হায়, রাহুগ্রস্ত চাঁদকে কে বাঁচাবে! অনালোকিত কাদম্বরীর গ্রাস থেকে প্রিয় দেওরটিকে কী করে রক্ষা করবেন? চাদে যে গ্রহণ লেগেছে। গভীর বিষাদে মৌন হয়ে যান জ্ঞানদা।
০৫. স্বর্ণকুমারীর বোম্বাইবাস
স্বর্ণকুমারীর বয়স এখন পনেরো। ঠাকুরবাড়ির বিখ্যাত রংরূপের সঙ্গে তেজি চালচলনে তাকে যেন আগুনের হলকা মনে হয়। জ্যোতিদাদার সঙ্গে দু একটি সভায় গিয়ে কবিতাপাঠ করেছেন ইতিমধ্যেই আর তাতেই যেন হইচই পড়ে গেছে কলকাতার তরুণ কাব্যপ্রেমী মহলে। ছিপছিপে কনকবর্ণা তরুণী কবিটিকে একটু দেখার জন্য ভিড় জমে যায় সভায় সভায়।
শোভাবাজারের এক বনেদি বাড়ির কবিতার আসরে স্বর্ণ সেদিন এলেন কমলা রঙের পাটোলা সিল্ক পরে, সঙ্গে তিনলহরী মুক্তোর হার। সবচেয়ে চোখে পড়ে মাথার ঘোট্ট টুপি ও কপালে চুলের গুচ্ছে জড়ানো মুক্তোর টায়রা। তাকে দেখেই গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। স্বর্ণ নিজেও শুনতে পান নানারকম ফিসফাস আলোচনা।
কেউ বলছে, আরে বাবা, মেয়ের সাজ দেখব না পদ্য শুনব! শুনেছি ইনি নাকি একটি কন্যার জননী। আবার কবিতাও লেখেন।
উত্তরে আর-একজন বলে, আমি অবশ্য বিশ্বাস করি না এ-সব পদ্য ওই সাজুনি মেয়ের লেখা, নিশ্চয় দাদারা লিখে দেয় বোনের নামে। মেয়েদের আবার সাহিত্যচর্চা! কলি কালে কত কী দেখব।
প্রথমজন বলে, তালে বোধহয় রূপের জোরে লেখা ছাপাচ্ছে, সম্পাদকেরা অমন চেহারা দেখেই কুপোকাৎ।
আরে সম্পাদকেরা তো সব ঠাকুরবাড়ির প্রসাদ পাওয়ার জন্য বসে আছে। বিদ্যেসাগর ফিমেল এডুকেশন করেছেন, তাই দেখে দেবেনঠাকুর মেয়েকে সাহিত্যিক বানাচ্ছেন। ভাবছেন তরু দত্ত, জেন অস্টেন যদি পারে, তার ঘরের মেয়েই বা পারবে না কেন!
স্বর্ণর এ-সব শুনে কান্না পায়, তার এত সাধনার কি কোনও দাম নেই এদের কাছে? অন্য সবাই যখন তাঁকে ধন্য ধন্য করছে তখনও এ-সব নিন্দুকদের কুকথা ভুলতে পারেন না তিনি।
সভার মাঝখানে একবার জ্যোতিদাদার হাত চেপে ধরে বলেন, এখানে অনেকে বোধহয় আমাকে পছন্দ করছেন না, চলো আমরা ফিরে যাই।
জ্যোতি অবাক হন, সেকী রে, সবাই যে তোর কবিতার কথাই বলছে। এ-সব বাজে কথা কে তোর মাথায় ঢোকাল?
সবাই হাঁ হাঁ করে জ্যোতিকে সমর্থন করে। এমনকী যারা এতক্ষণ বাজে কথা বলছিল তারাও সামনে এসে স্বর্ণকুমারীকে বলে, সেকী আপনি চলে গেলে এই সভা যে অন্ধকার হয়ে যাবে! বিলেতের যেমন জর্জ এলিয়ট আছেন, আমাদের তেমন আপনি। অন্য মহিলারা যাঁরা বামাবোধিনীর পাতায় লেখার চেষ্টা করেন তারা কি লেখক নাকি?
