলেন। তাকে দেখে লোকগুলো পালাল বটে তবে তেড়ে খিস্তি দিতে ছাড়ল না। পরের দিন বিখ্যাত জ্যোতি ঠাকুরকে ঘটনার নায়ক করে দুটি সংবাদপত্রেও এই মুখরোচক খবর ছাপা হল।
০৬. সারদার মৃত্যু
জ্যোতির আজ মনখারাপ। টাকাপয়সার অভাবে একটি দাঁতব্য হাসপাতালে অসহায়ভাবে মারা গেলেন মধুসূদন দত্ত। ধনী পিতার আদরের সন্তান মধু ভেবেছিলেন ইংরেজিতে কবিতা লিখলে বিশ্বসাহিত্যে স্থান পাবেন আর সেজন্য হেঁদো হিন্দুধর্ম ছেড়ে খ্রিস্টান হওয়া দরকার। মধুর ধর্মত্যাগ সমাজে হুলুস্থুলু ফেলে দিল। রাগে ক্ষোভে বাবা রাজনারায়ণ তাকে ত্যাগ করলেন। মায়ের স্নেহ ছেড়ে, প্রেসিডেন্সি কলেজের বন্ধুদের পেছনে ফেলে, দেশত্যাগ করে মধু বেরিয়ে পড়লেন ভাগ্যান্বেষণে। কিন্তু ভাগ্যদেবী তার সঙ্গে ছলনা করেছেন। সরস্বতীর কৃপায় কবিতায় আর নাটকে তার খাতা ভরে উঠেছে, কিন্তু লক্ষ্মী তাকে ধরা দিলেন না কোনওদিনই। মধু অবশ্য খুব শিগগিরি বুঝতে পেরেছিলেন যে লিখতে হলে ইংরেজি নয় বাংলাতেই লিখতে হবে। ইংরেজি ভাষায় অনেক প্রতিযোগিতা, কেউ তার মতো নেটিভকে ঢুকতে দিতে চায় না। কিন্তু বাংলায় বহু কিছু করার আছে। প্যারীচাঁদ মিত্র বা টেকাদ ঠাকুররা যে রকম কুলিমজুরের ভাষায় লিখছেন তা দিয়ে কালজয়ী সাহিত্য হতে পারে না। দুয়োরানি বাংলামায়ের শরীরে অলংকার পরিয়ে তিনি তাকে সুয়োরানি সাজাবেন। একটি কবিতায় বাংলাভাষার উদ্দেশে তার অন্তিম ইচ্ছের কথাও লিখে গেছেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত,
রেখ মা দাসেরে মনে এ মিনতি করি পদে
সাধিতে মনের সাধ ঘটে যদি পরমাদ
মধুহীন কোরো নাকো তব মন কোকোনদে
মধুসূদনের প্রহসনের সঙ্গেই জ্যোতির কিঞ্চিৎ জলযোগ নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছিল একবার। তার আগে থেকেই জোড়াসাঁকোর বাড়িতে মধুর আসা যাওয়া।
জ্যোতি বললেন, নতুনবউ, তুমি তো তাকে দেখনি। অমন প্রতিভা শেষ হয়ে গেল লালনের অভাবে, টাকাপয়সার অভাবে। আর ওদিকে তার বিপুল পৈতৃক সম্পত্তির ওপর ছাতা পড়ছে!
কাদম্বরী জানতে চান, ওঁর বিদেশিনী স্ত্রী এখন ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে কী করে দিন কাটাবেন? তার পাশে তো কেউ দাঁড়াবে না কলকাতায়?
হেনরিয়েটা খুব বিপদে পড়লেন। খাঁটি ফরাসি সুন্দরী, তার ওপর বিপন্না। অনেক ভদ্রলোকবেশী লম্পট ঘুরঘুর করবে তার পেছনে কিন্তু প্রকৃত সাহায্য পাওয়া মুশকিল। সত্যি কষ্ট হয় তার কথা ভাবলে।
আচ্ছা তুমি তাঁর পাশে দাঁড়াতে পারো না? সরল বালিকার মতো কাদম্বরী বলেন।
জ্যোতি বউয়ের থুতনি ধরে নেড়ে দিয়ে বলেন, আচ্ছা, আমাকে ওরকম রূপসি বিধবার কাছে পাঠাতে তোমার একটুও ভয় করবে না? আমি যদি তার প্রেমে পড়ে যাই?
তা হলে আমাকে বিষ খেয়ে মরতে হবে, কাদম্বরী মুখ নিচু করে বলেন।
জ্যোতি শিউরে ওঠেন বালিকাবধূর মুখে এমন কথা শুনে, আর কোনওদিন ঠাট্টা করেও এরকম কথা বলবে না নতুনবউ, তা হলে আমি ভীষণ রাগ করব।
অজানা আশঙ্কায় স্বামীর বুকে মাথা গুঁজে দেন কাদম্বরী। জ্যোতির মনে হয় যেন মহীরূহের গায়ে লবঙ্গলতিকাটি।
ঘরে ঢুকতে ঢুকতে কচি দাম্পত্যের অন্তরঙ্গ দৃশ্যটি দেখে ফেলেন জ্ঞানদা। মনের কোনায় কোথায় যেন খচ করে বেঁধে তার।
বলেন, কী ব্যাপারটা কী, কখন রোদ উঠেছে, এখনও বিছানায় প্রেমালাপ। চলছে তোমাদের? নতুনবউয়ের তো বেশ রীতি, আর সবাই কাজে লেগে পড়েছে, তুমি বরের সোহাগের লোভে বিছানায় পড়ে আছ এখনও? জ্যোতিকেও বুঝি কাজ করতে দেবে না?
কাদম্বরী ধড়মড় করে উঠে বসেন, লজ্জায় কাঁটা হয়ে যান মেজোজায়ের বকুনি খেয়ে। কিন্তু জ্যোতি হাসিমুখেই আবাহন করেন জ্ঞানদাকে, এসো এসে বউঠান, আজ কার মুখ দেখে উঠেছি বলো তো, তোমার তোমার। মনটা ভাল ছিল না, এবার ভাল হয়ে যাবে।
কী কথা হচ্ছিল শুনি? জ্ঞানদা একটু নাক গলিয়ে ফেলেন, এই কচি বউকে নিয়ে কী এত আলাপচারি করে নতুন!
দেখো না বউঠান, কাদম্বরী ভয় দেখাচ্ছে যে আমি অন্য কোনও নারীর কাছে গেলে ও আত্মহত্যা করবে, তুমিই বিচার করো এ-কথা কি ওর বলা উচিত?
