সত্যেন আহমেদনগর থেকে জ্ঞানদাকে লিখলেন, আমি যদি নতুন হইতাম, তবে কখনই এ বিবাহে সম্মত হইত… [হইতাম] না। কোন্ হিসাবে যে এ কন্যা নতুনের উপযুক্ত হইয়াছে জানি না।
‘..আমি বলি নতুন যদি ইংলণ্ডে যাইবার সঙ্কল্প করেন তবে বিবাহ না করিয়া যাওয়াই ভাল।… আমার ভাগ্যে এমন স্ত্রী হইয়াছে, আমি মুক্তকণ্ঠে বলিতে পারি যে এমন স্ত্রীরত্ন দুর্লভ।… জ্যোতি না দেখিয়া শুনিয়া একজনকে বিবাহ করিয়া ইংলণ্ডে ৪৫ বৎসরের জন্য চলিয়া যাক– সেখানকার সমাজে সঞ্চরণ করিয়া ও সুশিক্ষিত হইয়া ফিরিয়া আসিয়া এক অপরিচিত, হয়ত অশিক্ষিত স্ত্রী কি তাঁহার মনোনীত হইবে? দেখ যতজন বিলাতে গিয়াছে প্রায় সকলেরই ওই প্রকার দুর্দশা ঘটিয়াছে… আমাদের কথা স্বতন্ত্র’।
মহর্ষি অবশ্য সত্যেনের আশঙ্কাকে গুরুত্ব দিলেন না। সত্যেনের স্ত্রীকে যশোরের কোন অজগ্রাম থেকে আনা হয়েছিল? ঠাকুর পরিবারের বেশিরভাগ বউকেই প্রত্যন্ত পাড়াগাঁ থেকে বেছে আনা হয়েছে, তারপর মেজে ঘষে শিক্ষায় সংস্কৃতিতে তারাই হয়ে উঠেছেন বাংলার আদর্শ নারী। শ্যাম গাঙ্গুলির মেয়েটিকে তিনি কয়েকবার দেখেছেন, বেশ সুলক্ষণা। সত্যেনকে তিনি চিঠি লিখে জানিয়ে দিলেন, জ্যোতির বিবাহের জন্য একটি কন্যা পাওয়া গিয়াছে এইই ভাগ্য। একেত পিরালী বলিয়া ভিন্ন শ্রেণীর লোকেরা আমাদের সঙ্গে বিবাহেতে যোগ দিতে চাহে না, তাহাতে আবার ব্রাহ্মধর্মের অনুষ্ঠান জন্য পিরালীরা আমাদিগকে ভয় করে। ভবিষ্যৎ তোমাদের হস্তে তোমাদের সময় এ সঙ্কীর্ণতা থাকিবে না।
হতাশ সত্যেন্দ্র স্ত্রীকে লিখে পাঠালেন, তবে নতুনের বিবাহের ধূম লাগিয়া গিয়াছে। হিতেন্দ্র ও নীতিন্দ্রের ভাত, তোমরা বেশ আমোদে আছ। নতুনের বিবাহ দেখিবার তোমার যে এত সাধ ছিল, তাহা পূর্ণ হইল। শ্যামবাবুর মেয়ে মনে করিয়া আমার কখনই মনে হয় না যে ভাল মেয়ে হইবে– কোন অংশেই জ্যোতির উপযুক্ত তাহাকে মনে হয় না। জ্যোতি এই বিবাহে কেমন করিয়া সম্মত হইল, এই আমার আশ্চর্য্য মনে হইতেছে। কিন্তু সত্যেন জ্ঞানদার অপছন্দে বিয়ে আটকে থাকল না।
২৩ আষাঢ়ের শুভলগ্নে সিঁদুরে রঙের চেলি ও গা-ভরতি জড়োয়া গয়না পরে কাদম্বরী ঠাকুরবাড়িতে প্রবেশ করলেন। সাজের কী বাহার! গলায় চিক ও ঝিলদানা হার, হাতে চুড়ি, জড়োয়া কঙ্কণ ও বাজুবন্দ, কানে বীরবৌলি ও কানবালা, পায়ে নূপুর ও চুটকি, কোমরে চাবি ও গোট, মাথায় জড়োয়া সিঁথি ও টিকলি। এ-বাড়ির রীতি অনুযায়ী অধিকাংশ গয়নাই দেবেন্দ্র যৌতুক হিসেবে দিয়েছেন। জ্যোতির বয়স উনিশ, কাদম্বরীর নয় বছর। জ্ঞানদার আশঙ্কা ছিল অশিক্ষিত বালিকাকে পছন্দ হবে না জ্যোতির। সে ভয় মিথ্যে করে নববধূকে দেখে জ্যোতিরিন্দ্রর রোমান্টিক মন দুলে উঠল। এই শ্যামল বালিকাকে তিনি নিজের মতো করে গড়েপিটে নেবেন। মেজোবউঠান যশোর থেকে এসে যদি আভিজাত্যের শিরোমণি হতে পারেন, নতুনবউও নিশ্চয় পারবে। আর নববধূকে দেখে তার চেয়ে দুবছরের ছোট দেওর রবির মনে হল রূপকথার রাজকন্যে এসেছেন বাড়িতে। কী যেন অজানা পুলকে শিউরে ওঠে বালকের মন।
