পরিবারে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। হেমেন্দ্রনাথ ভাইকে সামলাতে না পেরে সাহেব ডাক্তার ডেকে পাঠালেন।
ডাক্তারের হাত ঝাঁকুনি দিয়ে বীরেন বলতে থাকেন, আমার কলাবউ কই, কলাবউ?
হেমেন ধমক দিয়ে বলে ওঠেন, কী পাগলামো করছ বীরেন, ওই তো তোমার বউ প্রফুল্লময়ী, কলাবউ আবার কে?
বিয়ের আগে থেকেই বীরেন দিদিদের কাছে বায়না ধরেছিলেন কলাবউ বিয়ে করার। এখনও মাঝে মাঝে সেটা মনে পড়ে যায় বোধহয়। প্রফুল্লর ঘোমটা সরিয়ে ভাল করে মুখটা দেখে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেন বীরেন, যাঃ তুমি আমার কলাবউ না।
প্রফুল্লময়ী জোরে কেঁদে ওঠেন। দিদি এবং বড় জা নীপময়ী তাকে সরিয়ে নিয়ে যান। বড় শখ করে বোনের সঙ্গে দেওরের বিয়ে দিয়েছিলেন, এখন ওর কষ্ট চোখে দেখা যায় না।
ডাক্তারের পরামর্শে লুনাটিক অ্যাসাইলামে পাঠানো হল বীরেনকে। ঠাকুরবাড়ির পুরুষদের কম বেশি সকলেরই চন্দ্রদোষ আছে কিন্তু বীরেনই প্রথম ক্লিনিকালি লুনাটিক। বীরেনের জন্য শোকের ছায়া নেমে আসে সারা বাড়িতে।
এর ওপর হঠাৎই একদিন কলেরা হয়ে মাত্র আটাশ বছর বয়সে ও-বাড়ির গণেন্দ্র মারা গেলেন। লম্বা ফরসা উদ্যোগী দায়িত্ববান এই যুবকের মৃত্যুর জন্য কেউই তৈরি ছিলেন না। দুবাড়ির বিরোধের মধ্যে তিনি সেতুবন্ধন করেছিলেন, তাঁরই উদ্যোগে দুবাড়ির ছেলেরা মিলে নবনাটক করেছেন। চৈত্রমেলার আয়োজন করে সবাইকে মাতিয়ে রেখেছিলেন। বাড়ির সবাইকে একসুতোয় বাঁধার আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তার। এখন দেবেন ঠাকুরের স্নেহধন্য এই ভাইপো চলে যেতে পুরনো ফাটলটা যেন আরও বড় হাঁ করে গিলে খেতে আসে পরিবারটাকে। দেওয়ালের একদিকে গণেনের মৃত্যুর জন্য শোক। করেন সারদা, আর অন্যদিকে যোগমায়ার চোখের জল পড়ে বীরেনের কথা ভেবে। কত্তাও এখন প্রবাসে, সারদার মনে হয়, এতবড় সংসারের সব ভার তিনি আর বইতে পারছেন না। একসঙ্গে থাকলে তাও তো দুই জা মিলে এই শোক ভাগ করে নিতে পারতেন!
