নতুনবউকে মেজেঘষে ভোলার দায়িত্ব পেলেন নীপময়ী। তাঁর বাপের বাড়ির নাম মাতঙ্গিনী পালটে দিয়ে বিয়ের পরে ডাকা হচ্ছে কাদম্বরী বলে। নীপময়ী এবার তার জন্য বর্ণপরিচয় ও ধারাপাত কিনে আনালেন। পড়াশোনায় বেশ মেধার পরিচয় দিচ্ছেন নতুনবউ। আবার ঘরের কাজের শিক্ষাও চলছে পুরোদমে।
রবি, সোম ও সত্যের উপনয়নে কাদম্বরী ওদের অনেকটা কাছাকাছি এসে পড়লেন। এই তিন বালকের বড় হওয়ার সময় হল। ব্রাহ্ম হলেও পইতে ধারণের সময় মাথা ন্যাড়া করে, কানে সোনার বীরবৌলি পরে, হাতে বিদণ্ড নিয়ে গায়ত্রীমন্ত্রে দীক্ষা নিলেন তাঁরা। ভিক্ষাপাত্র নিয়ে মা, বাবামশায় ও গুরুজনদের কাছে ভিক্ষা নিয়ে আচার্য আনন্দচন্দ্র বেদান্তবাগীশকে দান করা হল। সারাদিন উপোস করে সন্ধ্যায় গায়ত্ৰীমন্ত্র জপের পর যখন নতুনবউঠানের বেঁধে দেওয়া হবিষ্যান্ন মুখে দিলেন, রবির মনে হল অমৃত খাচ্ছেন। প্রথমবার বাড়ির অন্তঃপুরিকার হাতের রান্না খেয়ে স্বাদেগন্ধে মুগ্ধ বালকদের মন কাদম্বরীর প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠল। সমবয়সি কাদম্বরীকে যেন বালকদের চেয়ে অনেক পরিণত মনে হয়। অন্তঃপুরের শিক্ষায় এবং সপ্রতিভতায় তিনি। শুধু বালকদেরই নয়, ঠাকুরবাড়ির অন্তঃপুরিকাদেরও মন জয় করে নিচ্ছেন। নবীন ব্রহ্মচারীদের তিনদিনের হবিষ্যি রান্নার ভার কাঁধে তুলে নিলেন তিনি।
রূপা এখন সারদার খুব নেওটা হয়েছে। রোজ দুপুরে এসে হাত-পা টিপে দেয়, পাকা চুল তুলে দেয় আর পুটুর পুটুর করে আবোল-তাবোল বকে যায়। ওর নরম আঙুলের ছোঁয়ায় বেশ ঘুম জড়িয়ে আসে সারদার চোখে।
একদিন বললেন, রূপা, তুই কি এমন মুখ হয়ে থাকবি? দাঁড়া তোকে লেখাপড়া শিখতে পাঠাব বৈঠকখানায়। বর্ণদিদি, রবিদাদা, নতুন বউঠানের সঙ্গে বসে বসে পড়া শিখবি মাস্টারমশায়ের কাছে।
রূপা আনন্দে নেচে ওঠে কত্তামায়ের কথা শুনে। তার পায়ে হাত দিয়ে বলে, তোমাকে কত্তামা ডাকতে আমার ভাল লাগে না। বন্নোদিদির মতো মা বলে ডাকলে তুমি কি রাগ করবে?