বিয়ের সময় দেবেন্দ্র হিমালয়ে ছিলেন বলে সব দায়দায়িত্ব দিয়েছেন ভাইপো গণেন্দ্রকে। সত্যেন বা হেমেনকে এই দায়িত্ব না দেওয়ার একটা কারণ নিশ্চয় এ-বিয়ে সম্বন্ধে তাদের বিরূপ মনোভাব। বালক বালিকাদের জন্য নতুন জামাকাপড়, ঘটক বিদায়, কুলীন বিদায়, অধ্যাপক বিদায় সবকিছু সামলাতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন গণেন্দ্র। বিলিতি দোকানের জুতো কেনা হল। বিয়েতে গরিবদের জন্য ঢালাও ভোজের ব্যবস্থা নির্দেশ করলেন মহর্ষি। এবার অবশ্য ব্রাহ্মবিয়েতে কয়েকজন বিশিষ্ট ব্রাহ্মণের উপস্থিতি দেখা গেল। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় সে-খবরটি বিশেষভাবে উল্লেখ করার নির্দেশ দিলেন দেবেন্দ্রনাথ।
আনন্দর পাশাপাশি একটি বেদনার সূত্রপাত হচ্ছিলঠাকুরবাড়িতে। বীরেনের মাথার দোষ বাড়াবাড়ি পর্যায়ে পৌঁছল। তাকে পারিবারিক আয়ব্যয়ের হিসেব রাখার ভার দিয়েছিলেন বাবামশায়, কিন্তু সে-কাজে গাফিলতি হতে থাকল। ক্রমে তিনি খাওয়া ছেড়ে দিলেন। তার নিরাময়ের আশায় বোলপুরে নিয়ে গেলেন স্ত্রী প্রফুল্লময়ী। নীপময়ী, ব্রজসুন্দরী, কাদম্বরীরাও তাদের সঙ্গী হলেন। কিন্তু সেখানে গিয়েও তার খাওয়াদাওয়ার কোনও উন্নতি হল না। এক চামচ ভাত আর একটি পটলপোড়া খেয়েই থালা সরিয়ে দিতেন এক-একদিন। কলকাতা ফিরে এসে সাহেব ডাক্তার দেখিয়েও অসুখ সারল না।
এইসময় থেকেই রবির কবিতা নিয়ে আঁকিবুকি শুরু। সুযোগ পেলে পাঠ্যবইয়ের কবিতা মুখস্থ শুনিয়ে মাকে তাক লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও করতে লাগলেন বালক। ভেতরমহলে ছলছুতোয় মায়ের কাছে গেলে কিশোরী নতুনবউঠানের সঙ্গেও মাঝে মাঝেই দেখা হয়ে যায় সমবয়সি দেওরটির। চোখে চোখে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে যেন। বুক কেঁপে ওঠে অজানা রোমাঞ্চে আর রবির গোপন খাতা ভরে ওঠে কবিতায় কবিতায়। নতুনবউঠানের ঘরের কাঁচের আলমারিতে বিচিত্র চিনেমাটির খেলনার ঝলক চোখে পড়ে। ওই রহস্যময়ীর সঙ্গে গল্প করতে বড় ইচ্ছে করে রবির। কিন্তু কথা বলতে গেলেই বর্ণদিদি কেন যে তেড়ে আসে! মেয়েদের সৌভাগ্যকে একটু ঈর্ষাও হয়, আজকাল একসঙ্গে গুরুমশায়ের কাছে পাঠ নিতে বসেন তাঁরা। কিন্তু পড়া শেষ হলে রবি, সোম ও সত্যকে যখন ইস্কুলের কয়েদখানায় পাঠানো হয়, বর্ণ বেণী দুলিয়ে এবং নতুনবউঠান ঘোমটা টেনে অন্দরের স্বর্গরাজ্যে চলে যান। এই মনের দুঃখ কাকেই বা জানাবেন রবি!
