‘… কতদিন হইল আমরা বিচ্ছিন্ন হইয়াছি। বোধ হইতেছে যেন অনেক দিন– অনেক মাস–…
…আমার এখন কেমন কিছুই ভাল লাগে না– আমি আপনার প্রতি বিরক্ত –এখানকার লোকজনের উপর বিরক্ত কাহারও সঙ্গে মিশিতে ইচ্ছা হয় না। ইংরাজদের সঙ্গে মিলিবার স্থান Gymkhana, Band Stand প্রভৃতি আছে কিন্তু সেখানে যদি যাই, অনিচ্ছার সহিত যাই। আর বিবিদের সেই একরকম কৃত্রিমতা আমার ভাল লাগে না। আমার এখন ক্রমশই প্রতীতি জন্মিতেছে যেন ইংরাজদের সঙ্গে আমাদের যে জাতীয় প্রভেদ তাহা ভাঙ্গিবার নহে। যাহা কিছু মিল হয় মৌখিকমাত্র। ইংলণ্ডে আমার মত একরকম ছিল। এখানে উলটিয়া যাইতেছে’।
.
আশ্বিনের এক রাতে জ্ঞানদার ব্যথা উঠল। সারদা খবর পেয়ে দাইকে ডেকে পাঠালেন। রাতে আসার জন্য দাই একটু টাকা বেশি চাইলেও শেষে আট টাকায় রাজি করানো গেল। আতুড়ঘর উঠোনের এককোণে। নাড়ি কেটে দাই আতুড়ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল শিশুটিকে কোলে নিয়ে, পুত্রসন্তান দেখে মেয়েরা শঙ্খ বাজিয়ে উলুধ্বনি করে নবজাতককে স্বাগত জানালেন। নাতির মুখ দেখে খুশি হয়ে সারদা একটি নতুন ধনেখালি শাড়ি ও প্রচুর মিষ্টি দিয়ে দাই-বিদায় করলেন।
পরদিন ভোরেই দুধমা ও ধাইমা ডেকে আনা হল। ঠাকুরবাড়িতে প্রায়ই শিশু জন্মায় বলে বেশ কয়েকজন বাঁধা দুধমা ও ধাইমা আছে, তারাই পালা করে সামলে দেয়। কিন্তু এবার একটা গণ্ডগোল হল। নবজাতক দুধমায়ের স্তন্যপান করতে করতে তীব্র স্বরে কেঁদে উঠল।
জ্ঞানদা অস্থির হয়ে পড়েন, বাচ্চা কাঁদে কেন? পেটব্যথা নাকি অন্য কিছু? তিনি ধাইয়ের কোল থেকে নিজের কোলে নিয়ে বাচ্চাকে থামাতে চেষ্টা করলেও শিশুর কান্না থামে না। সাহেব ডাক্তারের ওষুধ পড়ল, তাও বাচ্চা নেতিয়ে পড়ছে কেন? দুদিন কান্নার পর কেউ কিছু বোঝার আগেই শিশুটি মারা গেল। প্রথম সন্তানের মৃতদেহ কোলে নিয়ে সারারাত বসে রইলেন জ্ঞানদা। তার চোখের জল যেন শুকিয়ে পাথর হয়ে গেছে।
কয়েকদিন পর সত্যেনের চিঠি এল,
‘প্রিয়তমা জ্ঞানদা,
১১ই অক্টোবর জানকীর পত্রে দেখিলাম তোমার একটি পুত্রসন্তান জন্মিয়াছে– আজ তোমার তেরই-এর পত্রে তাহার মৃত্যুসংবাদ পাইলাম। ইহাতে আর কাহার দোষও-তোমারই কি দোষ, ডাক্তারদেরই কি দোষ। জন্মমৃত্যুর উপর আমাদের ত হাত নাই– আমরা নিয়মমত থাকিবার চেষ্টা করিতে পারি, তাহাই কৰ্ত্তব্য। এক্ষণে তোমার শরীরে বল পাইলেই আসিতে পার– দুই এক মাস না গেলে হয়ত বল পাইবে না। তুমি যেমন যেমন থাক আমাকে লিখিবে ও তুমি বেশ ভাল হইলে তোমার আসিবার কোনরূপ ব্যবস্থা করা যাইবে।
