আহা কত ভালবাসা জানা আছে, এই তো সেদিন বলছিলে বোম্বাইতে মেজোদাদার কাছে পাঠিয়ে দেবে আমাকে। আর ভাল লাগছে না বুঝি?
স্বর্ণ, স্বর্ণ, সে দু-তিন বছর দেখতে দেখতে কেটে যাবে। তুমি তো সেখানে আরামে থাকবে, আমিই একা একা কষ্ট পাব। কিন্তু তুমি যখন দু’বছর পর ঘষে মেজে ঝকঝকে কেতাদুরস্ত হয়ে ফিরে আসবে, সেদিনটা ভেবে গর্বে আমার বুক ভরে যাচ্ছে।
মেজোবউঠানের সঙ্গে বসে বসে এ-সব ষড়যন্ত্র করেছ তাইনা? স্বর্ণ বলেন। কিন্তু তোমরা যা ভাবছ তা কী করে হবে? মেয়েকে সেখানে দেখাশোনা করতে হবে, অত পড়াশোনা কখন করব?
সেটা তুমি মেজোবউঠানের ওপর ছেড়ে দাও স্বর্ণ, তিনি যখন তোমার দায়িত্ব নিয়েছেন তখন আমি নিশ্চিন্ত, সব ব্যবস্থা তিনি ঠিকঠাক করবেন, জানকীনাথ আশ্বস্ত করেন।
মেজোবউঠানকে তোমার খুব পছন্দ তাই না, তুমি চাও আমি অবিকল তাঁর মতো হই। স্বর্ণ বললেন একটু অভিমানের স্বরে, আমার লেখার টেবিলে আমি যে সবার চেয়ে আলাদা তা বুঝি তোমার চোখে পড়ে না?
জানকী মেয়ে সমেত পঞ্চদশী স্ত্রীকে কাছে টেনে হেসে ওঠেন, স্বর্ণ তুমি বড় ছেলেমানুষ। বাবামশায়ের আর দাদাদের স্নেহের পুতলি হয়েই আছ, এখনও বড় হলে না। অবশ্য সেটাই তোমার দুর্নিবার আকর্ষণ।
তা হলে দূরে পাঠাচ্ছ কেন, আমার যে তোমাকে ছেড়ে থাকতে একদম ভাল লাগে না, স্বর্ণ ঠোঁট ফোলান।
জানকী বলেন, তুমি এখন খনি থেকে তোলা কয়লা-চাপা হিরে, কিন্তু বোম্বাইয়ে মেজদাদা মেজোবউঠানের শিক্ষায় ডায়মন্ড কাটিঙে তুমি হয়ে উঠবে দুষ্প্রাপ্য কোহিনূর।
আর সেই কোহিনূর শুধু তোমার মুকুটে শোভা পাবে? স্বর্ণ হেসে বলেন, সেটি হচ্ছে না মশায়, তখন দেখবে আমি প্রেমের স্বয়ম্বর ডাকব।
আর আমি হব তোমার স্বয়ম্বরের দারোয়ান। হা হা করে হেসে ওঠেন জানকী। তার হাসির আওয়াজে ভয় পেয়ে হিরন্ময়ী কাঁদতে শুরু করে। কান্না কিছুতে থামাতে না পেরে শেষে দাইকে ডেকে বাচ্চা হস্তান্তর করেন নতুন বাবা-মা। সন্ধ্যার গঙ্গার হাওয়ায় পাশাপাশি ঘনিষ্ঠ হয়ে আরও কিছুক্ষণ ঘাটে বসে থাকেন স্বর্ণকুমারী ও জানকীনাথ, দূরে বয়ে যাওয়া নৌকোয় এক এক করে রেড়ির তেলের কুপির আলো জ্বলে ওঠে।
অক্টোবরে হিরন্ময়ীর নামকরণের রেশ কাটতে না কাটতেই নভেম্বরে বর্ণকুমারীর বিয়ে লাগল। এবার মেডিকেল কলেজের একটি মেধাবী ছাত্রকে জামাই করতে পেরে দেবেন ঠাকুর বেশ খুশি। সতীশচন্দ্র ব্রাহ্মণ সন্তান, বাড়ি গোস্বামী-দুর্গাপুরে। পিরালি বংশে বিয়ে করায় ইনিও ত্যাজ্যপুত্র হয়ে দেবেন ঠাকুরের ছত্রছায়ায় আশ্রয় নিলেন। বিয়ের পর থেকেই তার মেডিকেল কলেজের খরচ জোগানো হতে থাকল ঠাকুরবাড়ি থেকে। এমনকী বিলেতে পাঠিয়ে ডিগ্রি অর্জন করানোর পরিকল্পনা ভেবে ফেললেন মহর্ষি। নববিবাহিত বর্ণ ও সতীশের জন্য ঠাকুরবাড়িতে একটি আলো হাওয়াযুক্ত বড় ঘর বরাদ্দ হল।