লোকের ভণ্ডামি সইতে পারেন না স্বর্ণ। প্রতিবাদ করে বলেন, ওভাবে বলবেন না, ওঁরা অনেক অসুবিধের মধ্যে দিয়ে চেষ্টা করছেন, অনেকেই ভাল লেখেন। আমি তো ওঁদেরই মতো, সবে শুরু করেছি।
একজন তাচ্ছিল্য করে বলে ওঠে, আহা কীসে আর কীসে…
এবার জ্যোতি ঠাকুর বিরক্তি প্রকাশ করলে আসরের কর্তাব্যক্তিরা গোলমেলে লোকদের কয়েকজনকে সরিয়ে নিয়ে যান। আবার কবিতাপাঠ শুরু হয়।
.
ঠাকুরবাড়িতে ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে স্বর্ণকুমারী ও জানকীনাথের মেয়ের নামকরণ অনুষ্ঠান আর বর্ণকুমারীর বিয়ের তোড়জোড়। পরপর দুটি উৎসব তাই সবার মনেই সাজো সাজো রব। দেবেন ঠাকুর প্রত্যেক বাচ্চার জন্মের ছমাস থেকে একবছরের মধ্যে সুবিধেমতো দিনে মুখেভাত ও নামকরণ করার নিয়ম করেছেন। তিনি হিন্দুদের মতো অন্নপ্রাশন বলেন না, কিন্তু সেরেস্তার কর্মচারীরা ওই অন্নপ্রাশন বলেই হিসেব লেখেন।
স্বর্ণর মেয়ের নামকরণ অনুষ্ঠানটি পেনেটির বাগানবাড়িতে বেশ ধুমধাম করে সম্পন্ন হল। রবির জন্মের পর থেকেই এ-বাড়ির অন্নপ্রাশন ব্রাহ্মমতে হয়ে আসছে। এ ব্যাপারে দেবেন ঠাকুর একটি সুন্দর প্রথা চালু করেছেন। নামকরণ উপলক্ষে একটি পিঁড়িতে শিশুর নাম লেখা হল হিরন্ময়ী। তার চারদিকে আলপনা এঁকে বাচ্চারা মহর্ষির নির্দেশমতো পিঁড়ির চারদিকে মোমবাতি লাগিয়ে দিল। নামের চারদিকে মোমের আলো জ্বলে ওঠার পর স্বর্ণর মনে হয় তার মেয়ের নামের ওপর যেন বাবামশায়ের আশীর্বাদ ঝরে পড়ছে।
জানকীনাথের অবশ্য একটু মনখারাপ তার বাবামায়ের অনুপস্থিতির কথা ভেবে। তার মনে হয়, স্বর্ণর মতো পুত্রবধু পাওয়া যে কত ভাগ্যের ব্যাপার তা তো আমার বাবামশায় বুঝলেন না, এখন কি নাতনিকেও দেখতে আসবেন না!
গোঁড়া হিন্দুরা না এলেও বাড়িতে লোকজন অনেক। দেবেন ঠাকুর যথারীতি সারদার হাত দিয়ে নাতনির জন্য সোনার বিছেহার আশীর্বাদী পাঠিয়েছেন। জয়পুরি সাদা পাথরের থালা বাটি গেলাসের পারিবারিক উপহার তো আছেই। মামা-মাসিরা মেয়ের গা ভরে গয়না দিলেন আর জড়ো হয়েছে মেয়ের জামা সেলাই করার জন্য রাশিকৃত রেশমি ছিট কাপড়। সবাই হিরণকে কোলে নিয়ে মাতামাতি করছে, এত সুন্দরী মেয়ে হয়েছে বলে।
সব অতিথি চলে গেলে বিকেলের মরা আলোয় স্বর্ণ ও জানকীনাথ ঘাটে এসে বসলেন, জানকীর কোলে হিরন্ময়ী।
আমি যে আজ কত খুশি তা তুমি ভাবতেও পারছ না স্বর্ণ, গর্বিত বাবা জানকীনাথ বললেন। শুধু বাবামশায়ের অভাবটা মনে আসছে এত আনন্দের মধ্যেও।
স্বর্ণ আদুরে গলায় বলে ওঠেন, তুমি কি এখন শুধু মেয়েকেই ভালবাসবে, আমার আদর ফুরিয়ে গেল!
স্বর্ণ, তোমার জন্য আমি জননী জন্মভূমি ছেড়েছি, এখন যদি বলো মেয়েকে ছাড়তে, তা পারব না। কৌতুক করে জানকী বলেন, অত পরীক্ষা নিয়ো না সখী।
