জ্ঞানদা জানেন, তিনি এই রচনার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছেন, তার বিদগ্ধ সান্নিধ্যেই জ্যোতির উদ্ভাস। কিন্তু সে-কথা প্রকাশ্যে বলার নয়।
যদুনাথের হাসিঠাট্টায় উত্ত্যক্ত হয়ে সারদাপ্রসাদ বলেন, কেন জ্বালাচ্ছ ভায়রা, তুমি কি জানো না, সদ্যবিবাহিত তরুণ কবির মনে যে শকুন্তলার ছবি ফুটে উঠছে সে আমাদের কাদম্বরী।
লাজুকমুখে জ্যোতি জানালেন এরকম বেরসিকদের সামনে তিনি কাব্যপাঠ করতে চান না। ভাইকে লজ্জারুণ দেখে রাশভারী হেমেন উঠে যান। যদু তখন হাত ঘুরিয়ে নেচে নেচে জ্যোতিকে কাদম্বরীর নাম ধরে খ্যাপাতে থাকেন। জ্ঞানদা ভীষণ বিরক্ত বোধ করেন, মনে হয় কাদম্বরী এ যাত্রায় ওঁদের সঙ্গী না হলেও তিনিই যেন আসরের মধ্যমণি।
জ্ঞানদা যেখানে যান সেখানে সাধারণত তিনিই রানিমৌমাছি। তাকে ঘিরে দিশি বিদেশি পুরুষেরা বিস্মিত হন, স্তুতি করেন। সত্যেনের বন্ধু ম্যাকগ্রেগর সাহেব কতবার বোম্বাই ও আমেদাবাদের পার্টিতে সমবেত বহু মহিলার মধ্য থেকে তাঁকেই বেছে নিয়ে মুগ্ধতা জানিয়েছেন। নাচের আসরে তাঁকে ছাড়া আর কারও সঙ্গেই ডান্স করতে চান না ম্যাকগ্রেগর। সত্যেন স্বয়ং তাকে নিয়ে কত গর্ব করেন। জ্যোতিও তাকে মাথায় করে রাখে। কিন্তু এখন, এই গঙ্গাতীরের বাগানবাড়িতে হঠাৎ মনে হয়, এখানে তিনি প্রধান আকর্ষণ নন, অন্য কেউ। প্রিয়জনেরা সবাই তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য ঘিরে আছেন, জ্যোতিও সেজন্যই এখানে একা এসেছেন, নতুনবউকে আনেননি। কিন্তু নতুনঠাকুরপোর মন পড়ে আছে কাদম্বরীর আঁচলেই।
জ্ঞানদা এ-সবের অনেক ঊর্ধ্বে। তাকে অনেক দূর যেতে হবে। এসব কথাবার্তা তার অসহ্য লাগে, এই বিচ্ছিরি আসর ছেড়ে তিনি ঘাটের অবারিত সৌন্দর্যের দিকে পা বাড়ান।
জ্যোতি দেখলেন গোধূলি আলোয় রহস্যময়ী নারীর মতো ধীরে ধীরে নদীর জলে পা ভেজাতে নেমে যাচ্ছেন জ্ঞানদানন্দিনী। মুহূর্তের জন্য তার ভ্রম হয়, এ নারী কে, মেজোবউঠান না তার নাটকের শকুন্তলা! জলে নেমে এইবার বোধহয় তাঁর আংটি খোয়া যাবে।
কিছুক্ষণ পর জ্যোতিও জলের ধারে নেমে গেলেন। মেজোবউঠানের পিঠে হাত রেখে বললেন, চলো ঘরে বসে গান-বাজনা করা যাক। এখানে ঠান্ডা বাতাস লেগে যাবে।
জ্ঞানদা জ্যোতির হাত ধরে বললেন, চলো নতুন, এখানে আর ভাল লাগছে না, জোড়াসাঁকো ফিরে যাই চলো।
জ্যোতিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। এখন যে ঘরেই তার পিছুটান।
এর অল্পদিন পরেই স্টিমারে বোম্বাই ফিরে গেলেন সদ্য সন্তানহারা জ্ঞানদা। বাড়ির দুই জামাই সারদাপ্রসাদ ও জানকীনাথ সে-যাত্রায় তার সঙ্গী হলেন।
.
