কিন্তু মা ও ছেলে কেউই জানেন না চিঠির ভাষা ঠিক কীরকম হওয়া উচিত। জমিদারি সেরেস্তার মহানন্দ মুনশির শরণ নিয়ে রবি চিঠি রচনা করলেন। সারদাকে পড়ে শুনিয়ে চিঠি ডাকে দেওয়া হল।
মহর্ষি জবাবে লিখলেন, ভয়ের কিছু নেই, রাশিয়ানদের তিনিই তাড়িয়ে দেবেন। এতে সারদা আশ্বস্ত হলেন কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা যে, বালক রবীন্দ্রনাথ বাবাকে প্রথম চিঠি লিখে এবং জবাব পেয়ে উত্তেজিত হয়ে প্রায়ই মহানন্দের দপ্তরে হাজির হতে লাগলেন। রোজ তিনি বাবামশায়কে চিঠি পাঠাতে চান। মহানন্দবাবু বালকের আবদারে মাঝে মাঝে চিঠি লেখার ভান করেন ঠিকই, কিন্তু সে-চিঠি আর হিমালয়ে পৌঁছয় না। তখন রবি তাকে নিয়ে একটি ছড়া লিখে ফেললেন নিজের খাতায়,
মহানন্দ নামে এ কাছারিধামে
আছেন এক কর্মচারী,
ধরিয়া লেখনী লেখেন পত্রখানি
সদা ঘাড় হেঁট করি।…
হস্তেতে ব্যজনী ন্যস্ত,
মশা মাছি ব্যতিব্যস্ত
তাকিয়াতে দিয়ে ঠেস…
হেমেনের খুব ঘোড়ায় চড়ার শখ, তার একটা ঘোড়া বারবাড়ির আস্তাবলে বাঁধা থাকে। সেই অশ্ব বাড়ির অনেকের মনে পক্ষীরাজের স্বপ্ন উসকে দেয়। জ্যোতি আর কাদম্বরীর ঘরেও এমন এক স্বপ্নবোনা চলছিল।
কাদম্বরী আদুরে গলায় স্বামীকে বলেন, আমাকে ময়দানে হাওয়া খেতে নিয়ে চলোনা একদিন, তোমার সঙ্গে খোলা হাওয়ায় বেড়াতে যেতে ইচ্ছে করে খুব।
জ্যোতি ভয় পান, তোমাকে নিয়ে হাওয়া খেতে গেলে মা তোমার ওপর রাগ করবেন, অশান্তি হবে, না হলে আমার তো ইচ্ছে করে সেজদাদার ঘোড়ার পিঠে চড়িয়ে তোমাকে উড়িয়ে নিয়ে যাই। রূপকথার রাজকন্যে, দাঁড়াও না, একদিন ঠিক নিয়ে যাব।
কাদম্বরী ঠোঁট ফোলান, মেজোবউঠান যে স্টিমার পাড়ি দিয়ে ঘনঘন যাতায়াত করছেন, তখন তো ধন্য ধন্য কর। নিজের বউকে নিয়ে বাইরে বেরুতে এত ভয়?
সে যাচ্ছেন ঠিক, কিন্তু খাস কলকাতার বুকে হাওয়া খেতে তিনিও এখনও বেরোননি। আগে তিনি পথ দেখান, তারপর তুমি।
জ্যোতির কথায় অভিমান হয় কাদম্বরীর, কেন সবসময়ে তিনি আগে আর আমি পরে? তুমি ভেবেছ আমি আগে কিছু করতে পারি না? আসলে আমার সাহস আছে, তোমার নেই।
দমকা হাওয়ার মতো ঘরে ঢুকে পড়ে রূপকুমারী। সে জানলার বাইরে দাঁড়িয়ে কয়েকটা কথা শুনতে পেয়েছে। সে বলল, জ্যোতিদাদা, আমিও ঘোড়ায় চড়ব, নতুনবউঠানের সঙ্গে আমিও যাব হাওয়া খেতে।
এই রে পাগলিটা এসে গেছে, জ্যোতি বলে ওঠেন। তুই সবসময় আমার কাছে ঘুরঘুর করিস কেন রে? জানো নতুনবউ, যেখানে যাব, ও এসে পথে দাঁড়িয়ে সঙ্গে যাওয়ার বায়না ধরবে।
ও মুখ ফুটে বলতে পারে আর আমি মনের ইচ্ছে চেপে রাখি। কাদম্বরী বলেন, ও যেমন ছটফট করে বেড়ায় আমার হৃদয়টাও তেমনি ছটফটে। খাঁচায় থাকতে চায় না।
