রবি বললেন, ও তো পড়া শিখতে এসেছে, তুমি অমন করছ কেন? মা পাঠিয়েছেন বলেই তো এসেছে। আর তুমি পারলে সবাই পড়তে পারে।
রূপা বোঝে তাকে সহজে কেউ জায়গা ছেড়ে দেবে না, লড়ে জায়গা নিতে হবে। তবে এরা সব আলালের ঘরের দুলাল, তার সঙ্গে লড়াই করে জিততে পারবে না।
বর্ণকুমারী তাকে ঠেলা দিলে সেও পালটি ঠেলা মারে। বর্ণ চোখ পাকিয়ে তাকায়, সেও তাকায়। রবি ফিকফিক করে হাসতে থাকেন মজা পেয়ে।
মাস্টারমশায় এলে কাদম্বরীও ছাত্রদলে যোগ দিলেন। আজকের পাঠ মেঘনাদবধ কাব্য। সেই কঠিন পাঠ্য মাস্টারমশায়ের ততোধিক কঠিন পাঠে ছাত্রদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যেতে লাগল।
কাদম্বরীর হাতে রবি একটি চিরকুট গুঁজে দিলেন, তাতে লেখা– কী বুঝিতেছ?
তৎক্ষণাৎ চিরকুটের উত্তরও পেয়ে গেলেন রবি, বুঝিলাম তুমি রাবণ আর আমি অশোকবনে বন্দিনী সীতা। রামচন্দ্র কবে উদ্ধার করিবেন সেই অপেক্ষায় আছি।
কিশোর রবির মনে দাগা লাগে, নতুনবউঠান কেন তাকেই রাবণ ভাবলেন? রবির মধ্যে রামচন্দ্র হওয়ার কোনও যোগ্যতাই কি তাঁর চোখে পড়ল না!
অভিমানী রবি পাঠে মন দিয়ে কাদম্বরীকে উপেক্ষা করার প্রাণপণ চেষ্টা করতে থাকেন কিন্তু রহস্যময়ীর ঠোঁটের মৃদু হাস্য সেই মনঃসংযোগে বিলক্ষণ বিঘ্ন ঘটাতে থাকে।
০৪. বিরহিণী পত্ৰলেখা
তেতলায় নতুন কয়েকটি ঘর তোলা হয়েছে। সেখানেই জ্ঞানদা তার নিজস্ব ঘরটিকে সুন্দর করে সাজিয়েছেন। মেঝেতে পেতেছেন ফুল-তোলা মাদুর। এককোণে ছোট্ট জলচৌকির ওপর কাঁসার ঘটিতে একগুচ্ছ লাল গোলাপ। দেওয়ালে জ্যোতিরিন্দ্রের আঁকা জ্ঞানদার একটি পোর্ট্রেট। সেদিকে তাকিয়ে আপনমনে বসে ছিলেন ছবির মানবীটি। হাতে সত্যেনের পাঠানো একগোছা চিঠি।
বিনি দাসী রুপোর রেকাবে একরাশ কাটা ফল নিয়ে হাজির করে, খেয়ে নাও গো বোঠান, তোমার শরীরে এখন গত্তি দরকার।
জ্ঞানদা আলস্যে শুয়ে থাকেন, দুর বিনি, আর সারাদিন ফল খেতে পারি না। যা-না একটু তেঁতুলের আচার নিয়ে আয়। সেজদিদির কাছে চুপিচুপি চেয়ে আনবি।
বিনি মুচকি হেসে বলে, এ সময়ে টক খেতে মন চায়, আমারও এরকম হত। মেজোবোঠান, তুমি সঁতে করে একটু ফল কাটো দিকিনি, পেটের বাবুসোনার পুষ্টি হবে। আমি এই ছুটে আচার নে আসছি। আহা এসময় বাপের বাড়ি গেলে কত ভাল লাগত, সে তো কত্তাবাড়ির রেয়াজ নেই।
বিনি চলে যেতে-না-যেতেই উত্তেজিত হয়ে একটি খাতা হাতে করে জ্যোতিরিন্দ্র ঘরে ঢোকেন কালবৈশাখী ঝড়ের মতো। মেজোবউঠান, শুনবে একটু আমার নতুন লেখাটা?