পশ্চিমে বসেও জোড়াসাঁকোর সব খবর পান জ্ঞানদা। জ্যোতি বেনামে কিঞ্চিৎ জলযোগ নামে একটি প্রহসন লিখেছেন। আশ্চর্যের ব্যাপার এই নাটকে ব্রাহ্মিকাদের স্ত্রীস্বাধীনতাকে কটাক্ষ করা হয়েছে এবং কলকাতার বিভিন্ন পত্রিকায় তা নিয়ে যথেষ্ট বাদানুবাদ শুরু হয়ে গেছে।
ক্ষুব্ধ সত্যেন এসে জ্ঞানদাকে ধর্মতত্ত্ব পত্রিকার রিভিউ পড়ে শোনান, আমরা শুনিয়া যারপরনাই দুঃখিত হইলাম যে কিঞ্চিৎ জলযোগ” নামক একখানি নাটক সম্প্রতি প্রকাশিত হইয়াছে। এই পুস্তকে ভারতাশ্রম, ব্ৰহ্মমন্দির, প্রচারকগণকে বিলক্ষণ গালি দেওয়া হইয়াছে, ব্রাহ্মিকাদিগকেও ইহার মধ্যে আনিয়া গ্রন্থকর্তা যথোচিত আপনার নীচতা ও বিকৃত স্বভাবের পরিচয় দিয়াছেন। আমরা এ কথা শুনিয়া অবাক হইলাম যে উক্ত গ্রন্থকর্তা কলিকাতা ব্রাহ্মসমাজের ভক্তিভাজন প্রধান আচার্যের পুত্র।
জ্ঞানদাও খুব বিরক্ত হন, আমাদের নতুনঠাকুরপো কী করে এরকম নারীবিরোধী নাটক লিখতে পারেন, মেয়েপুরুষ একসঙ্গে প্রার্থনাসভায় বসছে বলে ব্যঙ্গ করতে পারেন, আমি ভেবে পাচ্ছি না। শ্যাম গাঙ্গুলির মেয়েকে বিয়ে করে এত অধঃপতন! ছি ছি!
আবার বঙ্কিমচন্দ্র কেমন তাতে ধুনো দিয়েছেন দেখো, সত্যেন বলেন, বঙ্গদর্শনে কত প্রশংসা বেরিয়েছে। রাজা রাধাকান্ত দেব ডেকে নিয়ে তার নাটমন্দিরে মঞ্চস্থ করিয়েছেন। মধুসূদনের একেই কি বলে সভ্যতা আর কিঞ্চিৎ জলযোগ একসঙ্গে অভিনীত হয়েছে শনিবার।
জ্যোতি কেন রক্ষণশীলদের দলে গিয়ে ভিড়ল বলো তো? জ্ঞানদা অবাক হন, আমার তো মনে হয় নতুনবউ ওর মাথাটা খাচ্ছে। এইজন্যই শিক্ষিত মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। বাবামশায় আপত্তি করলেন, এখন বুঝুন তিনি, জ্যোতি তো তার বিরুদ্ধেই কলম ধরেছে।
জ্যোতিটা একটু ওরকমই, সত্যেন বললেন, জ্ঞেনু তোমার মনে নেই আমরা মেয়েপুরুষ মিলে গাড়ি করে ময়দানে হাওয়া খেতে বেরলে জ্যোতির কেমন অস্বস্তি হত, তোমাকে গাড়ির পরদা তুলতে দিত না। তারপর অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে পরদা তোলা গেল তো মেয়েদের জন্য ঢাকা গাড়ির বায়না। তুমি এখানে এমন ভোলা গাড়িতে ঘুরছ দেখলে জ্যোতির বোধহয় লজ্জায় মাথা কাটা যাবে। আর নিজের বউকে বোধহয় ঘরবন্দি করে রাখবে মা দিদিমার যুগের মতো।
তুমি ওকে এখানে ডেকে পাঠাও। আমাদের সঙ্গে থাকলে ওর মনের ধোঁয়াশা কেটে যাবে। আমরা মেয়েরা কত সাহস করে এগিয়ে যাচ্ছি আর ওর মতো প্রতিভাবান ছেলে এমন পিছিয়ে থাকবে কেন?
এখন কি আর ওকে একলা পাবে, এখন ওকে ডাকলে নতুনবউকেও বলতে হবে। সেটা তোমার ভাল লাগবে কি বউ? জ্ঞানদা কাদম্বরীকে কতখানি অপছন্দ করেন সত্যেন সেটা বিলক্ষণ জানেন।