এইসময়, ১৮৭০ সালের এক আশ্চর্য দিনে দেবেন্দ্রনাথের স্নানঘরে কলের জল লাগানো হল। তখন কলকাতার বাড়িতে বাড়িতে পাইপের সাহায্যে পলতা থেকে হুগলি নদীর পরিশ্রুত জল পাঠানো শুরু হয়েছে। সে এক বিস্ময়, তেতলার ওপরে এত অনায়াসে কল খুললেই জল পাওয়া যাচ্ছে দেখে বাড়ির ছোটবড় সকলেই মুগ্ধ।
বালক রবির বড় ইচ্ছে একদিন বাবামশায়ের ওই অবিরল জলধারায় স্নান করেন। কিন্তু তিনি বাড়ি থাকলে তা সম্ভব নয়, চাকরদের নজর এড়িয়ে কী করে চান করা যায় তার মতলব করতে থাকেন রবি ও সমবয়সি ভাগনে সত্য।
একদিন কুস্তির আসরের পর দুই বালক সবার নজর এড়িয়ে গুটিগুটি ঢুকে পড়ল বাবামশায়ের চানঘরে। কাদামাটি মাখা ঘোট দেহদুটি জলধারার নীচে পেতে দিয়ে কী অনির্বচনীয় আনন্দ! কিছুক্ষণের মধ্যেই শ্যামা চাকর এসে হাজির। দুই অপরাধীকে নিয়ে যাওয়া হল সারদার দরবারে।
সারদাদেবী কিছুক্ষণ বালকদের আপাদমস্তক দেখে বলেন, কেন গেছিলি কত্তার চানঘরে?
কাঁচুমাচু বালকরা উত্তর দেন, বড় কাদা লেগে গেছিল কুস্তি করতে গিয়ে। ওরা জানে মা কুস্তি পছন্দ করেন না।
সারদা যথারীতি বললেন, কী দরকার ও-সব বাজে খেলার? গায়ে ময়লা লাগে। একে তো শ্যামলা ছেলে, তায় আবার কাদা মেখে ভূত সাজছিস কেন রবি?
কী করব, হেমদাদা গণাদাদারা যে ডেকে নিয়ে যান, আমার কি ভাল লাগে নাকি তেল মেখে কাদা মেখে কুস্তি করতে? রবি জবাব দেন সাহস করে।
সারদাদেবী মানদা দাসীকে ডেকে বলেন, ওরে, আমার সামনে সর-ময়দা দিয়ে ছেলেদুটোকে আচ্ছা করে দলাইমলাই করার ব্যবস্থা কর। রোজ মাখাবি। আমার এই ছোট ছেলেটাই ময়লা, দেখি রং ফেরে কিনা!
রবির কাছে এ এক নতুন শাস্তি। কিন্তু ছাড় পাওয়ার কোনও উপায় নেই। মায়ের সামনে চলল ছেলেদের কষে রূপটান মাখানোর আসর।
একদিন হঠাৎ সারদার কাছে ছুটে এসে কাঁদতে শুরু করেন প্রফুল্লময়ী। মা, মা গো, আপনার ছেলের পাগলামি আর সামলাতে পারছি না। দেখুন আমাকে কীরকম মেরেছে! ঘরের জিনিস সব ভেঙে ফেলছে।
সারদা বিচলিত হয়ে দাসীদের ডাকেন। দেখ তো হেমেন আছে কি না, বীরেনের পাগলামি এত বেড়ে গেছে বউ তুমি আগে বলনি কেন, তা হলে তোমাকে মার খেতে হত না।
শান্ত দুঃখী এই বউমাটির জন্য সারদার মায়া হয়। বিয়ের পর থেকে বীরেনের পাগলামি ক্রমশ বাড়ছে। সারানোর সব চেষ্টাই বিফলে গেছে। এত দুঃখের মধ্যেও একটাই ভাল ঘটনা ঘটেছে প্রফুল্লময়ীর জীবনে, সম্প্রতি তার একটি ছেলে হয়েছে। দেবেন্দ্র নাতির নাম দিয়েছেন বলেন্দ্রনাথ। শিশু বলেন্দ্র তার বাবার পাগলামি দেখে খিলখিল করে হাসে।
