.
জোড়াসাঁকোর আনন্দের আসরে একটু মনমরা হয়ে থাকেন জ্ঞানদা। এমনিতে তিনি এখন অন্তঃসত্ত্বা, কোনও দুশ্চিন্তা করা উচিত নয়। তবু মাঝে মাঝে উদ্বিগ্ন হন। নতুন বউ এসে তার গুরুত্ব কি একটু কমে যাচ্ছে এ-বাড়িতে? ওই একফোঁটা নিরক্ষর বালিকার প্রতি এত মনোযোগ দিচ্ছে কেন নতুনঠাকুরপো? এমনকী পুঁচকে বালক রবিও তার থেকে মাত্র কয়েক বছরের বড় নতুন বউয়ের পেছন পেছন ঘুরছে। বোধহয় তার চেলি ও গয়নার ঝকমকানিতে আকৃষ্ট হয়েছে সে। এই বালিকা কী করে উজ্জ্বল জ্যোতির সহধর্মিণী হবে? পরিশীলনে পরিমার্জনায় জ্যোতির মন যে উচ্চ তারে বাঁধা হয়ে গেছে, বালিকা কী করে তার নাগাল পাবে? হাসি পায় জ্ঞানদার, দুঃখও হয়।
জোড়াসাঁকোর মেয়েমহলে প্রাণ হাঁপিয়ে ওঠে জ্ঞানদার। বিবির কাছে ইংরেজি শেখেন, বাচ্চার জামা সেলাই করাও শিখছেন। বাংলা, ইংরেজি উপন্যাস পড়ে, চিঠি পড়ে তার দিন কাটে আলস্যে। জ্যোতি কাদম্বরীরা অনেকেই বোলপুরে হাওয়া বদলাতে গিয়েছেন। জ্ঞানদা সত্যেনের কাছে আবদার করেন জোড়াসাঁকোর বাইরে আলাদা বাড়িতে তার থাকার ব্যবস্থা করে দিতে। সত্যেন দুশ্চিন্তায় পড়েন। ঠাকুরবাড়ির চার-দেওয়ালে আটকে পড়া জ্ঞানদাকে কী করে মুক্তি দেবেন? অথচ তাকে তো একলা অন্য বাড়িতে রাখা যায় না!
.
প্রিয়তমা জ্ঞানদা,
এখন ত তোমার অনেক কষ্টে দিন যাইতেছে। কাল বাবামহাশয়ের ছবিশুদ্ধ তোমার পত্র পাইয়া তবুও কতকটা সুস্থির হইলাম। তোমার গঙ্গার ধারে থাকিবার ইচ্ছা হয় ত নিকটে কি কোন বাড়ী পাইতে পার না? তোমার সঙ্গে বাড়ীর কাহাকেও পাও আর ডাক্তারদের হইতে দূর না হয়, তবে ক্ষতি নাই, কিন্তু এখন বড়ই সাবধানে থাকা প্রয়োজন।
..তোমার অন্য বাড়ীতে থাকার বিষয়ে কিছু স্থির করিতে পারিতেছি না– বাবামহাশয় ইহার মধ্যে ত বাড়ী আসিবেন, না জানি তাঁহার কি মত? আর তুমি ত পাঁচিধোবানির গলিতে কোন বাড়ী লইয়া থাকিতে পারিবে না– একটা ভাল স্থানে বাঙালীটোলায় বাড়ী পাওয়া সহজ নহে। তবে যদি কোন বাগানে গিয়া থাকিতে ইচ্ছা কর। সে এক কথা।
.
..কি বল জ্ঞেনু?– কৈ তোমার ও নতুন বৌয়ের ছবি পাঠাইলে না?
.
সত্যেন বারবারই নতুন বউয়ের ছবি দেখতে চান। জ্ঞানদা বারবারই তা পাঠাতে ভুলে যান। ফোটোগ্রাফার ডেকে ছবি তোলানো কিছু কঠিন নয়, আজকাল ঠাকুরবাড়ির অন্দরেও তারা ছবি তুলতে আসে। কিন্তু নতুনবউ এসে তার বাল্য সহচর জ্যোতিকে ছিনিয়ে নিয়েছে জ্ঞানদার কাছ থেকে। খুব একা লাগে, মনখারাপ হয়। ছবি পাঠানো আর হয়ে ওঠে না।
ইতিমধ্যে সত্যেন টাঙ্গাগাড়ি কিনেছেন, কুকুর পুষেছেন। বাংলোবাড়িতে আস্তানা গেড়ে স্ত্রীকে লেখেন,
‘আমি এক নতুন খবর তোমাকে লিখিতে ভুলিয়াছি। আমি এক গরু কিনিয়াছি ও কাল তাহার এক বৎস হইয়াছে। শুনিতেছি ৫ সের দুধ দেয় ও ৫০ টাকা দাম। দুধ দেখিয়া দাম দিব। তার নাম কি রাখিব? তোমাদের বাড়ীতে লক্ষ্মী বলিয়া এক গরু ছিল, তাহাকে তুমি ভালবাসিতে– এর নামও লক্ষ্মী রাখি– কি বল? তোমার চিঠি দুই দিন পাই নাই, তোমার শরীর কেমন, কিছু কি ভাল হইয়াছে?’