মহর্ষি এখন আর কলকাতার বাড়িতে থাকতে ভালবাসেন না। আগে দুর্গাপূজা এড়ানোর জন্য ওইসময়ে বেড়াতে যেতেন, আজকাল প্রায় সারাবছরই পাহাড়ে পাহাড়ে কাটান। দ্বারকানাথের মৃত্যুর পর বিশাল দেনার দায় তার ওপর চেপেছিল। এক পাওনাদার দেনার দায়ে দেবেনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করিয়েছিল। কিন্তু নানারকম ব্যয়সংকোচ ও কৃচ্ছসাধনের মধ্য দিয়ে কিছুদিনের মধ্যে সেই দুর্দিন কাটিয়ে উঠেছেন দেবেন।
ওইসময়ের একটা মজার ঘটনার কথা সারদার মনে পড়ে। ঠাকুরদের সেই দুর্দিনে একবার শোভাবাজার রাজবাড়িতে গানের জলসায় নিমন্ত্রণ এল দেবেনের কাছে। সব ধনী অভিজাত পুরুষেরা উৎসুক হয়ে আছেন, অভাবের দিনে দ্বারকানাথের ছেলে কী পোশাক কেমন অলংকার পরে আসবেন। সভা গমগম করছে হিরে জহরতের গয়না, জরি কিংখাবের পোশাক পরা বাবুদের ঝলকানিতে, দেবেন প্রবেশ করতেই সবাই স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইলেন তাঁর দিকে। তার পরনে সাদা ধবধবে আচকান-জোড়া, সাদা পাগড়ি, কোথাও সোনা রুপো জরি কিংখাবের লেশমাত্র নেই। তাকিয়ায় গা এলিয়ে বসে পা দুটো একটু বাড়িয়ে রাখলেন দেবেন, পায়ে সাদা মখমলের জুতোয় বিরাট দুটো মুক্তো বসানো। শ বাজারের রাজামশায় ছিলেন তার বন্ধু। ছেলে ছোকরাদের ইশারা করে তিনি নাকি বলেছিলেন, দেখ, তোরা দেখ… একেই বলে বড়লোক। আমরা যা গলায় মাথায় ঝুলিয়েছি–ইনি তা পায়ে রেখেছেন।
দেবেন্দ্র হিমালয়ে ঘুরে বেড়ান প্রিয় দু-একটি শিষ্য নিয়ে। ঘরে বসে দুশ্চিন্তায় অধীর হয়ে ওঠেন সারদা। একদিন রবিকে অন্তঃপুরে ডেকে পাঠালেন তিনি। যে কোনও সুযোগে অন্দরে যেতে পারলেই খুশিতে মেতে ওঠেন রবি, নীরস চাকরমহলের কঠিন অনুশাসন থেকে সাময়িক মুক্তির আশায়। মা এমনিতে ডাকখোঁজ বেশি করেন না, না ডাকলে ভেতরে ঢোকাও বারণ বাচ্চা ছেলেদের, রবির মন তবু উৎসুক হয়ে থাকে সুদূরচারী জননীর এমন একটি ডাকের অপেক্ষায়।
রবি আসতেই সারদা তাকে হুকুম দেন, কত্তামশায় অনেকদিন হল পাহাড়ে গেছেন, তার কোনও খবর পাচ্ছিনে, আমার হয়ে তাকে একটি চিঠি লিখে দে তো বাবা।
রবির মন অজানা পুলকে নেচে ওঠে, দাদাদের না ডেকে তাকেই যে মা ডেকেছেন এই কাজের জন্য এ-কথা ভেবে তার বুক ভরে যায়। তাড়াতাড়ি ছুটে কাগজ কলম নিয়ে মায়ের চৌকির পাশে বসে পড়ে বলেন, কী লিখতে হবে মা?
আসলে এবার সারদা অনেক ভেবেচিন্তেই রবিকে ডেকেছেন। এর পেছনে একটা কাহিনি আছে। এক হিতৈষিণী আত্মীয়া দুদিন আগে সারদাকে জানিয়েছেন যে রাশিয়া ভারত আক্রমণ করেছে। কোথায় কোন রাজ্যে সেই যুদ্ধ লেগেছে সারদা জানেন না, আত্মীয়াও বলতে পারেননি। হেমেন ও জ্যোতিকে জিজ্ঞেস করেও জানতে পারেননি। তাঁরা এরকম কোনও যুদ্ধের খবর শোনেননি। কিন্তু খবর না পেয়ে দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকা স্বামীর জন্য সারদার উদ্বেগ তাতে বেড়েছে বই কমেনি। আবার জ্যোতি জানিয়েছেন শ্রাবণের সোমপ্রকাশ পত্রিকায় একটি সংবাদে লিখেছে, বাবু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর সংসার ত্যাগ করিয়া হিমালয়ের নিকটস্থ ধর্মশালায় জীবন যাপন করিবার মানস করিয়াছেন। জ্যোতি যদিও বলেছে এ-সব গুজবে কান না দিতে, সারদা সন্দেহ নিরসনের জন্য কত্তামশায়কে পত্র দিতে চান। জ্যোতি হেমেনরা তাঁর চিন্তাকে গুরুত্ব না দেওয়ায় তিনি রবিকে ডেকেছেন।