জ্যোতি বলেন, সেজদাদার ঘোড়াটা তো আচ্ছা জ্বালালে! কথায় বলে লোকে ঘোড়া দেখলে খোঁড়া হয়, আর তোমরা যে পক্ষীরাজের ডানা চাইছ! চলো, তোমাদের আমার নতুন নাটক পড়ে শোনাই।
জ্যোতি এখন যে নাটকটা লিখছেন তার নাম দিয়েছেন সরোজিনী। কাদম্বরী নাট্যরসে মজে যান, তাঁর মনে অপূর্ব আনন্দের সৃষ্টি হয়। কিন্তু রূপা কিছুক্ষণ পরেই কোথায় যেন চলে গেল।
আরও কিছুক্ষণ পরে বারবাড়িতে হইচই চেঁচামেচি শুনে জ্যোতি বাইরে বেরিয়ে এসে শুনলেন সেজদাদার ঘোড়ায় চড়ে রূপকুমারী উধাও হয়ে গেছে।
সারদার বারান্দায় এসে কাদম্বরী দেখলেন সেখানেও হুলুস্থুল কাণ্ড।
মানদা দাসী লাফাচ্ছে, আরও আশকারা দাও কামা, আরও মেয়ে মেয়ে করে মাথায় তোলো। কী দস্যি দজ্জাল বিটিরে বাবা! ওই বেটি তোমার মুণ্ডু ঘুরিয়ে দেবে।
সারদা ঠান্ডা থাকার চেষ্টা করেন, আঃ চুপ কর মানদা, গোল করিস না। আরে মেয়েটা তো মরে যাবে, ওই বিচ্ছু ঘোড়া নির্ঘাত পিঠ থেকে ফেলে দেবে ওকে, কেউ কি বাঁচাতে গেছে? যা, খবর নে।
কাদম্বরী বললেন, মা আপনার ছেলে তো দেখতে গেছেন, কিছু একটা ব্যবস্থা নিশ্চয় করবেন।
সারদা অকূলে কূল পান যেন, গেছে জ্যোতি? দেখো যদি শেষরক্ষা হয়। মনে মনে গৃহদেবতার নাম জপ করতে থাকেন তিনি।
বড় মেয়ে সৌদামিনী সারদাকে সাবধান করতে চান, মা, এবার তুমি রাশ টানো। হয় ওকে থামাও নয় নিজে থামো। মেয়েটা বড্ড অবাধ্য, তোমাকে। তিষ্ঠোতে দেবে না।
তাড়াও কত্তামা, ওকে এবার তাড়াও। মানদা আবার ফুঁসে ওঠে, আমরা কত কষ্ট করে চাট্টি ভাত খাচ্ছি আর ওকে তুমি আমাদের সবার মাথায় নেত্য করতে বসিয়ে দিলে।
এবার কাদম্বরী মানদাকে বকেন, আঃ মানদা, তোর কি কোনও আক্কেল নেই। বাচ্চা মেয়েটা না হয় না বুঝে একটা কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছে, তাই বলে তুই মায়ের মুখের ওপর এরকম কথা বলবি?
সারদাও জোর পান নতুনবউয়ের কথায়, মানদা তোর বড় বাড় বেড়েছে দেখছি আমি। যত অলক্ষুনে কথা বলিস। দূর হয়ে যা এখান থেকে। যতক্ষণ না মেয়েটা ভালয় ভালয় ফিরে আসে ততক্ষণ আমার সামনে আসবি না।
ঘণ্টাখানেক বাদে বহু কসরত করে দারোয়ান বেহারার দল রূপকুমারীকে ঘোড়াসহ ধরতে পারল। ঝোঁকের মাথায় ঘোড়ার পিঠে চেপে বসলেও ঘোড়সোয়ারির কোনও কিছুই তার জানা নেই, তাই ঘোড়া ছুটতেই নিজের বিপদ আঁচ করেছে রূপা কিন্তু তখন ঘোড়াই তার চালক। থামানোর কোনও উপায়ই সে জানে না। জ্যোতি চারদিকে লোক পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। রূপার আর্ত চিৎকারেও পেছন পেছন মজা দেখার অনেক লোক জড়ো হয়েছে। ভিড় থেকে নানারকম মন্তব্যও উড়ে আসছে রূপাকে লক্ষ্য করে।
