‘ভাই জ্ঞেনু
আলাহাবাদ বাগানে একজন অন্ধ ব্রাহ্মের সহিত সাক্ষাৎ হইল। তিনি জন্মান্ধ, তবুও বুদ্ধিমান ও বিবেকী বোধ হইল। কয়েকটি ব্রহ্মসঙ্গীত গান করিলেন মন্দ নহে– অর্থাৎ রাগরাগিনী শুদ্ধ না হোক কিন্তু সুর মন্দ নহে। তিনি অন্যের মুখে শুনিয়া উপনিষদ ও ব্রাহ্মধৰ্ম্মের পুস্তক সকলের মর্ম বুঝিয়াছেন। এমন কি অনেক শ্লোক তাহার কণ্ঠস্থ। তুমি সর্বাপেক্ষা চক্ষু হারাইবার ভয় কর, কিন্তু দেখ চক্ষু না থাকিলেও কত করা যায়। আলাহাবাদ ২৬এ প্রাতে পরিত্যাগ করিয়া সেই দিন সন্ধ্যার সময় জব্বলপুর পৌঁছিলাম। ভাগ্যে চারুর কাছ থেকে একখানা Novel সংগ্রহ করিতে পারিয়াছিলাম, তাহাই পথের একপ্রকার সম্বল হইয়াছে। এখন সেই গ্রন্থ পাঠ করিতেছি– তাহার নাম Oswald Cray- গ্রন্থকর্তা অথবা গ্রন্থকত্রীর নাম Mrs. Henry Wood৷ গ্ৰন্থখানি মন্দ নহে, তুমি আনাইয়া পড়িলে বুঝিতে পারিবে। ইংরাজ সমাজের দোষগুণ– ভাল দিক মন্দ দিক– তাহার অন্তরের ভাব অনেক লক্ষিত হইবে। এক এক স্থলে বর্ণনা বেশ আছে।’
জ্ঞানদা জানতে চান সত্যেনের নিজের কথা। এত পথচলায় কষ্ট হচ্ছে কি? পায়ের ব্যথা কেমন আছে? মনের মতো কথা বলার সঙ্গী কি পেয়েছেন সত্যেন?
সত্যেন জানান,
দেখ এক সপ্তাহের মধ্যে বোম্বাই আসিয়া পৌঁছিয়াছি। এখন যে হোটেলে রহিয়াছি তাহা Adelphi অপেক্ষা অনেক গুণে ভাল। হোটেল হইতে পৃথক একটা বাঙ্গলা পাইয়াছি– গোবিন্দ একটা পার্শ্ববর্তী বাঙ্গলায় রহিয়াছে– আমরা দুইজন একত্রে আহার করি। গোবিন্দ সারাদিনই তোমাকে ইংলণ্ডে পাঠাইবার পরামর্শ দেয়– তাহা এখন আর কি প্রকারে হয়– পরে দেখা যাইবে– কি বল জ্ঞেনু? আজ আমার ছুটির বিষয়ে অনুসন্ধান করিলাম– তাহার কোন গোল হয় নাই–১৫ই মার্চ হইতে তিন মাসের ছুটি পাইয়াছি– কল্য আমার অবশিষ্ট বেতন আদায় করিয়া লইব। আহমদনগরই এখন আমার কর্মস্থল। কিন্তু আবার আসিষ্টান্ট জজের পদ পাইবার চেষ্টা দেখিতেছি, শুনিলাম পুণায় একটা খালি আছে।
জ্ঞানদা পালটা চিঠিতে জানতে চান, তুমি কী খাও, কেমন স্বাদের খাবার খাও জানাবে? যাতায়াতে পথে খাওয়াদাওয়ার কোনও কষ্ট হয়নি তো? তোমার সঙ্গে এই বিচ্ছেদ আর ভাল লাগে না। এমন করে কতদিন যে তোমাকে ছেড়ে থাকতে হবে!