দুজায়গায় সংসার চালাতে টাকার জোগাড় করতে সকলে দুশ্চিন্তায় পড়েন মাঝে মাঝেই। জ্ঞানদা জোড়াসাঁকোয় থাকলেও তার জন্য মেমসাহেব শিক্ষিকা রাখার খরচ বা বিশেষ বিশেষ বইপত্রের টাকা সত্যেনকেই পাঠাতে হয়। রোজগেরে পুত্রের হাতখরচ দেওয়ার ব্যাপারে দেবেন ঠাকুরের কিছু আপত্তি আছে। অথচ ওই ১০০ টাকা পেলে জ্ঞানদার কাজে লাগে। সত্যেন বাবামশায়কে চিঠিতে টাকা বন্ধ না করার আবেদন জানান। রোজগার করলেই কি পুত্র তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন? জ্ঞানদাকে লেখেন,
‘–আগামী মাসে তোমাকে টাকা পাঠাইতে পারিব কিনা সন্দেহ, কারণ গাড়ীঘোড়া জিনিষপত্র কিনিতে অনেক খরচ হইয়াছে। বোধ করি আগষ্ট মাসে একেবারে ২, ৩ শত টাকা পাঠাইতে পারিব। তুমি যদুর কাছ থেকে ত মাসে মাসে কতক পাইবে আর বাবামশায় যদি ১০০ টাকা এখনো দিবার অনুমতি করেন তাহা তোমার হস্তে দিবার জন্য জানকীকে লিখিয়াছি। যদি এখানে Assistant জজের কৰ্ম্ম পাই তবে বেশ হয়। তাহার অনেক সম্ভাবনা আছে। হয়ত এবারকার গ্যাজেটে তাহার কিছু থাকিতে পারে। আমার প্রেম ও রাশি রাশি চুম্বন।‘
.
অন্যদিকে জ্ঞানদার মনে হয় সত্যেন ওখানে সুখেই আছেন, কত বন্ধুবান্ধব, কত ভোজসভা, কত নতুন জায়গায় ভ্রমণ। এ-সবেই তার সঙ্গী হওয়ার কথা অথচ গর্ভিণী বলে আটকে থাকতে হচ্ছে এই সেকেলে শ্বশুরবাড়িতে।
সত্যেন ৬৫০ টাকা মাইনের অ্যাসিস্টান্ট জজ হয়েছেন আহমেদনগরে। প্রায় সন্ধেবেলাই কোনও না কোনও সাহেবের বাড়িতে গিয়ে সৌজন্যসাক্ষাৎ করতে হয়, এটাই নিয়ম। কয়েকদিনের মধ্যে এত মেমসাহেবের সঙ্গে আলাপ হয়েছে যে মুখ মনে রাখতে পারছেন না। তাঁর মতে,
এখানে অনেক গুলি বিবি আছে– একবার দেখা করিয়া সকলকে চিনিয়া উঠা কঠিন– এক দঙ্গল মেষপালের মধ্যে যেমন এক মেষকে অন্য হইতে চেনা দুষ্কর। নিতান্ত কুৎসিত কি নিতান্ত সুন্দরী যে, তাকেই একবার দেখিয়া জানা যায়। এখানে কৰ্ম্মের বড় অধিক জঞ্জাল নাই, পড়িবার অনেক সময়।
জ্ঞানদা রোজ চিঠি পান,
‘আমচী জ্ঞেনুমণি,
এখন অনেক সময় একলা থাকিতে হয় বলিয়া এক একবার বড় বিরক্ত বোধ হয়। ১০টার পর নাস্তা করিয়া তারপর দুই প্রহরের সময় কাঁচারিতে যাই, সেখানে দুই তিন ঘণ্টা থাকিয়া আবার আসিয়া চা খাই ও কিঞ্চিৎ পরে সন্ধ্যার সময় একবার বেড়াইতে যাই। কাল চলিয়া দেখিলাম কত পথ চলিতে পারি। প্রায় আধ ক্রোশ চলিয়াও বিশেষ কষ্ট বোধ হইল না, ক্রমে চলা অভ্যাস করিতে হইবে। রাত্রে এখন মন্দ ঘুম হইতেছে না, মশা নাই এক বড় সুবিধা, মশারিও দিতে হয় না। তোমার আসিবার আর কত বিলম্ব হইবে বোধ কর?’