জ্ঞানদা উজ্জ্বল মুখে প্রিয় দেওরের দিকে তাকালেন, এতদিনে তোমার আসার সময় হল নতুনঠাকুরপো, আমি তো ভাবলাম নতুন বউ পেয়ে পুরনো বোঠানকে ভুলেই গেছ!
তুমি কোনওদিন পুরনো হবে না মেজোবউঠান, জ্যোতি জ্ঞানদার হাতদুটি ধরে আবেগের সঙ্গে বলে ওঠেন, তবে কাদম্বরীকেও একটু সময় দিতে হবে তো! সে বেচারা তো আমার ভরসাতেই এই প্রাসাদে ঢুকেছে।
নববিবাহের রক্তিমাভায় জ্যোতিকে আগুনের মতো রূপবান মনে হয়। জ্ঞানদার হৃদয় এক মুহূর্তের জন্য ঈর্ষায় উথালপাতাল হয়ে ভাবে, কে এক কাদম্বরী কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে এই তরুণের হৃদয়ে! পরক্ষণেই নিজেকে শাসন করেন ধীমতী এই নারী, ছিঃ, এরকম করে ভাবছেন কেন তিনি! দেবরটিকে তো তিনি আঁচলে বেঁধে রাখতে পারেন না চিরদিন।
মাঝে মাঝেই জ্ঞানদার ঘরের পালঙ্কে জমিয়ে আড্ডা বসান জ্যোতি ও স্বর্ণকুমারী। কিশোরী কাদম্বরী কোনও কোনও দিন একপাশে এসে বসে থাকেন। জ্ঞানদার সাহিত্যপ্রীতি ও সুচারু সাজসজ্জায় মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকেন, কিন্তু মেজোবউঠানের দিক থেকে নতুনবউ বিশেষ সাড়াশব্দ পান না। তাদের জমাটি আসরে নিজেকে বড় বেমানান লাগে কাদম্বরীর, কিন্তু তিনি ঠিক করেন শিগগিরই শিখে নেবেন স্বামীর ভাললাগা বিষয়গুলি।
রাতের শয্যায় লাজুকনতুন বউ স্বামীর কাছে জানতে চান, মেজোবউঠানকে তুমি খুব ভালবাসো তাই না?
জ্যোতি বউকে জড়িয়ে ধরে বলেন, হ্যাঁ ভালবাসি কিন্তু তোমাকে তার চেয়ে অনেক বেশি ভালবাসি, শতগুণ বেশি।
তিনি কত কী জানেন, আমি মুখ কিছুই জানি না। তোমাদের মতো করে কথা বলতে বড় ইচ্ছে করে, জ্যোতির বুকে মুখ রেখে কাদম্বরী বলেন।
জ্যোতিও তো তাই চান, নিজের মনের মতো করে গড়ে নিতে চান বউকে। বধূকে চুম্বন করে তিনি বলেন, তুমি এখন নরম মাটির মতো, আমি তোমাকে গড়েপিটে মনের মতো পুতুল বানাব। সবুর করো কদিন, তখন সবাই অবাক হয়ে তোমাকে দেখবে।
.
জ্ঞানদা নিজের ঘরে বসে সত্যেনের চিঠি পড়তে থাকেন। প্রতিদিনের প্রাত্যহিক কথাও চিঠিতে কেমন অসামান্য হয়ে ওঠে। অতিপরিচিত স্বামীটিও যেন নতুন হয়ে ধরা দিচ্ছেন নিত্য নতুন চিঠিতে। সত্যেন প্রায় প্রতিদিন চিঠি লেখেন জ্ঞানদাকে
‘তুমি এখন কেমন আছ? এই দুই তিন দিনে অবশ্য বুঝিতে পারিয়াছ অবশিষ্ট কাল কিরূপে থাকিতে হইবে। তোমার সঙ্গে সর্বদা কে কে থাকেন। স্বর্ণ ও জানকী কি তেতলায় শোন? খাওয়া তোমার একলা হয় কি কেহ ভাগী থাকে? তুমি যেমন চাও তাহা পাইতেছ কি না? সকল বিশেষ করিয়া লিখিবে। নূতনকে আমার স্নেহ জানাইবে ও বলিবে যেন মধ্যে মধ্যে লেখেন—
শ্রীসত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর
নীলকমল ও চারুর Photo তোমার album-এর জন্য পাঠাইলাম।
শ্রীস’