এই অনাথা বালিকার সঙ্গে কী এক অদ্ভুত মায়ায় জড়িয়ে পড়েছেন সারদা, ভাবলে নিজেরই আশ্চর্য লাগে। রূপা তার যত কাছে এসে গেছে, নিজের গর্ভের সন্তানদের কোনওদিন তত কাছে ঘেঁষতে দেননি। ছোট থেকে বুকের দুধ না-দেওয়ায় বাচ্চাদের সঙ্গে কোনও শরীরী বন্ধন গড়ে ওঠেনি। এই মেয়েটি যখন গায়ে হাত দিয়ে সেবা করে, তা ঠিক যেন দাসীর মতো নয়, বরং কন্যার মতো। আবার মুশকিল হচ্ছে এর হাবভাবে ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের ঘষামাজা নেই, গ্রাম্যটানের বুলিতে বারবার মনে করিয়ে দেয় ও আলাদা। সারদা ঠিক করলেন ওর গায়ে ঠাকুরবাড়ির আলোর ছোঁয়া লাগিয়ে দেখবেন কী হয়।
শোন, আজ থেকে তোর নাম দিলাম রূপকুমারী। আমার সুকুমারী, শরৎকুমারী, স্বর্ণকুমারী, বর্ণকুমারীদের পাশে বেশ মানাবে। কেউ জিজ্ঞেস করলে এই নাম বলবি, মাস্টারমশায়কেও।
কিন্তু সবাই যে রূপা বলেই ডাকবে? বালিকা খুশিতে অধীর হয়ে জানতে চায়।
সে ডাকুক না, রূপকুমারীর ডাকনাম তো রূপা হতেই পারে। সারদা আশ্বস্ত করলেন পুষ্যিকন্যাকে। স্বর্ণ বর্ণ তো ওকে এখনই মজা করে মায়ের পুষ্যি বলে।
কিন্তু তোর দস্যিপনা আর চলবে না। আমার পুয্যি হয়ে থাকতে হলে আমার মেয়েদের মতো ভদ্রসভ্য শিক্ষিত হতে হবে। ঘরের কাজ, রান্নাবান্না শিখতে হবে, উড়ে উড়ে বেড়ানো বন্ধ।
রূপাকে স্নেহ করলেও সারদা জানেন ওর মধ্যে একটা অবাধ্য ঘোড়ার মতো বুনো স্বভাব আছে, আদর নেবে কিন্তু সহজে পোষ মানবে না। ছোট থেকে কুটুম মহলে থেকে থেকে সংসারের কল্যাণকর নিয়মগুলো কিছুই শেখেনি।
রূপার ঝুঁটি ধরে নেড়ে আবার বলেন সারদা, বুঝেছিস, তোকে ভাল মেয়ে হতে হবে!
ভাল মেয়েরা কী করে মা? রূপার প্রশ্নটি সারল্য না দুষ্টুমি ঠিক বুঝতে পারেন না সারদাসুন্দরী। এ মেয়েটা একটু অন্যরকম, মনে মনে তারও জেদ চাপে, বেতো ঘোড়াকে সোজা করবেনই, তবে তার নাম সারদাসুন্দরী।
ভাল মেয়েরা স্বর্ণ বৰ্ণর মতো, নতুন বউয়ের মতো মায়ের কথা শুনে চলে। সব কাজ ধীরে ধীরে করে। সবাইকে সেবা যত্ন করতে শেখে আবার লেখাপড়াও শেখে। যাকে বলে, রূপে লক্ষ্মী আর গুণে সরস্বতী। শুনিসনি, সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে?
রূপার বয়স একটু বেড়েছে, সারদার প্রশ্রয়ে সাহসও বেড়েছে। সে বলে, তা কেন হবে মা। মেয়েরাই শুধু খেটে মরবে কেন? কেন ঘরে বন্দি হয়ে থাকবে? আমার তো ইচ্ছে করে ডানা মেলে পাখির মতো উড়ে যাই। বেটাছেলেদের গায়ে যেন ডানা লাগানো আছে আর আমরা বিটিরা সব ডানাছেঁড়া।
সারদা ভাবেন, তার পেটের মেয়ে হলে এ-কথা বলত না কখনও। বলেন, দাঁড়া, তোকে কী করে শিক্ষে দিতে হয় আমি দেখছি।
পরের দিন থেকেই পুরোদমে শুরু হয়ে গেল রূপা থেকে রূপকুমারী হয়ে ওঠার ক্লাস, শুয়োপোকা থেকে প্রজাপতি তৈরি করেই ছাড়বেন সারদা।
বর্ণকুমারী কিন্তু সহজে মেনে নিতে পারেন না মায়ের পুষ্যিটিকে। সে বেশ মায়ের পাশ ঘেঁষে ঘেঁষে বসছে রোজ দুপুরে, আবার পাঠশালায় একসঙ্গে পড়া শিখতে আসছে। বিরক্ত বর্ণ ফিসফিস করে রবিকে বলেন, দেখ মেয়েটা কেমন উড়ে এসে জুড়ে বসেছে।
রবির এ-সব নিয়ে অত মাথাব্যথা নেই। তাঁর দুশ্চিন্তা যে পড়া শেষ হলেই ইস্কুলে যেতে হবে। ও জায়গাটা তাঁর মোটেই পছন্দ নয়। বর্ণদিদির আর চিন্তা কী? তিনি তো পড়ার পর অন্দরমহলের আরামে ঢুকে পড়বেন। নতুনবউঠানের সঙ্গে গল্পের লোভে রবি দু-একদিন ওদের পিছু পিছু ঢুকতে চেষ্টাও করেছেন। কিন্তু নিষ্ঠুর বর্ণদিদির তাড়নায় ফিরে আসতে হয়েছে চাকরমহলে। সুতরাং রবি ঠিক করে নেন, তিনি কিছুতেই বর্ণদিদির পক্ষ নেবেন না। বরং রূপার সঙ্গে বন্ধু পাতানো যায় কারণ সে মায়ের কোলঘেঁষা। আহা রূপার মতো ভাগ্যও যদি তার হত!