সত্যেন জবাব দিলেন,
পথিমধ্যে বিশেষ কোন কষ্ট হয় নাই। কল্য দাসপুরে সন্ধ্যার একটু পূৰ্ব্বে পৌঁছিয়া সুপ মাংস পীচ প্রভৃতি বিলক্ষণ ফলার করিয়া লইলাম। সঙ্গে যে আহার সামগ্রী ছিল, তাহা প্রায় খুলিতে হয় নাই। রৌদ্রের উত্তাপও বিশেষ কিছুই বোধ হইল না। আমি যে গাড়িতে ছিলাম, তাহা আর কেহ অধিকার করে নাই, সমস্ত পথটা একাকীই চলিয়াছি। সঙ্গীর মধ্যে এক হৈমবতী পুস্তক, তাহাকে লইয়া আর কতক্ষণ থাকিতে পারি। তবে বসিয়া শুইয়া ভাবিয়া ত একপ্রকার কালক্ষেপ করিলাম। কল্য সন্ধ্যার সময় নব ইন্দুকলা দেখিয়া তোমাকে মনে পড়িতে লাগিল– দেখিতে দেখিতে তাহা অস্ত গেল– আমিও শয়ন করিলাম।
তোমাতে আমাতে এবার এক বৎসরের জন্য বিচ্ছেদ হইবে কাহার মনে ছিল কিন্তু তাহাই ঘটিল। বোধহয় কোন দেবতা আমার প্রতি রুষ্ট হইয়া আমাকে, যক্ষের অনুরূপ বর্ষভোগ্য কান্তা বিরহ গুরু শাপ দিয়া থাকিবেন। এক্ষণে আর কি করা যায়। ঈশ্বরের প্রতি লক্ষ্য করিয়া ও কর্তব্য সাধন মনে করিয়া এক বৎসর কাল কোন মতে ধৈৰ্য্য ধরিয়া থাক; তোমার যখন যাহা প্রয়োজন হয় তাহা জানকীকে বলিলে তাহা আনিয়া দিবে। আর যদি কিছু না পাও ও তোমার কোনরূপ কষ্ট হয়, আমাকে লিখিলেই আমি তাহার উপায় করিয়া দিবার চেষ্টা দেখিব। তোমার যে কোন অসুখ হয়, একজন কাহাকেও সব খুলিয়া বলা অত্যন্ত আবশ্যক গোপন করিলে অনেক অনিষ্ট হইবার সম্ভাবনা। রাজেন্দ্রবাবু তোমাকে যত্ন করিয়া দেখিবেন তাহাতে আমার কোন সন্দেহ নাই। তোমার যখনি আবশ্যক হয় তাহাকে ডাকিয়া পাঠাইবে।
.
কত নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে আলাপ হয় সত্যেনের, তাদের বর্ণনা পড়তে জ্ঞানদার ভারী মজা লাগে। সত্যেনের চিঠিতে ছবির মতন ভেসে ওঠে কত মানুষ, এক ভোজসভায় আলাপ হল এক কালাসাহেবের সঙ্গে।
.
কৃষ্ণবর্ণ পুরুষ– প্রথমেই কেমন নিতান্ত ফিরিঙ্গি ফিরিঙ্গি বোধ হইল। তাহার এ দেশের কিছুই আর ভাল লাগেনা। Roast Beef ও Beer ভিন্ন দেশীয় সামগ্রী। সকল তাহার মুখরোচক নহে। ভিক্টোরিয়া রাণীর নিতান্ত অনুগত ভক্ত দাস। তাহার পিতা হইতে স্বতন্ত্র বাস করিতেছে। ইংলণ্ডের জলবায়ু লণ্ডনের কর্দম-ধূম কোওসা- মেঘ বাষ্প প্রভৃতি তাহার পক্ষে অতীব তৃপ্তিকর। আর এ দেশের জলবায়ু সূৰ্যকিরণ অসহনীয়। তাহার কথাবার্তা শুনিয়া আমাদের অত্যন্ত বিরক্তি বোধ হইল। আমরা যত পারি ইংলণ্ডের নিন্দা করিলাম ও সে দেশের জনসমাজের যে সকল কুপ্রথা তাহা বলিতে লাগিলাম। তাহা শুনিয়া যেন সে কিছু অপ্রস্তুত হইল।
.
পশ্চিমে থাকতে জ্ঞানদার সঙ্গে বেশ ভাব হয়েছিল মিসেস অলিফ্যান্ট-এর। জ্ঞানদা সত্যেনের কাছে জানতে চাইলেন তার কথা, সত্যেন স্ত্রীর বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে এসে লিখলেন,
.
এখানে কাল Oliphant-দের সহিত Tiffin করিলাম। Mrs. Oliphant তোমার কথা অনেক জিজ্ঞাসা করিলেন– যথা তুমি ঘোড়ায় চড়িতে শিখিয়াছ কি না–কলিকাতা থাকিতে ভালবাস কিনা ইত্যাদি। আমি Mrs.0-কে বলিলাম, যদি তুমি আহমদাবাদে তাহাকে ঘোড়ায় চড়িতে শিখাইতে তবে শিখিতে পারিতেন, কিন্তু এখন আর তাহার যো নাই। আর বলিলাম, কলিকাতার আর সকল ভাল লাগে, কেবল যদি মনের মত থাকিতে পার। আমাদের সকল পরিবারেরা কেমন একত্রে মিলিয়া একগৃহে বাস করে, তাহা বলিলাম। তুমি বোধ করি Mrs. Oliphant-কে সৌদামিনীর কথা বলিয়া থাকিবে, তাই জিজ্ঞাসা করিতেছিল তাহার সহিত সেখানে সাক্ষাৎ হয় কিনা?