শোকার্ত জ্ঞানদাকে কিছুদিনের জন্য পেনেটির বাগানবাড়িতে নিয়ে আসা হল। জ্যোতি, সারদাপ্রসাদ, হেমেন, সৌদামিনীরা তার সঙ্গী হয়েছেন। গঙ্গার সংস্পর্শে তার মন যদি কিছুটা আরাম পায়। মৃত সন্তানের জন্য তার প্রথম অশ্রুপাত ঘটল এখানেই।
এই শোকের সময় জ্যোতি তাঁকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন। মেজোবউঠানকে সঙ্গ দেবেন বলে কাদম্বরীকেও সঙ্গে আনেননি এবার।
গঙ্গার ঘাটে বসে বসে ওঁদের বেশি সময় কাটে। ওপারে কোন্নগরের বাগানে ঘাঁটি গেড়েছেন ও-বাড়ির গুণেন্দ্ররা। বাড়ি ভাগাভাগির পরেও গুনো আর জ্যোতির খুব ভাব। তারা একসঙ্গে বৌবাজার আর্ট স্কুলের প্রথম বছরের। ছাত্র ছিলেন। মাঝে মাঝেই বিকেলবেলা ওপারের পানসি এপারে আসে। এপারের পানসি ওপারে যায়।
বন্দুকের আওয়াজে তারা একে অপরকে সিগনাল পাঠান। এপারের থেকে গুলি ছোড়েন গুণেন্দ্র। ওপার থেকে জ্যোতির বন্দুক জবাব দেয়।
গুণেন্দ্র ভারী শৌখিন পুরুষ। নানারকম মহার্ঘ শিল্পবস্তু সংগ্রহ করেন তিনি। স্ত্রীর আয়নার সামনে সাজিয়ে দিয়েছেন অসামান্য একটি স্ফটিকের টিউলিপ দেওয়া ফুলদানি। যতবার আয়নায় তার মুখের ছায়া পড়ে, ততবারই মুখের পাশে ভেসে ওঠে টিউলিপগুচ্ছ।
কোন্নগরের বাগানে আবার অন্যরকম মজা। কতরকম লোক আসে। এক নাপিত কাঠবেড়ালির ছানা এনে দেয়। বাবুইপাখির বাসা জোগাড় করে আনে। বহুরূপী এসে নাচ দেখায়।
বারান্দার বাইরে ছোট চালাঘরে মেয়েরা রান্নার তদারকি করছেন। কাঁঠালতলায় চৌকি পেতে আসর জমিয়েছেন গুণেন্দ্র, জ্যোতি, যদুনাথেরা।
কোন্নগরের রাস্তা থেকে এক বালক গায়ককে ধরে এনেছেন গুণেন, ছেলেটি ভারী মজার। ব্ল্যাকওয়ার নামে এক সাহেব রোজ ঘোড়ায় চড়ে ভ্রমণের পর গয়লাপাড়ায় গিয়ে গয়লানির কাছে এক পো দুধ খেত। পাড়ার লোকে তাই নিয়ে গান বেঁধেছে। গুণেনের নির্দেশে অর্গান বাজিয়ে সেই গানটি শোনায়।
হায় রে সাহেব বেলাকর ।
আমি গাই দেব, তুই বাছুর ধর
ওটি শিষ্ট বাছুর গুঁতোয় নাকো
কান দুটো ওর মুচড়ে ধর।
হায়রে সাহেব বেলাকর।
গান শুনে হা হা করে হেসে ওঠেন জ্যোতি ও গুণেন।
গঙ্গাতীরে বাঁধানো ঘাটের সিঁড়িতে বসে জ্যোতি একদিন তার শকুন্তলা অনুবাদ শোনাচ্ছিলেন জ্ঞানদাকে। জ্যোতির কাব্যের অপূর্ব ভাষায় ছন্দে জ্ঞানদার মনে আনন্দ ফিরে আসছিল। একে একে হেমেন, যদুনাথ ও সারদাপ্রসাদ এসে জড়ো হলেন।
কিছুক্ষণ কাব্যপাঠের পর জ্যোতিরিন্দ্র একটু থামতেই যদুনাথ জানতে চান, ভায়া তোমার কাব্য তো অতি সুন্দর। কিন্তু এই রচনার নেপথ্য প্রেরণা কোন সুন্দরী?
